পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইসলাম

আমাদের চারপাশে জীব ও জড়ের সমন্বয়ে গঠিত যা কিছু আছে তাই নিয়ে পরিবেশ। পরিবেশের মূল উপাদান হচ্ছে তিনটি। মাটি, পানি ও বায়ু। এ তিনটি মূল উপাদান বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জীবজগৎকে আশ্রয় ও আহার জুগিয়ে থাকে। পৃথিবীর সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন পদ্ধতি মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তারা পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে এমন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে যে, এক ধরনের জীব বহু বিচিত্র পদ্ধতিতে অন্য ধরনের জীবকে সাহায্য করে থাকে এবং গ্রহণ করে। এর ফলে প্রতিটি প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব হয়। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী তার কোনো শরিক নেই। তিনি সব বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে পরিমিত করেছেন যথাযথ অনুপাতে।’ (সূরা ফুরকান : ৪)।

পরিবেশ আমাদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আমাদের বেঁচে থাকার সব উপাদান আমরা পরিবেশ থেকে পাই। একই প্রাকৃতিক পরিবেশে যেসব জীব জন্মায় তাদের প্রত্যেকেরই স্বাতন্ত্র্য থাকে। এরকম বিভিন্ন জীবের সংখ্যা সমষ্টিকে জীব-সম্প্রদায় বলা হয়। একেক অঞ্চলের জলবায়ু সে অঞ্চলের উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে এবং প্রাণীরাও সেখানকার উদ্ভিদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এভাবে একেক অঞ্চলের জড় পরিবেশ ও জীব সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বেঁচে থাকার জন্য এরা একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন আকাশম-লী ও পৃথিবীর সব কিছু নিজ অনুগ্রহে। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে নিদর্শন।’ (সূরা জাসিয়া : ১৩)। 
একটি নির্মল ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের ইকো সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালার গুরুত্ব সর্বাধিক। মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদা হলোÑ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা উপকরণ ও চিকিৎসা; এর সব কয়টি সরবরাহ হয়ে থাকে বৃক্ষকুল থেকে। গাছ সমগ্র প্রাণিকুলের জীবন রক্ষাদানে উপাদান অক্সিজেন সরবরাহ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেছেন, ‘তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন এরপর আমি এর দ্বারা সর্বপ্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি, আমি এ থেকে সবুজ ফসল নির্গত করেছি, যা থেকে যুগ্ম বীজ উৎপন্ন করি। খেজুরের কাঁদি থেকে গুচ্ছ বের করি, যা নুয়ে থাকে এবং আঙুরের বাগান, জয়তুন, আনার পরস্পর সাদৃশ্যযুক্ত এবং সাদৃশ্যহীন। বিভিন্ন গাছের ফলের প্রতি লক্ষ্য কর যখন সেগুলো ফলন্ত হয় এবং তার পরিপক্বতার প্রতি লক্ষ্য কর। নিশ্চয় এগুলোতে নিদর্শন রয়েছে ঈমানদারদের জন্য।’ (সূরা আনআম : ৯৯)।
মহান রাব্বুল আলামিন মানুষের কল্যাণের জন্যই যাবতীয় পশু-পাখি সৃষ্টি করেছেন। আমরা এগুলো থেকে দুধ, গোশত, চামড়া, পশম, মালামাল বহনের প্রয়োজনে, অর্থনৈতিক, চাষাবাদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপকার পেয়ে থাকি। মহামহিম আল্লাহ বলেন, ‘গবাদিপশুর মধ্যে কতগুলো ভারবাহী ও কতগুলো ক্ষুদ্রকায় পশু সৃষ্টি করেছি। আল্লাহ তোমাদের যা রিজিকরূপে দিয়েছেন, তা থেকে আহার কর।’ (সূরা আনআম : ১৪২)। কিছু পশুর পশম দিয়ে আমরা বস্ত্র ও শীতবস্ত্র তৈরি করে থাকি এবং হাড় ও দাঁত দিয়ে অনেক ব্যবহার্য জিনিস তৈরি করি। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তিনি চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য তাতে শীত নিবারণ উপকরণ ও বহু উপকার রয়েছে এবং তা থেকে তোমরা আহার করে থাক।’ (সূরা নাহল : ৫)।
পৃথিবীর তিন ভাগই পানি দ্বারা বেষ্টিত। পৃথিবীতে সমুদ্রের মোট আয়তন ৩৬১ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার। এটি পৃথিবীর জীবনচক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ গ্রহে প্রতি বছর গাছপালার মাধ্যমে যে পরিমাণ বিশুদ্ধ অক্সিজেন বায়ুতে মিশে তার সত্তর শতাংশই আসে সামুদ্রিক উদ্ভিদ থেকে। সমুদ্রই মানুষের জন্য জলজ সম্পদের ভা-ার। সমুদ্রের পানি বায়ুতে ভেসে আল্লাহর করুণার মেঘ হয়ে এসে বৃষ্টিরূপে পতিত হয়। পৃথিবীর প্রতিটি বালুকণা সিক্ত হয়ে নবজীবন লাভ করে। প্রকৃতির প্রতিটি গাছপালা ফুলে ফলে ভরে ওঠে। সবুজ শ্যামল হয়ে ওঠে ফসলের মাঠ। পানির অপর নাম জীবন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রতিটি মানুষকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া : ৩০)।
আজ পানির উৎস ভা-ার সমুদ্রই নানাভাবে দূষণের শিকার। সব ধরনের বর্জ্য, আবর্জনা এবং পারমাণবিক পরীক্ষার শেষস্থল সাগর, মহাসাগর। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ২০ বিলিয়ন টন বর্জ্য ও বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা সাগরে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জাহাজ ও ট্যাঙ্কার থেকে নিষ্কাশিত পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল, বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। নার্ভ গ্যাস, বড় ও মাঝারি আকারের পাট, কাগজ, ম-, টেক্সটাইল, সার, প্লাস্টিক, ট্যানারি, খাদ্য ও পানীয়, চিনি, তামাক, অ্যালকোহল জাতীয় শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ সরাসরি এবং মৃত্তিকা থেকে নিঃসরিত হয়ে সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। এসব বিষাক্ত বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ সমুদ্রে প্রতিনিয়ত নিক্ষেপের ফলে সামুদ্রিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। এতে সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণী ও মৎস্যকুলের অস্তিত্ব বিপর্যস্ত হতে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রে উদ্ভূত বিষাক্ত বায়ুর প্রভাবে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। সুতরাং সেদিকে আমাদের দিতে হবে সজাগ দৃষ্টি। পরিবেশ দূষণ, সামুদ্রিক দূষণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এদিকে সামুদ্রিক মাছে রয়েছে বহু উপকারিতা, আছে মানুষের প্রয়োজনীয় উপকরণ। চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মাছের মধ্যে থাকা উপাদানগুলো মানুষের হৃদযন্ত্র কার্যকর ও সুরক্ষিত রাখার জন্য কাজ করে। হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষক ড. দারিউস মোজাফফারিয়ান বলেন, কেউ যদি নিয়মিত মাঝারি মাছ খান তাহলে তার হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। সারা বিশ্বে পরিচালিত ৩০টি বড় ধরনের গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যারা প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক বা দুইবার মাছ খান তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি গড়ে ৩৬ শতাংশ কমে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা (মাছের) গোশত খেতে পার এবং তা থেকে বের করতে পার অলংকারাদি, যা তোমরা পরিধান কর। আর তুমি তাতে নৌযান দেখবে তা পানি চিরে চলছে এবং যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে পার এবং যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর।’ (সূরা নাহল : ১৪)।
পরিশেষে বলব, আমরা পরিবেশকে বাঁচানো এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এগিয়ে আসি, পরিবেশ সংরক্ষণের জ্ঞানার্জন করি, পরিবেশ রক্ষায় সচেষ্ট হইÑ তবেই সুন্দর, সবল, সুস্থ দেহে বসবাস করতে পারব। পরিবেশ হবে আমাদের অনুকূলে। সুগঠিত সমাজ পাব, পাব নয়নাভিরাম মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।


ইসলামে জবাবদিহিতা
জবাবদিহিতা ইসলামের একটি অন্যতম মৌলিক বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী তিনিই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক; তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ
বিস্তারিত
ভালো নাম মন্দ নাম
নাম একজন ব্যক্তির পরিচয় বহন করে। চাই সে পুরুষ হোক
বিস্তারিত
র‌্যাগিং : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিকৃষ্ট
মফস্বল থেকে ছেলেটি এসেছে। চোখমুখ ভরা তার মায়া। জড়তা এখনও
বিস্তারিত
উপার্জনের কিছু অংশ সঞ্চয় করুন
কাজেই আজকের দিনের জীবনমানের বিবেচনায় উপার্জন ও সঞ্চয় করা দোষণীয়
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী আল্লাহ, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই; তিনি তোমাদের
বিস্তারিত