বাজারের সয়াবিন তেলেও মিললো মাইক্রোপ্লাস্টিক

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০ | অনলাইন সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের বাজারে প্রচলিত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার পর এবার সয়াবিন তেলেও মিলেছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) যৌথ এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর বাজারে বিক্রি হওয়া বোতলজাত ও খোলা- উভয় ধরনের সয়াবিন তেলেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষণাটি আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশে সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তের এটি প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

গবেষণার জন্য ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বিভিন্ন সুপারশপ এবং খোলা বাজার থেকে তিনটি ব্র্যান্ডেড ও তিনটি নন-ব্র্যান্ডেড (খোলা) সয়াবিন তেলের মোট ৬০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আধুনিক স্পেকট্রোস্কোপিক ও রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষায় প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।

এর মধ্যে খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি এবং বোতলজাত তেলে ৪৮ হাজার ৬৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ খোলা তেলে দূষণের মাত্রা বোতলজাত তেলের তুলনায় প্রায় ১.২৪ গুণ বেশি। তেজগাঁও এলাকা থেকে সংগ্রহ করা খোলা তেলের নমুনায় দূষণের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ।

গবেষণায় তেলের নমুনায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এগুলো হলো—লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (LDPE), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (HDPE), পলিপ্রোপিলিন (PP), পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (PET), পলিইউরেথেন (PU) এবং নাইলন।

গবেষকদের দাবি, ভোজ্যতেলে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতি বিশ্বে প্রথমবারের মতো এ গবেষণায় নথিভুক্ত হয়েছে। শনাক্ত হওয়া কণার ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল ফাইবার বা আঁশজাতীয়। এছাড়া ৫৬ দশমিক ২৯ শতাংশ কণা ছিল স্বচ্ছ এবং সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটার আকারের কণা।

গবেষকদের মতে, খোলা তেলে দূষণের মাত্রা বেশি হওয়ার পেছনে শিল্পকারখানার ঘনত্ব, প্লাস্টিক ও টেক্সটাইল শিল্পের সান্নিধ্য, সংরক্ষণে ব্যবহৃত পাত্রের বারবার ব্যবহার এবং বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে বোতলজাত তেলের ক্ষেত্রে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপ দূষণের সম্ভাব্য উৎস হতে পারে।

গবেষণায় মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের একটি প্রাক্কলনও তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শুধু সয়াবিন তেল থেকেই প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন।

তবে শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কম ওজনের কারণে তারা প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, একটি শিশু তার জীবদ্দশায় প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শরীরে গ্রহণ করতে পারে।

গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরে প্রবেশ করলে পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, প্রদাহ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বিপাকীয় জটিলতা এবং কোষের ক্ষয় হতে পারে। বিশেষ করে ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো কোষের দেয়াল ভেদ করে রক্তে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

আবা/এসআর/২৬