রংপুরে সড়ক-মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ যানবাহন

রংপুরে সড়ক-মহাসড়কগুলোতে ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে অবৈধ নছিমন, করিমন, মুড়িরটিন, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ট্রলি-ট্রাক্টর চলাচল। সড়কে এসব যানের উপস্থিতি গণমানুষের স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। সড়কে চলাচলের জন্য এসব পরিবহনের কোনো রুট পারমিট না থাকলেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন চোখের সামনে অবৈধ এসব যানের অবাধ চলাচল করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। 

অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ এসব যানবাহন মালিকের কাছে মাসোহারা আদায়ের কারণেই এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। এ অঞ্চলে অবৈধ ইট, বালু, মাটি বহনকারী ট্রলি ও ট্রাক্টরের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। এদের বেপরোয়া গতিতে চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। ফলে অকালে ঝরে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। কাউকে আবার সারা জীবনের মতো বরণ করতে হচ্ছে পঙ্গুত্ব। এছাড়া এগুলোর বিকট শব্দের কারণে ঘটছে শব্দদূষণও। ফলে পথচারীসহ জনসাধারণকে সার্বক্ষণিক আতংকের মধ্যে চলাচল করতে হচ্ছে। 

রংপুর সিটি কর্পোরেশনের অটোরিকশার লাইসেন্স দেয়া আছে ৫ হাজার। অবৈধ ২০ হাজার অটোরিকশা আছে। এসব চালক অদক্ষ, লাইসেন্স নেই তাদের। এসব অটোরিকশা সড়ক-মহাসড়কে  চলাচল করে যানজটের সৃষ্টি করে। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।

জানা যায়, কৃষিকাজের জন্য ভর্তুকি দিয়ে বিদেশ থেকে ট্রাক্টর আমদানি করা হয়। আমদানিকারকরা এসব ট্রাক্টর বিক্রি করে ইটভাটার মালিক, মাটি ও বালু ব্যবসায়ী, কাঠ ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকসহ সাধারণ পরিবহন ব্যবসায়ীদের কাছে। ব্যবসায়ীরা ট্রাক্টরের পিছনে ট্রলির বডি লাগিয়ে মহাসড়কে মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহার করছে। জেলায় অবৈধ এসব ট্রলি-ট্রাক্টরের সংখ্যা কত, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কারও কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে জেলাজুড়ে হাজার হাজার ট্রলি-ট্রাক্টর হাইওয়ে থেকে শুরু করে গ্রামের রাস্তাগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) রংপুরের সহকারী পরিচালক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ট্রাক্টর মাঠে কৃষিকাজের জন্য অনুমোদিত, সড়ক-মহাসড়কে চলাচল কিংবা পণ্যসামগ্রী বহনের অনুমতি নেই। সম্পূর্ণ বে-আইনিভাবে এ যানটি সড়কে চলাচল করছে।

সম্প্রতি নগরীর টার্মিনাল, মডার্ন মোড়, চেকপোস্টসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চলাচলকারী মালবোঝাই ট্রাক্টরের কোনোটিরই লাইসেন্স নেই। এছাড়া ট্রাক্টরের কোনো নম্বর-প্লেটও নেই। কোনো কোনো ট্রাক্টর ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মালামাল বোঝাই করে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে। চালকেরও নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাক্টর মালিক জানান, প্রতিটি ট্রাক্টরের জন্য ১ থেকে ২ হাজার টাকা হারে পুলিশকে মাসোহারা দিতে হয়। হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশের লোক নির্ধারিত স্থান থেকে এ মাসোহারা আদায় করেন। প্রতি মাসে এ মাসোহারা আদায় করা হয়। কোনো ট্রাক্টর মালিক যদি মাসোহারা দিতে কালক্ষেপণ করেন কিংবা মাসোহারা দিতে অস্বীকৃতি জানান তাহলে তার ট্রাক্টর আটকে রেখে জরিমানাসহ বিভিন্ন হয়রানি করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রংপুর সদর এলাকাসহ জেলায় যেসব ট্রাক্টর চলাচল করে তার প্রত্যেকটির জন্য মালিকের কাছ থেকে ১/২ হাজার টাকা মাসোহারা আদায় করা হয়। যেসব ট্রাক্টর মালিক মাসোহারা দেন না, বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে তাদের ট্রাক্টর আটক করে জরিমানা করা হয়। শুধু তাই নয়, সড়কে যেসব ফিটনেসবিহীন ট্রাক চলাচল করে তাদের কাছ থেকেও প্রকারভেদে দেড় থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোহারা আদায় করা হয়। যারা মাসোহারা দিতে অস্বীকৃতি জানায় তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। 

তবে মাসোহারা আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করে রংপুর জেলা ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ খাঁন মো. মিজানুর ফাহিমী বলেন, লোকে এ ধরনের অনেক অভিযোগ করে। আসলে এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি আরো বলেন, সড়ক নিরাপত্তার জন্য এসব অবৈধ যানের চলাচল প্রতিরোধে আমরা কাজ করছি। বিভিন্ন স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। যারা ধরা পড়ছেন তাদের যান আটকে রাখা ও জরিমানা করাসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। 

বড়দরগা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, অবৈধ এ যানের চলাচল প্রতিরোধে প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যারা ধরা পড়ছেন তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কাজ করা সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর রংপুরের সভাপতি ডা. জিল্লুর রাব্বি বলেন, ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দুটিই মাঠে কৃষিকাজের জন্য অনুমোদিত, সড়ক-মহাসড়কে চলাচল কিংবা পণ্যসামগ্রী বহনের অনুমতি নেই। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এ যানটি সড়কে চলাচল করছে। এটা খুবেই বিপজ্জনক। এদের বেশিরভাগেরই লাইসেন্স নেই। অথচ প্রতিটি ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের লাইসেন্স প্রয়োজন। এছাড়া ট্রাক্টর চালকদেরও নেই কোনো প্রশিক্ষণ। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ অবৈধ যান। 

তিনি আরো বলেন, সড়ক থেকে এসব অবৈধ যান চলাচল প্রতিরোধে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে থাকি।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর নির্বাহী প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বলেন, রংপুর জেলায় ৩৯৫ কিলোমিটার রাস্তা আছে। সবগুলো রাস্তা আগের চেয়ে অনেক ভাল। ১১টি ব্ল্যাক স্পট থাকলেও সেখানে কোনো দুর্ঘটনা হচ্ছে না। মূলত অদক্ষ চালক, ফিটনেনবিহীন গাড়ির   কারণে দুর্ঘটনা  ঘটছে। 

তিনি বলেন, সড়কে বেআইনিভাবে কোনো যানবহন চলাচল করতে দেয়া হবে না। সড়ক নিরাপত্তার জন্য এসব অবৈধ যানের চলাচল প্রতিরোধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই কথা বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) রংপুরের সহকারী পরিচালক আব্দুল কুদ্দুস। 

তিনি জানান, সড়কে  অটোরিকশা, ট্রলি-ট্রাক্টর চলাচল প্রতিরোধ করতে মাঝে মধ্যেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চাইবেন তারা।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল এ) সাইফুর রহমান বলেন, মোটরসাইকেল চালকদের তেল নিতে হলে অবশ্যই হেলমেট ব্যবহার করতে হবে। সড়কে হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালাতে পারবে না। তিনি সড়ক মহাসড়কে অবৈধ কোনো যানবহন চলাচল করতে দেবেন না বলে জানান। 

পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, সড়কে বেআইনিভাবে অবৈধ নছিমন, করিমন, মুড়িরটিন, মোটরসাইকেল, ট্রাক্টর চলাচল করছে। আমরা যতটুকু সম্ভব অভিযান পরিচালনা করে মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছি। মাসোহারা আদায়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। কেউ কখনো অভিযোগ করেনি। তবে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা প্রশাসক এনামুল হাবিব বলেন, সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী অবৈধ বৈধ নছিমন, করিমন, মুড়িরটিন, মোটরসাইকেল, ট্রলি-ট্রাক্টরের বিরুদ্ধে শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে জেলা প্রশাসন।

রংপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা জানিয়েছেন, এতদিন ম্যাজিস্ট্রেট ছিল না। তাই লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশা আটক করা সম্ভব হয়নি। অচিরেই লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশা আটক করা হবে। 


তামাক নিয়ন্ত্রণ: সরকারি অনুদানে নির্মিত
ছোটবেলায় সিনেমা হলে গিয়ে অনেক ছবি দেখতাম। চলচ্চিত্রের একটা অদৃশ্য
বিস্তারিত
ভোলায় প্রান্তিক মানুষের আস্থা গ্রাম
ভোলায় ৫ টি উপজেলার ৪৬ টি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতের
বিস্তারিত
পঞ্চাশ বছর ধরে শিক্ষার আলো
কোথাও খোলা উঠুনে চাটাই পেতে। আবার কোথাও কারো বাড়ির বারান্দায়।
বিস্তারিত
রংপুরে শিম চাষে কৃষকের সাফল্য
রংপুর জেলায় শিম চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখছে কৃষকরা। অপরদিকে
বিস্তারিত
কিশোরগঞ্জের হাওরে নির্মিত হচ্ছে স্বপ্নের
কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে প্রায় ৯ শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে সারা
বিস্তারিত
জলের ফলে দিন বদল
নদী মাতৃক এই দেশ। সারা দেশে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে
বিস্তারিত