মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

আত্মার পরিশুদ্ধির পথ ও প্রক্রিয়া

নফস মন্দ কাজের আদেশপ্রবণ। নফস প্রবৃত্তির দিকে ধাবিত। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি নিজের রবের সামনে দ-ায়মান হওয়ার ভয় করেছে এবং মনকে প্রবৃত্তি থেকে বাধা দিয়েছে জান্নাতই হলো তার ঠিকানা।’ (সূরা নাজিয়াত : 
৪০-৪১)। তিনি আরও বলেন, ‘আপনি কি লক্ষ করেননি, যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে তার উপাস্য বানিয়েছে, আল্লাহ জ্ঞাতসারেই তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কানে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তার চোখের ওপর পর্দা ঢেলে দিয়েছেন। আল্লাহর পরে তাকে কে পথ দেখাবে?’ 
(সূরা জাছিয়া : ২৩)

 

আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তাকে বাগ্মিতা শিক্ষা দিয়েছেন। তাকে ভাষা ও বুদ্ধি দান করেছেন। তাকে ভালো-মন্দ দুটি পথই দেখিয়ে দিয়েছেন। তার জন্য দুটি রাস্তার বর্ণনা দিয়েছেন। হয়তো সে কৃতজ্ঞ হবে, কিংবা অকৃতজ্ঞ। আল্লাহ তাকে নফস ও শয়তানের শত্রুতা দ্বারা পরীক্ষা করছেন। তার ভাগ্যে তৌফিক কিংবা অসহযোগিতা লিখে রেখেছেন। জান্নাত অথবা জাহান্নামের দিকে তার গন্তব্য বানিয়েছেন। তার জন্য শরিয়তের বিধিমালা প্রবর্তন করেছেন। আসমানি বিভিন্ন কিতাব নাজিল করেছেন। সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। মানুষের মধ্যে কেউ সাড়াদান করেছে এবং পরিশুদ্ধ হয়েছে। ‘আর যে পরিশুদ্ধ হয়েছে সে নিজের উপকারের জন্যই পরিশুদ্ধি লাভ করে থাকে।’ (সূরা ফাতির : ১৮)। মানুষের মধ্যে কেউ কেউ মুখ ফিরেয়ে নিয়েছে, অস্বীকার করেছে এবং লঙ্ঘন করেছে। ‘যে লঙ্ঘন করেছে সে নিজের বিরুদ্ধেই লঙ্ঘন করে থাকে।’ (সূরা ফাতহ : ১০)। জেনে রাখুন, নফস তথা মন সীমা লঙ্ঘনকারী শত্রু ও মন্দ কাজের আদেশদাতা। নফস সীমা লঙ্ঘন ও যাবতীয় অদৃশ্যের মহান জ্ঞানী রবের কাছে পৌঁছার মাঝে ওতপেতে বসে থাকে। নফস স্বভাবতই প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনার প্রতি লালায়িত। ইবাদত-বন্দেগি ও কল্যাণকর কাজ থেকে উদাসীন ও বিমুখ। নফস শয়তানের বাহন ও আসন, তার মাধ্যম ও যন্ত্র। এর দ্বারা শয়তানের আনুগত্য হয়। নফস শয়তানের প্রমাণ ও মধ্যস্থতাকারী। ‘আর যখন বিচারের বিষয়টির চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে গেল তখন শয়তান বলল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সত্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর আমি তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করেছি। তোমাদের ওপর আমার কোনো ক্ষমতা নেই, তবে আমি শুধু তোমাদের ডেকেছি আর তোমরা সাড়া দিয়েছ। তাই তোমরা আমাকে তিরস্কার করো না, বরং নিজেদেরকেই তিরস্কার করো।’ (সূরা ইবরাহিম : ২২)। নফস মন্দ কাজের আদেশপ্রবণ। নফস প্রবৃত্তির দিকে ধাবিত। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি নিজের রবের সামনে দ-ায়মান হওয়ার ভয় করেছে এবং মনকে প্রবৃত্তি থেকে বাধা দিয়েছে জান্নাতই হলো তার ঠিকানা।’ (সূরা নাজিয়াত : ৪০-৪১)। তিনি আরও বলেন, ‘আপনি কি লক্ষ করেননি, যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে তার উপাস্য বানিয়েছে, আল্লাহ জ্ঞাতসারেই তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কানে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তার চোখের ওপর পর্দা ঢেলে দিয়েছেন। আল্লাহর পরে তাকে কে পথ দেখাবে?’ (সূরা জাছিয়া : ২৩)। নফস হলো কল্যাণ ও অনিষ্টের পাত্র। আল্লাহ বলেন, ‘যাকে তার নফসের কৃপণতা থেকে রক্ষা করা হয় তারাই হলো সফলকাম।’ (সূরা হাশর : ৯)। তিনি আরও বলেন, ‘নিশ্চয় নফস মন্দ কাজের আদেশপ্রবণ।’ (সূরা ইউসুফ : ৫৩)। আল্লাহ মনের মধ্যে ভালো ও মন্দ দুটোই ঢেলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নফসের কসম এবং যিনি তাকে গঠন করেছেন তার কসম! তিনি মনের মধ্যে পাপের প্রবণতা ও তাকওয়া দুটোই ঢেলে দিয়েছেন।’ (সূরা শামস : ৭-৮)। আল্লাহ যেমনিভাবে মানুষকে বাহ্যিক ইন্দ্রিয় দান করেছেন তদ্রƒপ তিনি মনকে অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিও দান করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘বরং মানুষ তার নিজের সম্পর্কে অবগত।’ (সূরা কিয়ামাহ : ১৪)। এ অনুভবের দিকে ইঙ্গিত করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পাপ হলো তাই যা তোমার মনে দ্বিধা সৃষ্টি করেছে এবং মানুষ তা জানুক তুমি তা অপছন্দ করেছ।’ নফসের জন্য প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যবেক্ষণ, পরিমার্জন, পরিশুদ্ধি ও অনুসরণ। তাই নবী করিম (সা.) হুসাইন ইবনে মুনজির (রা.) কে বলেন, ‘বল, হে আল্লাহ, আমাকে সৎপথ দেখিয়ে দিন এবং আমার মনের অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করুন।’ রাসুলুল্লাহ আরও বলেন, ‘আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের নফসের অনিষ্ট ও অমঙ্গল থেকে পানাহ চাই।’ নফসের অনিষ্টগুলো থেকে বাঁচার পথ হলো নফসকে পবিত্র করা, রক্ষণাবেক্ষণ করা ও তাকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা। আল্লাহ তায়ালা সূরা শামসে সূর্য, চন্দ্র, দিন, রাত, আকাশ ইত্যাদি বিভিন্ন বস্তুর একটানা এগারবার কসম খেয়ে ওই ব্যক্তির প্রশংসা করেছেন যে তাকে পবিত্র করেছে এবং ওই ব্যক্তির ব্যর্থতা বর্ণনা করেছেন যে নফসকে অপবিত্র করেছে। ‘সে সফল যে নফসকে পবিত্র করেছে আর সে ব্যর্থ যে নফসকে অপবিত্র করেছে।’ (সূরা শামস : ৯-১০)। আল্লাহ মোমিনদের ওপর বিশাল বড় নেয়ামত দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ মোমিনদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের নিজেদের থেকে তাদের মাঝে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন, তিনি তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতগুলো পাঠ করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন, তাদের কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন, যদিও তারা এর আগে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৬৪)। তিনি আরও বলেন, ‘নিশ্চয় সে ব্যক্তি সফল হয়েছে যে পরিশুদ্ধ হয়েছে এবং তার রবের নাম স্মরণ করেছে, নামাজ আদায় করেছে।’ (সূরা আলা : ১৪-১৫)। ইহসান তথা সর্বোচ্চ একনিষ্ঠতার স্তর পর্যন্ত পৌঁছা ছাড়া নফসের পরিশুদ্ধি অর্জন হবে না। যে স্তরে আপনি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবেন যেন আপনি তাঁকে দেখছেন। যদি আপনি তাঁকে না দেখেন তবে তিনি আপনাকে দেখছেন। প্রবৃত্তির বিরোধিতা ও তাকওয়া আঁকড়ে ধরা ছাড়া পরিশুদ্ধি আসবে না। মন্দ কাজের আদেশপ্রবণ নফসের বিরোধিতা করা ছাড়া, যাবতীয় লালসা ও কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করা ছাড়া আত্মার পবিত্রতা অর্জন হবে না। যে ব্যক্তি নফসকে সে যা কামনা করে তাই ভক্ষণ করায় সে ওই লোকের মতো যে আগুনকে প্রচুর জ্বালানি ভক্ষণ করায়। সুতরাং যে নফসকে দমন করতে সক্ষম হয়েছে সে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং নিজেকে গঠন করতে পেরেছে। আর যে ব্যক্তি নফসের জন্য তার লাগামকে ছেড়ে দিয়েছে সে লোক নিজেকে ধ্বংস ও পতনের পথে নিক্ষেপ করেছে। জিহাদ ইসলামের অন্যতম শীর্ষ চূড়া। ইসলামের অনেক বড় একটি ফরজ বিধান। আর সবচেয়ে বড় জিহাদ হলো নফসের সঙ্গে জিহাদ করা। তাই আপনারা নফসকে তার কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখতে লাগাম পরিয়ে দিন। প্রবৃত্তি থেকে রক্ষা করতে তাকে আবদ্ধ করুন। লালসা থেকে নফসকে দমন করার মাঝেই তার মর্যাদা নিহিত আছে। আর নফসকে তার প্রবৃত্তি ও চাহিদার ক্ষেত্রে জায়গা দেওয়ার মাঝে নিহিত আছে তার লাঞ্ছনা ও অপমান। নফসের শত্রুতা শয়তানের শত্রুতার মতোই। তাই আল্লাহ এ দুটোর আনুগত্য করা থেকে কোরআনে আপনাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। ‘আর যে ব্যক্তি নিজের রবের সামনে দ-ায়মান হওয়ার ভয় করেছে এবং মনকে প্রবৃত্তি থেকে বাধা দিয়েছে জান্নাতই হলো তার ঠিকানা।’ (সূরা নাজিয়াত : ৪০-৪১)। নফস হলো অন্যায়, মূর্খতা ও মন্দ কাজের দিকে ধাবমান। তা অহংকার, বড়াই, হিংসা, লোক দেখানো মনোভাব, ক্রোধ, লোভ-লালসা, কৃপণতা ইত্যাদি ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। তাই নফসের পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধি মানে হলো তাকে এসব উপসর্গ থেকে পবিত্র করে ও মুক্ত করে তাকে উত্তম চরিত্র, সুন্দর আচরণ, শরিয়তের শিষ্টাচার যেমন ভালোবাসা, আন্তরিকতা, ধৈর্য, সততা, বিনয়, আল্লাহর ভয় ও আশা, দয়া, মমতা, দানশীলতা, তওবা, ক্ষমা প্রার্থনা, মৃত্যু ও ধ্বংসের ভয়, দুনিয়া বিমুখকতা, আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ ইত্যাদি সৎ গুণাবলি দ্বারা সজ্জিত করা। পরিতাপ ও অনুশোচনার সময় আসার আগেই আপনারা নফসকে পবিত্র করার সাধনা করুন। আপনারা নফসের পরিশুদ্ধি করতে চেষ্টা-সাধনা করুন মুখের ওপর মোহর মারার আগেই, তখন মুখ কথা কথা বলতে পারবে না, অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হয়ে সাক্ষ্য দিতে দাঁড়াবে। বুদ্ধিমান সেই লোক যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাকে দমন করেছে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করেছে। আর ব্যর্থ পরাজিত সেই লোক যে নিজেকে প্রবৃত্তির অনুসরণের পেছনে চালিয়েছে আর আল্লাহর কাছে রকমারি বাসনা পোষণ করেছে। তাই আপনারা নিজেদের হিসাব গ্রহণ করুন পরকালে আপনাদের হিসাব নেওয়ার আগেই। নিজেদের পরিমাপ করুন আপনাদের পরিমাপ করার আগেই। ২৫ মহররম ১৪৪০ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষেপিত ভাষান্তরÑ মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


পুণ্যবহুল রমজানকে পুণ্যের জন্য লুফে নিন
রমজানের প্রতি রাতে মহান প্রভুর পক্ষ থেকে কল্যাণের ঘোষক ঘোষণা
বিস্তারিত
আজকের তারাবি ১৯
আজ ১৯তম তারাবিতে সূরা আহজাব (৩১-৭৩), সূরা সাবা, সূরা ফাতির
বিস্তারিত
অনন্য ফজিলতের ইতেকাফ
পবিত্র মাহে রমজানের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল ইতেকাফ করা। রমজানের শেষ
বিস্তারিত
মাসআলা
প্রশ্ন : যদি কারও দাঁতে ব্যথা হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়
বিস্তারিত
মাহে রমজান উপলক্ষে কুইজ প্রতিযোগিতা
(সৌজন্যে : মাকতাবাতুল হাসান) আজকের প্রশ্ন কোরআনে কোন কীট সম্পর্কে
বিস্তারিত
সিজদা করুন এবং আল্লাহর নৈকট্য
রমজান মাসে কল্যাণের পথে হে প্রতিযোগিতাকারী! সিজদা ও আনুগত্য দিয়ে
বিস্তারিত