মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

বুদ্ধির হেরফেরে তিন মাছের পরিণতি

মসনবি শরিফের পা-ুলিপি, ওয়াল্টার আর্ট মিউজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র, ১৬০০ শতক

সাগরকূলে পরিত্যক্ত ঘেরে তিনটি বড় মাছ আশ্রয় নিয়েছিল। পড়ন্ত বিকেলে সে পথ দিয়ে যাচ্ছিল দুজন জেলে। জেলেরা দেখল, ছোট্ট পুকুরে মাছেরা দুষ্টুমিতে মেতেছে লেজে পানির ছন্দ তুলে। খানিক পায়চারি করে সিদ্ধান্ত নিল, মাছগুলো আজই ধরতে হবে। জাল-পলো আনতে তারা চলে গেল বাড়িতে। 
তিন মাছের একটি ছিল প্রখর বুদ্ধিমান। আরেকটির বুদ্ধি ছিল অর্ধেক। তৃতীয় মাছটি একেবারে আহম্মক। জেলেদের উপস্থিতি টের পেয়ে বুদ্ধিমান মাছটি সচেতন হলো। চিন্তা করল, যত কষ্টই হোক যেদিক থেকে পানি ঢুকছে, সেদিকে মুক্তির পথ খুঁজে পেতে হবে, যেতে হবে সাগরে। প্রথমে চেয়েছিল বাকি দুজনের সঙ্গে পরামর্শ করবে। কিন্তু চিন্তা করে দেখল, ওরা জলকেলিতে মত্ত, বিপদের আলামত টের পায়নি। তার কথায় তারা একমত তো হবেই না, উল্টা নানা যুক্তি দিয়ে তার সিদ্ধান্তও নড়বড়ে করে ফেলবে। পরে তাকেও যদি অবহেলা পেয়ে বসে? কাজেই পরামর্শ নেওয়ার ফুরসত এখন নেই। বুদ্ধিমান মাছ তখনই পুকুর ছেড়ে রওনা হলো সাগরের উদ্দেশে। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর সে সাগরে উপনীত হলো। তার প্রাণ রক্ষা পেল অনিবার্য মৃত্যুর হাত থেকে। 
মওলানা রুমি বলেন, হে মুসাফির! তুমি যদি পরামর্শ করতে চাও আরেক মুসাফিরের সঙ্গে কর। সাধনার পথে আছ, পরামর্শ করলে আরেক সাধকের সঙ্গে কর। নারীর মতো ঘরকুনোর সঙ্গে পরামর্শ করলে মনোবল হারাবে, তোমার চলার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। 
মাশওয়ারাত রা’ যিন্দেয়ী বা’য়দ নেকু
কে তোরা যিন্দা কুনাদ ওয়ান যিন্দা কু
পরামর্শ চাই তো কোনো জীবন্তের সঙ্গেই উত্তম
যিনি তোমায় জীবন দেবেন, কই জীবন্ত সে জন?
মওলানা আরও বলেন, ‘স্বদেশ প্রেম ঈমানের অঙ্গ’ এ হাদিসের প্রচলিত ব্যাখ্যা তুমি অতিক্রম করে যাও। কারণ তোমার স্বদেশ এখানে নয়, অন্য জগতে। কাজেই সত্য হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা করে নিজেকে অথর্ব করে রেখো না। দেখ, বুদ্ধিমান মাছ কীভাবে পুকুর ত্যাগ করে সাগরের নাগাল পেল। তুমিওÑ
সূয়ে দরিয়া আযম কুন যিন আ’বগীর
বাহর জূ ও তর্কে ইন গেরদা’ব গীর
সিদ্ধান্ত নাও এই পুকুর ছেড়ে কবে যাবে সাগরে
সাগর সন্ধানী হও বন্দি থেকো না ছোট্ট পুকুরে।
সীনা রা’ পা সা’খত মী রফত আ’ন হাযূর
আয মাকা’মে বা’ খতর তা’ বাহরে নূর
বুদ্ধিমান মাছ দেখ বুকটা বানিয়ে চলার শক্ত পা
বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে পেয়েছে নূরের দরিয়া।
মওলানা রুমি সতর্ক করেনÑ
খা’বে খরগূশ ও সগ আন্দর পেয় খাতা’স্ত
খা’ব খোদ দর চশমে তরসান্দে কুজা’স্ত
পেছনে কুকুর অথচ খরগোশের অলস নিদ্রা তোমার
কীভাবে চোখে নিদ্রা নামে ভয়ে বিজড়িত অন্তর যার?
অর্ধেক বুদ্ধির দ্বিতীয় মাছটি দেখল, তার বুদ্ধিমান বন্ধু হঠাৎ নিরুদ্দেশ। বুঝতে পারল, নিশ্চয়ই কোনো বিপদের আভাস পেয়ে দেশত্যাগ করেছে। আফসোস করল, আমি কেন সুযোগ হাতছাড়া করলাম। তার মতো দিশারি পেয়েও কেন অনুসরণ করলাম না। নচেৎ তার সঙ্গে আশ্রয় পেতাম সাগর বক্ষে। তবে ‘অতীতের জন্য যে আফসোস করতে নেই।’ তাই সময়ক্ষেপণ না করে মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া চাই। এরই মধ্যে পুকুর পাড় সরগরম হয়ে উঠল। দেখে, জেলেরা পানির চলাচল পথটি বন্ধ করে দিয়েছে। মাছের পালানোর পথ সম্পূর্ণ বন্ধ। তাহলে মুক্তির কী উপায়? মাছ মনে মনে বলল, আমি মৃত্যুর বেশ ধারণ করব। মরা মাছের মতো পেটি ওপর দিকে দিয়ে কচুরিপানার সঙ্গে ভাসব। এছাড়া যে আমার পথ নেই। 
তাসাউফ সাধনায় বলা হয়েছে, ‘মরণের আগে তুমি মরণকে বরণ কর।’ দুনিয়ার লোভ-লালসা ভোগের সামগ্রী থেকে নিজেকে গুটিয়ে নাও। নিজের সাধ্য সাধনার পথ যখন রুদ্ধ, তখন আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নিজেকে সঁপে দাও। শুধু মুখের উচ্চারণে নয়, নিজের অস্তিত্ব দিয়ে পাঠ কর, ‘লা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহÑ ‘সৎকাজ করার সামর্থ্য ও মন্দ থেকে বাঁচার শক্তি আমার নেই, একমাত্র আল্লাহর সাহায্য ছাড়া।’ 
ভাসমান মাছ পানির স্রোতে একবার কচুরিপানার ওপরে ওঠে, আবার তলিয়ে যায়। শিকারি জেলেরা দেখে বলে, হায়! বড় মাছটিই তো মরে গেছে। মাছ শুনে পুলকিত হয়, ভাবে, এই খেলায় আমার কপালে হয়তো মুক্তি লেখা আছে। একজন জেলে মাছটি হাতে নিয়ে থুতু ছিটাল। মরা মাছ বলে রেখে দিল নালার ওপরে মাছায়। হয়তো শুকিয়ে শুঁটকি হবে, খাওয়া হালাল হবে, এমন আশায়। মাছ এবার বুদ্ধি খাটায়। কোনোভাবে গড়াগড়ি দিয়ে পড়ে যায় নালায়। দেখতে না দেখতে পানিতে সে নিরুদ্দেশ। 
তৃতীয় মাছটি ছিল বুদ্ধিবিবেকশূন্য আহম্মক। নিজের বুদ্ধি সে কাজে লাগায়নি। অন্যের বুদ্ধিরও সাহায্য নেয়নি। কোনো বুদ্ধিমানকে পথের দিশারি মানেনি, মুক্তির চিন্তা তার মাথায় আসেনি। আনন্দ-ফুর্তির মধ্যে ভোগের রাজ্যে বেসামাল ছিল। শত্রুর আক্রমণে সে এখন ধাপাধাপি করে। অবশেষে পাকড়াও হয় জেলেদের হাতে। এখন তার ঠিকানা উনুনে রান্নার কড়াই। উত্তপ্ত কড়াইয়ের নিদারুণ যন্ত্রণা মাছের জন্য জাহান্নাম। 
কোরআনে এরশাদ হয়েছেÑ ‘যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি; তা কতইনা মন্দ প্রত্যাবর্তনস্থল। যখন তারা তার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তারা জাহান্নামের বিকট শব্দ শুনতে পাবে, আর জাহান্নাম থাকবে উদ্বেলিত। রোষে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে, যখনই তাতে কোনো দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তাদের রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আসেনি?’ (সূরা মুলক : ৬-৮)। 
বুদ্ধি এখন ফুটন্ত কড়াইয়ে মাছের সঙ্গে কথা বলে, হে মাছ! তোমার কাছে কি কোনো সতর্ককারী আসেনি? নিজের বুদ্ধিকে কেন কাজে লাগওনি, কোনো দিশারির বুদ্ধির সাহায্য নাওনি? জবাবে মাছ বলে, হ্যাঁ, সতর্র্ককারী এসেছিলেন, তবে আমি তো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। জীবনের এ পরিণতির কথা তখন চিন্তা করিনি।
এরশাদ হয়েছে, ‘তারা বলবে অবশ্যই আমাদের কাছে সতর্ককারী এসেছিল, আমরা ওদের মিথ্যাবাদী গণ্য করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহ কিছুই অবতীর্ণ করেননি, তোমরা (উপদেশদানকারীরা) তো মহাবিভ্রান্তিতে রয়েছ।’ (সূরা মুলক : ৬-৮)।
মাছ এখন অঙ্গীকার করে বলে, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। জীবনের যে পরিণতিকে অস্বীকার করতাম, বাস্তবে তার সাক্ষাৎ পেয়েছি। কথা দিচ্ছি, যদি মহাসংকট থেকে উদ্ধার পাই, যদি আগের জীবনে ফিরে যাই, তাহলে অবশ্যই ভালো হয়ে যাব, পরকালের পাথেয় জোগাড় করব। পথপ্রদর্শকদের কথা মেনে চলব।
মী নসা’যম জুয বে দরয়ায়ী ওয়াতান
আবগিরী রা নসা’যম মন সাকান
সাগর ছাড়া কোথাও গড়ব না আবাস
পানির ঘেরকে বানাব না স্থায়ী নিবাস।
দা’মনে আ’কেল বেগীরম রূয ও শব
তা’ নয়োফতম দর চুনীন রঞ্জো তাআব
জ্ঞানী বুদ্ধিমান দিশারির আঁচল ধরে চলব রাত-দিন।
যাতে এহেন দুর্দশায় নিপতিত না হই আর কোনো দিন।
কোরআনে কেয়ামতে অপরাধীদের করুণ অবস্থা ব্যক্ত করা হয়েছে এভাবেÑ ‘হে নবী আপনি যদি দেখতেন! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে অধোবদন হয়ে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম, এখন তুমি আমাদের ফের প্রেরণ করো, আমরা সৎকর্ম করব। আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।’ (সূরা সিজদা : ১২)।
মওলানা রুমি বলেন, এ দুনিয়ার তুলনা পরিত্যক্ত পুকুর। এখানে তিন শ্রেণির মানুষের বসবাস। একটি শ্রেণি প্রখর বুদ্ধিমান। এরা কামিল লোক। জ্ঞানবুদ্ধির প্রদীপ জ্বালিয়ে জীবনের পথ সুন্দর ও সুস্থভাবে পাড়ি দেন তারা। আরেক শ্রেণি আধা-বুদ্ধিমান। নিজের বুদ্ধিতে তারা জীবনে মুক্তির পথ বেছে নিতে পারে না, তবে জ্ঞানী লোকদের নির্দেশনা পেলে তারা সচেতন-সতর্ক হয়। স্বেচ্ছা মৃত্যুর পথ ধরে কামনা-বাসনার বন্ধন ছিন্ন করে শিকারি নফসে আম্মারা ও শয়তানের হাত থেকে রেহাই পায়। 
আর যারা আহম্মক তারা আকল ও বুদ্ধি-বিবেকের ধার ধারে না। ফলে নফসও শয়তানের পাতানো ফাঁদে পা দেয়, ধ্বংসের গহ্বরে তলিয়ে যায়। কাজেই তোমাকে আহম্মকির পথ ছাড়তে হবে। যতদিন আহম্মক হয়ে থাকবে, ভালো হয়ে চলার ওয়াদা করলেও তা পূরণ করবে না, অলসতা-অবহেলায় ভুলে যাবে। লোভের ফাঁদে দুনিয়ার পুষ্করিণীতে বন্দি হয়ে পড়বে। তখন আহম্মক মাছের মতো ভাবতে থাকবেÑ এটিই আমার জগৎ ও জীবন। এর বাইরে সাগরের মহাজীবন বলতে কিছুই নেই। ফলে বারবার ভ্রান্তির শিকার হবে। ধ্বংসের পথ ধরে অগ্রসর হবে। 
‘তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করবে। বস্তুত ধ্বংস জাহান্নামিদের জন্য। যারা দৃষ্টির অগোচরে তাদের প্রতিপালককে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।’ (সূরা মুলক : ১১, ১২)। 
(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ
৪খ. বয়েত : ২২০২-২২৮৬)


শবেবরাত অস্বীকার করা ঠিক নয়
মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কায় অবস্থিত ‘দ্বিতীয় হাসান মসজিদ’ হচ্ছে বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বইয়ের নাম : ডাবল স্ট্যান্ডার্ড   লেখক : ডা. শামসুল আরেফীন 
বিস্তারিত
হেযবুত তওহীদের প্রতিবাদ এবং লেখকের বক্তব্য
দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ১২ এপ্রিল ২০১৯ সংখ্যার ১০নং ‘ইসলাম ও
বিস্তারিত
হারাম উপার্জন সন্তানের ওপর প্রভাব
ইসলাম ধর্মমতে সব ধরনের ইবাদত-বন্দেগি কবুল হওয়ার জন্য রিজিক হালাল
বিস্তারিত
শাবান মাসের ফজিলত
প্রিয় ভাইয়েরা, এ মাসে সেসব আমলের দিকে ধাবিত হোন, যেগুলো
বিস্তারিত
শাবান মাসের ফজিলত
প্রিয় ভাইয়েরা, এ মাসে সেসব আমলের দিকে ধাবিত হোন, যেগুলো
বিস্তারিত