রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট চাইলেন মির্জা ফখরুল
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ২১:০৭ | অনলাইন সংস্করণ

বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বিদায়ী বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব ও রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্যের একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। নেতাকর্মীদের কাছে দোয়া চাওয়ার পাশাপাশি আগামীকালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
বুধবার (১৯ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দুপুর ২টা থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক চলে।
সভায় দলীয় সংসদ সদস্যদের মির্জা ফখরুলের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের ঐক্য অটুট রাখা এবং সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব তৈরি না হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
বিএনপির চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের ধারণা দেন এবং মির্জা ফখরুলের পক্ষে ভোট চান। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মির্জা ফখরুল নিজেও ভোট দেবেন। নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে তার ঠাকুরগাঁও-৩ আসনটি শূন্য হবে।
এরপর বক্তব্য দিতে দাঁড়ান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সভায় উপস্থিত সংসদ সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বক্তব্যের শুরুতেই আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
বক্তব্যে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান মির্জা ফখরুল। একই সঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, দায়িত্ব পালনের সময়ে কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকলে কিংবা অজান্তে কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
তিনি বলেন, দল তাকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, জীবন দিয়ে হলেও সেই সম্মান রক্ষা করবেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না বলেও জানান তিনি।
বঙ্গভবনে যাওয়ার পর সহকর্মীদের মিস করবেন উল্লেখ করে সবার কাছে দোয়া চান মির্জা ফখরুল। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তার পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য দলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।
সভায় অংশ নেওয়া একাধিক সংসদ সদস্য জানান, কয়েক মিনিটের বক্তব্যে চার-পাঁচবার কেঁদেছিলেন মির্জা ফখরুল। এতে সভাকক্ষে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বৃহস্পতিবারের পর বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় মির্জা ফখরুলকে আর দেখা যাবে না—এ বিষয়টিও তার বিদায়ী বক্তব্যকে আরও আবেগঘন করে তোলে।
পরে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আজ ঐতিহাসিক একটি দিন। অনেক মূল্য দিয়ে আমরা আজ এ জায়গায় এসেছি।’ এ জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের সর্বত্র জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি অপরিহার্য—এ বিষয়টি সবাইকে মনে রাখতে হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, বহু বছর ধরে মির্জা ফখরুল দলের সঙ্গে যুক্ত। দলের দুঃসময়ে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে তিনি দলের হাল ধরেছেন এবং কখনো হাল ছাড়েননি। তাকে কারাবন্দিও করা হয়েছে। সেই সময়ে তারেক রহমানকে দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে দলীয় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবারের নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল থাকার পাশাপাশি সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানান।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে তারেক রহমান বলেন, অনেক সংসদ সদস্যের সঙ্গে এলাকায় দলের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং কোনোভাবেই এই দূরত্ব তৈরি হতে দেওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে। ফলে নির্বাচনটি চ্যালেঞ্জিং হবে। গত সংসদ নির্বাচনে অনেকে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ায় দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাতে কেউ দল-সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে না যান, সে জন্য এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের প্রার্থী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়ে তাকে বিজয়ী করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুলের আবেগঘন বিদায় এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তারেক রহমানের সাংগঠনিক নির্দেশনা—দুই মিলিয়ে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে দলীয় ঐক্য, শৃঙ্খলা ও তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
