সৌদির আকাশে কীসের ঘনঘটা

সৌদি কনস্যুলেটে জামাল খাসোগি নিখোঁজের প্রতিবাদে ওয়াশিংটনে সৌদি অ্যাম্বেসির সামনে প্রতিবাদ

তুরস্কে অবস্থিত কোনো বিদেশি মিশনে মানুষ গায়েব হয়ে যাবেÑ এটা দেশটির ভাবমূর্তির ওপর হুমকি। সরকারি মহলের সঙ্গে তুর্কি মিডিয়াগুলো সক্রিয় হয়। খাসোগিকে অপহরণের অভিযোগ উঠলে সৌদি যুবরাজ বিন সালমান বক্তব্য দেন। বলেন, খাসোগি কনস্যুলেটে ঢুকেছিল ঠিক; কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে গেছে। তুরস্ক চাইলে কনস্যুলেটে তল্লাশি চালানোর অনুমতি তাদের দেওয়া হলো। বিন সালমানের বিবৃতির পর সন্দেহ ডালপালা মেলে। তাহলে কি খাসোগি কনস্যুলেটে নেই বা অপহৃত হননি? তুরস্ক সৌদি কনস্যুলেটের 
সম্মুখে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার ছবি প্রকাশ করে দেখায়, খাসোগি কনস্যুলেটে ঢুকছেন। তবে বেরিয়ে আসার ছবি নেই

তুরস্কের ইস্তানবুুলে সৌদি কনস্যুলেটে জামাল খাসোগি নিখোঁজ হয়েছেন। বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে আলোচিত এ ঘটনার সর্বশেষ খবরে জানা যায়Ñ সৌদি আরব বলেছে, তার বিরুদ্ধে কোনো অবরোধ আরোপ করা হলে সে আরও মারাত্মক পাল্টা প্রতিশোধ নেবে। (সূত্র বিবিসি, ফারসি, ১৪ অক্টোবর)। সৌদি আরবের এ হুমকি প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটি ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ইমেজ সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। শুধু ইমেজ বা ভাবমূর্তি নয়, এই নিবন্ধ লেখার সময়ের তাজা খবর হলোÑ খাসোগি নিখোঁজ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি শেয়ারবাজারে ২০১৩ সালের পর সবচেয়ে মারাত্মক দরপতন হয়েছে।
সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের বন্ধু আমেরিকা। দেশে-বিদেশে আলোচিত-সমালোচিত আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি গেল বছর সৌদি আরব সফর করেন, ইসলামি সম্মেলনে যোগ দেন। সৌদি আরবের সঙ্গে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি চুক্তির সুবাদে দেশ দুটির মাঝে নতুন বন্ধুত্বের মধুচন্দ্রিমা এখনও শেষ হয়নি। এ অবস্থায় জামাল খাসোগি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্বয়ং ট্রাম্প ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছেনÑ তিন প্রচ- ক্ষুব্ধ এবং যদি প্রমাণিত হয় খাসোগিকে সৌদি কনস্যুলেটে হত্যা করা হয়েছে, তাহলে সৌদির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানিসহ ইউরোপিয়ান শক্তিশালী দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া আরও মারাত্মক। সম্ভবত এর পরিণতি আঁচ করতে পেরেই সৌদি আরব কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বা অবরোধ আরোপ করা হলে অধিকতর মারাত্মক পাল্টা প্রতিশোধ গ্রহণের আগাম হুমকি দিয়েছে। 
ঘটনার সূত্রপাত ২ অক্টোবর। সৌদি ভিন্ন মতাবলম্বী জামাল খাসোগি তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে যান সৌদি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কাগজ সংগ্রহ করতে। সঙ্গে ছিলেন তার বাগদত্তা তুর্কি বান্ধবী খদিজা চেঙ্গিজ। হবু স্ত্রীকে বাইরে রেখে একাই কনস্যুলেটে প্রবেশ করেন। কোনো কোনো দূতাবাসের নিয়ম অনুযায়ী হাতের মোবাইলও রেখে যেতে হয় বাইরে। হবু স্ত্রীকে বলে যান, যদি আমার বেরুতে বিলম্ব হয় তাহলে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের অমুক উপদেষ্টাকে জানাবে। কনস্যুলেটের বাইরে চার ঘণ্টা অবস্থানের পরও খাসোগি বেরিয়ে না আসায় খদিজা বিচলিত হয়ে পড়েন। এ খবর চাউর হয় বিশ্ব মিডিয়ায়। 
তুরস্কে অবস্থিত কোনো বিদেশি মিশনে মানুষ গায়েব হয়ে যাবেÑ এটা দেশটির ভাবমূর্তির ওপর হুমকি। সরকারি মহলের সঙ্গে তুর্কি মিডিয়াগুলো সক্রিয় হয়। খাসোগিকে অপহরণের অভিযোগ উঠলে সৌদি যুবরাজ বিন সালমান বক্তব্য দেন। বলেন, খাসোগি কনস্যুলেটে ঢুকেছিল ঠিক; কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে গেছে। তুরস্ক চাইলে কনস্যুলেটে তল্লাশি চালানোর অনুমতি তাদের দেওয়া হলো। বিন সালমানের বিবৃতির পর সন্দেহ ডালপালা মেলে। তাহলে কি খাসোগি কনস্যুলেটে নেই বা অপহৃত হননি? তুরস্ক সৌদি কনস্যুলেটের সম্মুখে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার ছবি প্রকাশ করে দেখায়, খাসোগি কনস্যুলেটে ঢুকছেন। তবে বেরিয়ে আসার ছবি নেই। সৌদি আরবকে বলা হলো, তিনি বেরিয়ে এলে তার ফুটেজ প্রকাশ করুন। সৌদি আরব তা প্রকাশ করেনি। তুরস্কের সরকারি কর্মকর্তা ও মিডিয়া আরও কিছু ছবির বরাতে বলে, খাসোগি যেদিন সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করেন, সেদিন সৌদি আরব থেকে ভাড়া বিমানে একটি কিলার গ্রুপ এসেছিল। তারা খাসোগিকে হত্যা করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চলে গেছে। 
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সাদা রঙের ছোট্ট বিমান ইস্তানবুুলে ল্যান্ড করেছে। প্রথম দফায় নয়জন এবং পরে আরও ছয়জন সৌদি নাগরিক এসেছে। তারা কনস্যুলেটের কাছে একটি হোটেল ভাড়া নিয়েছিল কয়েক দিনের জন্য; কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর তারা চলে গেছেন। ইমিগ্রেশনে তারা সৌদি সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দেন। তুর্কি মিডিয়ার মতে, কয়েকজন ছিল সৌদি গোয়েন্দা বাহিনীর চিহ্নিত লোক। সিসি ক্যামেরার একটি ফুটেজ থেকে জানা যায়, খাসোগি প্রবেশের কয়েক ঘণ্টা পর একটি কালো রঙের গাড়ি কনস্যুলেট ভবন থেকে কনস্যুলেট জেনারেলের বাসভবনের দিকে গেছে। এতে তুরস্কের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় যে, খাসোগিকে কনস্যুলেটে হত্যা করা হয়েছে এবং পরে লাশ গুম করা হয়েছে। তুরস্ক দাবি করে, কনস্যুলেট এবং কনস্যুলার জেনারেলের বাসভবন তল্লাশির জন্য তুরস্ককে অনুমতি দিতে হবে। বিশ্ব মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় সত্ত্বেও সৌদি কর্তৃপক্ষ অস্বাভাবিক নীরবতা পালন করে। বিবিসির খবরে জানা যায়, ঘটনার ১১ দিন পর সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, খাসোগিকে হত্যার জন্য সৌদি সরকার নির্দেশ দিয়েছিল বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা ডাহা মিথ্যা, ভিত্তিহীন। সৌদি মন্ত্রীর কথা সত্য হতে পারে। অর্থাৎ সৌদি আরব সরকারিভাবে হত্যার নির্দেশ জারি করেনি। কিন্তু তিনি তো বলেননি, খাসোগিকে হত্যা করা হয়নি। নির্দেশ দেওয়া এক কথা, হত্যা করা অন্য কথা। এ ফাঁকটুকু বোঝার মগজ তো আমাদের আছে। 
তুরস্কের তল্লাশির অনুমতির জবাবে সৌদি আরব প্রস্তাব দিয়েছিল, সৌদি টিমের সঙ্গে মিলে তুরস্কের কর্মকর্তারা তদন্ত করতে পারবে। বলা হলো, ১২ অক্টোবর একটি সৌদি টিম এ উদ্দেশ্যে তুরস্কে গেছে। কিন্তু ১৪ তারিখ তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মওলুদ চাউস উগলু বলেন, ঘটনার তদন্তের ব্যাপারে সৌদি আরব তুর্কি কর্মকর্তাদের কোনো সহায়তা করেনি। ঘটনাপ্রবাহ থেকে যখন এমন সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছিল যে, খাসোগিকে সৌদি কনস্যুলেটে হত্যা করা হয়েছে, তখনই তুর্কি সরকারি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানানো হয়, খাসোগিকে কনস্যুলেটে প্রবেশের পর আরবিতে তর্কাতর্কি, তার ওপর নির্যাতন ও পরে হত্যা করা সম্পর্কিত অডিও ও ভিডিও ফুটেজ তাদের হাতে রয়েছে। বিশ্ব মিডিয়ার জিজ্ঞাসা হলো, তুরস্ক কীভাবে এ ফুটেজ সংগ্রহ করল। তাহলে কি তুরস্ক বিদেশি কনসুলেটে গোয়েন্দা নিয়োগ করেছিল বা আড়িপাতার যন্ত্র স্থাপন করেছে? যা জেনেভা কনভেনশনের বরখেলাফ? সম্ভবত এ কারণে এই ভিডিও ফুটেজটি এখনও তারা বাইরে প্রকাশ করেনি। 
মনে হচ্ছে, তুরস্ক চায় না, সৌদি আরবের সঙ্গে তার সম্পর্কের আরও একবার অবনতি হোক। গেল বছর জুনে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিশর ও বাহরাইন একযোগে তাদের ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ কাতারকে জলে-স্থলে-অন্তরিক্ষে অবরোধ করেছিল। পবিত্র রমজান মাসে আরব ঐতিহ্য লঙ্ঘন করে রোজাদার একটি জাতিকে অভুক্ত রাখার সেই পদক্ষেপে এরদোগান কাতারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে কাতার সম্ভাব্য বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পায়। সেই ঘটনা এবং ইখওয়ানুল মুসলিমিন ও ফিলিস্তিনের হামাসের প্রতি সমর্থনের কারণে সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক ততটা উষ্ণ নয়, কাজেই জামাল খাসোগি নিখোঁজের ঘটনায় এরদোগান ধৈর্যের পলিসি গ্রহণ করেন এবং এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে চান, যাতে সৌদি আরব বাধ্য হয়ে খাসোগিসংক্রান্ত তথ্যগুলো সততার সঙ্গে প্রকাশ করে। 
জামাল খাসোগি ছিলেন সৌদি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠজন। দৈনিক আল ওয়াতান পত্রিকার সম্পাদক। তার নিজস্ব একটি টিভি চ্যানেলও ছিল। তবে বেশিদিন চলেনি। তখন তিনি সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিবিসি প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন। সৌদি বাদশাহ সালমানের ছেলে যুবরাজ নিযুক্ত হওয়ার পর তার নানা পদক্ষেপের প্রতিবাদে অন্য অনেকের মতো তিনিও সমালোচনায় মুখর হন। এক পর্যায়ে আমেরিকায় চলে যান এবং সেখানে স্থায়ী বসবাস করতে থাকেন। ওয়াশিংটন পোস্টে তিনি নিয়মিত কলাম লিখতেন। পাশ্চাত্য মিডিয়ার ধারণা ছিলÑ ইউরোপ-আমেরিকা থেকে বিরুদ্ধবাদী সৌদি নাগরিকদের ফাঁদ পেতে তুলে নেওয়ার মতো খাসোগিকেও হয়তো সৌদিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে; নিজ দেশের কনস্যুলেটের ভেতর একজন মানুষ হত্যা করার মতো জঘন্য কাজ করতে যাবে না। কিন্তু এমন অকল্পনীয় কাজটি সত্য বলে প্রতীয়মান হওয়ার পর বিশ্বজনমত সৌদির বিরুদ্ধে কতখানি ক্ষিপ্ত হয়েছে তার একটি প্রমাণ ২৩-২৫ তারিখে রিয়াদে অনুষ্ঠিতব্য সৌদি বিনিয়োগ সম্মেলনে যোগদানে ব্যাপক অস্বীকৃতি। 
বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে তেলনির্ভরতা কমানো ও মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশে পরিণত করার ২০৩০ ভিশন নিয়ে অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলন থেকে বিশ্বের সেরা পুঁঁজি বিনিয়োগকারী, প্রচার মাধ্যম ও ইউরোপিয়ান দেশ নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, আমেরিকা ও ব্রিটেনও এ সম্মেলন বয়কট করার চিন্তাভাবনা করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, হজের সময় মিনায় পদদলিত হয়ে শত শত হজযাত্রী নিহত হওয়া, ইয়েমেনে অভিযান, কাতারকে বয়কট, মিশরে মুরসির পতন ও সিসির ক্ষমতায় আরোহণের পেছনে বিপত্তিকর ভূমিকার পর খাসোগিকে হত্যার ঘটনায় হাইব্রিড নেতার কারণে সৌদি আরব ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ইমেজ সংকটে পতিত হয়েছে। তুরস্ক বলেছে, তার দেশে এমন হত্যাকা-ের তদন্ত করার অনুমতি না দিলে সৌদি কনস্যুলেটের সব কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা হবে। 
পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই, ইসলামের সূতিকাগার ও লালনভূমি সৌদি আরবে ইসলামি ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপের কথা শোনা যাচ্ছে তার পরিণতি ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়ে প্রকাশ পাওয়া অসম্ভব নয়। আল্লাহর পথ ছেড়ে দুনিয়ার শক্তির কাছে ধরনা দেওয়ার পরিণাম সবসময়ই শোচনীয় হয়।


বেনামে সুদ : একটি শরয়ি
অনেক ওলামায়ে কেরাম জমি বন্ধকের এ মুয়ামালাটিকে জায়েজ করার জন্য
বিস্তারিত
মিতব্যয়িতা ইসলামে পছন্দনীয় কাজ
মানুষকে মিতব্যয়ী হতে উৎসাহিত করতে প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে
বিস্তারিত
ইসলামের দৃষ্টিতে উপহার বিনিময়
পারস্পরিক উপহার আদান-প্রদান আমাদের সামাজিক জীবনের একটি সাধারণ বাস্তবতা। বিষয়টি
বিস্তারিত
মনের জমিনের বিষাক্ত চারাগাছ
ফিলিস্তিনে মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন আল্লাহর নবী দুনিয়ার বাদশাহ হজরত
বিস্তারিত
ইসলামে মানবজীবনের দায়িত্ব
দায়িত্ব ও দায়িত্ববোধ ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এখানে প্রত্যেকেই তার
বিস্তারিত
মোজেজার তাৎপর্য
  মোজেজা চিরন্তন রীতিবহির্ভূত হতে হবে। অতএব কোনো ব্যক্তি যদি রাতের
বিস্তারিত