অনলাইন সংস্করণ
১৪:৪৬, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
গ্রাম পুলিশের বেতন, আনুতোষিক ভাতা, যাতায়াত ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে মোবাইল ভাতা দেওয়ারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী গ্রাম পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনাদের পদবি পরিবর্তন করে গ্রাম পুলিশ করা হয়েছে। তবে শুধু পদবি পরিবর্তনই নয়, আপনারা জেনে নিশ্চয়ই খুশি হবেন গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে। আমি আজ গ্রাম পুলিশের এই মহাসমাবেশে ঘোষণা দিচ্ছি, আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর থেকে ইনশাআল্লাহ সরকারের এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী হবে।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, আজকে থেকে গ্রাম পুলিশের মাসিক বেতন ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে। গ্রাম পুলিশের বেতন ৮ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার টাকা।
গ্রাম পুলিশের আনুতোষিক ভাতা ৭০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানের এ ভাতা ৮০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা করা হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান।
তিনি আরও জানান, থানায় যাতায়াতে গ্রাম পুলিশ সদস্যের ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা, গ্রাম পুলিশ প্রধানের এই যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে এখন থেকে গ্রাম পুলিশকে প্রতি মাসে ১৫০ টাকা করে মোবাইল ভাতা দেওয়ার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন করে দুইজন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে নারী গ্রাম পুলিশের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গ্রাম পুলিশের পরিচয় পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহল্লাদার হচ্ছেন গ্রাম পুলিশ এবং দফাদার হচ্ছেন গ্রাম পুলিশ প্রধান।’
তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা বিধানে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে গ্রাম পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তৃণমূল পর্যায়ে কোথায় কী ঘটছে, কারা অপরাধে যুক্ত হচ্ছে কিংবা কোথায় পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে, এসব বিষয়ে গ্রাম পুলিশের আগাম তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে তারা জনগণের নিরাপত্তায় তাৎক্ষণিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি দেশের প্রতিটি গ্রাম বা প্রতিটি ইউনিয়ন নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে। তৃণমূল জনগোষ্ঠীর শান্তি ও স্বস্তি থাকলে বাংলাদেশ শান্তি ও স্বস্তিতে থাকবে।’
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রাম পুলিশকে আরও কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি এখনো গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা জরুরি।
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাষ্ট্র ও সমাজে সামাজিক অবক্ষয় ঘটেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, পরিকল্পিতভাবে হীন স্বার্থ ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব উসকে দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার মূল্যবোধ বিনষ্ট করা হয়েছিল। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় পরিবারে পরিবারেও বিরোধ-বিবাদ উসকে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘এমন একটি সামাজিক বাস্তবতায় শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়েই পরিস্থিতির উন্নয়ন একমাত্র উপায় নয় বলে আমি মনে করি। বরং আমি মনে করি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় কার্যক্রমের পাশাপাশি ধর্মীয়, সামাজিক, পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মানুষের সামাজিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি এবং সহমর্মিতা সংস্কৃতি পুনর্প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজের উপরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা একটি কার্যকর উপায়।’
গ্রাম পুলিশের ভূমিকা অবশ্যই আইনসম্মত, মানবিক, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব হতে হবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি নিরাপদ ইউনিয়ন বা গ্রামের জন্য কার্যকর স্থানীয় প্রশাসন, দায়িত্বশীল গ্রাম পুলিশ এবং সচেতন জনগণের সক্রিয়তার সমন্বয় জরুরি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ডসহ জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার ক্ষেত্রে গ্রাম পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। এসব কাজ সব সময় সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম না হলেও সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
গ্রাম পুলিশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের সময় ১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মতো গ্রাম পুলিশের জন্য ঈদ বোনাসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এবং তা কার্যকর হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও সারাদেশের ৪০ হাজারের বেশি গ্রাম পুলিশের পরিবার-পরিজনের স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপনের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রতিটি ইউনিয়নের একটি দীর্ঘ সড়কের নাম 'গ্রাম পুলিশ সড়ক' করার ঘোষণাও দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় এসব সড়কে বৃক্ষরোপণ করা হবে। গাছ পরিণত হলে সেগুলো বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
এ ছাড়া গ্রাম পুলিশকে প্রতি পাঁচ বছর পর একটি করে বাইসাইকেল দেওয়ার বর্তমান সময়সীমা কমিয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন বছর করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আজকে এই সমাবেশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে আমি নির্দেশনা দেব, এটি কমিয়ে যাতে তিন থেকে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব হয়। পাঁচ বছরের পরিবর্তে আমরা চেষ্টা করব আমাদের সকল গ্রাম পুলিশ সদস্যকে তিন থেকে সাড়ে তিন বছর পর পর একটি নতুন বাইসাইকেল যেন দেওয়া হয়।’
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের নিজেদের বাড়িঘর, আশপাশের এলাকা, হাটবাজার, রাস্তাঘাট ও খালের দুই পাশ পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা এবং অন্যদেরও নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি স্বেচ্ছায় বৃক্ষরোপণে অংশ নিতে বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি নিরাপদ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমূলক গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মহাসমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, স্থানীয় সরকার, বিমান ও পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মহাসমাবেশে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা প্রায় ৪১ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্য অংশ নেন। তাদের ব্যাপক উপস্থিতিতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে এক বিশাল সমাবেশের সৃষ্টি হয়।
এসময় ৮ বিভাগ থেকে শ্রেষ্ঠ ৮ জন গ্রাম পুলিশদের হাতে বিশেষ সম্মননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।