প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব ও ইসলাম

যদি প্রশাসনকে ইসলামি রাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী পরিচালনা করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনও সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে, সুবিচার করবে, এটা তাকওয়ার নিকটতর।’ (সূরা মায়িদা : ৮)

প্রশাসন বলতে মানুষের অভিযোগ প্রদান ও সমস্যা সমাধানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিবিশেষকে বোঝানো হয়। প্রশাসন সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের হতে পারে। এটি সবসময় মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে থাকে। কারণ মানবসমাজে অন্যায়-অবিচার চলে বিধায় প্রশাসনের প্রয়োজন। অন্যথায় সভ্যসমাজ আশা করা যায় না। তবে এক্ষেত্রে প্রশাসনকে চলতে হবে তার নিজস্ব নীতিমালার ওপর। অপ্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। তাহলে জনগণ প্রশাসন থেকে আর প্রশাসন জনগণ থেকে সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব হবে। ফলে আদর্শ রাষ্ট্র বা সমাজ গঠন করতে সক্ষম হবে। মুহাম্মদ (সা.) মদিনাকে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে প্রশাসনিক শিক্ষা উপহার দিয়েছেন। এছাড়াও ওমর (রা.) এর প্রশাসনিক শিক্ষা নিয়ে এক বিশাল অধ্যায় রয়েছে, যা বিশ্বের প্রায় রাষ্ট্র অনুসরণ করে যাচ্ছে। তাই ইসলামি আইনের আলোকে প্রশাসনিক আইনকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত, স্বজনপ্রীতিমুক্ত ও দালালমুক্ত প্রশাসন সৃষ্টি সম্ভব।
বর্তমানে প্রশাসন দালালি শক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। যার দরুন প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বজনপ্রীতির মহোৎসব চলছে। প্রশাসনিকভাবে চলছে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ঘুষের লেনদেন, অযোগ্য জনশক্তি নিয়োগদানসহ অনেক অনিয়ম। যদি প্রশাসনকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করা হতো, তাহলে প্রশাসন অপশক্তির কাছে জিম্মি হতো না। জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে সক্ষম হতো। যোগ্য-ব্যক্তি দ্বারা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করা হতো। মানবসমাজে বিবাদ সৃষ্টি হতো না। একে অপরের প্রতি সহনশীল হতো। যেমনটি হয়েছিল ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.) এর শাসনামলে। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে ইসলামি রাষ্ট্রনীতিকে এমনভাবে অনুসরণ করেছেন, যার ফলে বাঘ ও ছাগল একসঙ্গে মাঠে বিচরণ করা সম্ভব হয়েছিল। অথচ বাঘের সঙ্গে ছাগল চরা একটি অসম্ভব বিষয়। 
একইভাবে বর্তমানেও যদি প্রশাসনকে ইসলামি রাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী পরিচালনা করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনও সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে, সুবিচার করবে, এটা তাকওয়ার নিকটতর।’ (সূরা মায়িদা : ৮)।
আরও বলেন, ‘আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই এবং কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। হে মানুষ! তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের অপসারিত করতে ও অপরকে আনতে পারেন, আল্লাহ এটা করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।’ (সূরা নিসা : ১৩২-১৩৩)।
জনগণের সেবা করার জন্য প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য প্রশাসনের সৃষ্টি। তাই প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে জনগণের অধিকার আদায়ে কাজ করতে হবে। এতে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি করা যাবে না। কারণ ইসলাম সবসময় অবিচার থেকে মুক্ত, ন্যায়পরায়ণতার পক্ষে কথা বলে। যারা ন্যায় ও সততার সঙ্গে শাসনভার পরিচালনা করবে তাদের ব্যাপারে পরকালে মহাপুরস্কারের কথা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ন্যায়-নীতিবান বিচারক কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তাঁর ডান পাশে দীপ্তিমান মিম্বরের ওপর অবস্থান করবে। অবশ্য আল্লাহ তায়ালার উভয় পাশই ডান। তারাই সেসব বিচারক বা শাসক, যারা নিজেদের বিচার-বিধানে, নিজেদের পরিবার-পরিজনে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে।’ (মুসলিম : ৪৮২৫)। 
আরও বলেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল। আর কেয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সুতরাং জনগণের শাসকও একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। কেয়ামতের দিন তার দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে।’ (বোখারি : ৭২২৫; মুসলিম : ৪৮২৮)।
যেসব লোক প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রশাসনিক শক্তিকে অপব্যবহার করে তাদের স্থান হবে জাহান্নামে। কারণ তারা প্রশাসনের কাজে অসৎপন্থা অবলম্বন করা মানে জাতির সঙ্গে খেয়ানত করা। সুতরাং খেয়ানতকারী-বিশ্বাসঘাতকতাকারীরা কেয়ামতের দিন দোজখের আজাব থেকে বাঁচতে পারবে না। এ মর্মে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি মুসলিম জনগণের শাসক নিযুক্ত হয়, অতঃপর সে প্রতারক বা আত্মসাৎকারীরূপে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (বোখারি : ৭২৩৯; মুসলিম : ৩৮০)।
আরও বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহ প্রজাপালনের দায়িত্ব অর্পণ করেন; কিন্তু সে তাদের কল্যাণকর নিরাপত্তা বিধান করল না, সে বেহেশতের গন্ধও পাবে না।’ (মেশকাত : ৩৫১৮)।
প্রশাসনকে জনগণ শাসন করতে গিয়ে সহনশীল হতে হবে। জনগণের দুঃখ-কষ্টে সহানুভূতি প্রকাশ করতে হবে। কারণ জনগণের প্রতি সহনশীল প্রকাশ মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘লোকদের সঙ্গে সহজ-সরল ব্যবহার করো, কষ্টদায়ক ব্যবহার করো না। তাদের সান্ত¡না প্রদান করো, বীতশ্রদ্ধ করো না।’ (বোখারি : ৬১৯৩; মুসলিম : ৪৬২৬)।
হাদিসে আরও আছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই তাঁর কোনো সাহাবিকে কোনো কাজে পাঠাতেন, তখন তাকে এভাবে উপদেশ দিতেন, তোমরা লোকদের আশার বাণী শোনাবে, নৈরাশ্যজনক কথা বলে তাদের বীতশ্রদ্ধ করে তুলবে না। তাদের সঙ্গে উদার ব্যবহার করবে, কঠোর ব্যবহার করবে না।’ (বোখারি : ৬৯; মুসলিম : ৪৬২২)।

লেখক : শিক্ষক, নাজিরহাট বড় মাদ্রাসা
ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম


নির্বাচনি ইশতেহারে ইসলামের প্রেরণা
ইশতেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বন্ধের ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য দেখতে পাওয়া যায়
বিস্তারিত
মানুষ মানুষের জন্য
শুক্রবার মানেই সাপ্তাহিক ছুটি। ছুটির দিন নানাজন নানাভাবে কাজে লাগিয়ে
বিস্তারিত
শীতের নেয়ামত বিচিত্র পিঠা
  প্রকৃতিতে বইছে শীতের সমীরণ। কুহেলিঘেরা সকাল মনে হয় শ্বেত হিমালয়।
বিস্তারিত
মহামানবের অমীয় বাণী
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে আমার উম্মতের স্বার্থে
বিস্তারিত
যুদ্ধাহত শিশুদের কথা
৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে ‘নিউ এরাব’ আরব বিশ্বের
বিস্তারিত
সুদানে গ্রামীণ ছাত্রদের শহুরে জীবন
যেসব সুদানি ছাত্র পড়াশোনা করতে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে তারা
বিস্তারিত