হেমন্তের রূপ প্রকৃতি

হেমন্তের মাঠ ছেয়ে যায় হলুদ-সোনালি ধানে ধানে। কৃষকের মুখে তখন ফুটে ওঠে অকৃত্রিম আর অনাবিল হাসি। ধান কাটার পর শুরু হয় নবান্ন উৎসব। নবান্ন মানেই চারদিকে পাকা ধানের ম-ম গন্ধ, নতুন অন্ন, গ্রামের মাঠে মাঠে চলে ধান কাটার ধুম। হেমন্তে এ ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই 
ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন উৎসব

আল্লাহর তৈরি প্রকৃতি কতই না সুন্দর ও প্রাণবন্ত! সবুজ-শ্যামল গ্রাম-বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য সহজেই মন কাড়ে সবার। সবুজে ছাওয়া গ্রামের প্রকৃতির সুষমা অতুলনীয়। সঠিক দৃষ্টিকোণে সে সৌন্দর্য অবলোকন করলে ঈমান পোক্ত হয় প্রতিটি মোমিন হৃদয়ে। কোরআনে এরশাদ হয়েছেÑ ‘দয়াময় স্রষ্টার সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না। তোমার দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দেখো, কোনো ত্রুটি দেখতে পাও কি? আবার দেখো; আবারও। তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে আমারই দিকে ফিরে আসবে।’ (সূরা মুলক : ৩-৪)।
ঋতুচক্রের পালাবদলে গ্রামের অপরূপ সৌন্দর্য আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে। একেক ঋতুর একেক সৌন্দর্য। কখনও প্রচ- রোদ্দুরে জ্বলে যাওয়া মাঠ, কখনও রিমঝিম বর্ষার অনুপম ছন্দ, কখনও কাশফুলের দিগি¦দিক ওড়াউড়ি, কখনও হেমন্তের স্নিগ্ধ পরিবেশ, কখনও হাড়-কাঁপানো শীত, কখনওবা কুহু কুহু তানে কোকিলের গান। ঋতুর এ মন-ভোলানো সৌন্দর্যে আহ্লাদিত হয় মানুষের মন। অকৃত্রিম ভালোলাগা পরশ বুলিয়ে যায় প্রাণে প্রাণে। মনের অজান্তেই তখন মুখ ফুটে বেরিয়ে আসে ‘সুবহানআল্লাহ’ ধ্বনি। এতসব সুন্দরের কথা উল্লেখ করে কোরআনে এরশাদ হয়েছেÑ ‘আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালার ভার স্থাপন করেছি এবং তাতে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ উদ্গত করেছি। এটা জ্ঞান আহরণ ও স্মরণ করার মতো ব্যাপার প্রত্যেক অনুরাগী বান্দার জন্য। আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা দ্বারা বাগান ও শস্য উদ্গত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয় এবং লম্বমান খর্জুর বৃক্ষ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খর্জুর, বান্দার জীবিকাস্বরূপ এবং বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এভাবে পুনরুত্থান ঘটবে।’ (সূরা কাফ : ৬-১১)।
শরতের সাদা কাশফুল স্নিগ্ধ হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে হেমন্ত আসে হিম কুয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে। কার্তিক-অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্তকাল। প্রকৃতিজুড়ে তখন তৈরি হয় নতুন আবহ। শিশির বিন্দু ঝরার টুপটাপ শব্দ আর মৃদু শীতলতা জানান দিয়ে যায় ঋতু পরিবর্তনের এ খবর। প্রতিটি প্রাণে জেগে ওঠে চাঞ্চল্যের শিহরণ। হেমন্তের ভোর কুয়াশায় আচ্ছাদিত হয়ে থাকে। হিম শীতলতায় ছেয়ে যায় চারপাশ। লতাপাতা থেকে ঝরে পড়ে টুপটাপ শিশিরবিন্দু। এ যেন কোনো আহ্লাদি বালিকার নূপুরনৃত্যের ঝংকার। একটু পর লাল লালিমা ছড়িয়ে সূর্য উঠে পুব দিগন্তে। দূর্বাঘাসের ডগায় ছড়িয়ে থাকা শিশিরজলে সূর্যালোক পড়ে মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করে। এ যেন শীতকালের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। কোমল শীতলতা মনে করিয়ে দেয় শীতকাল এলো বলে!
শিশিরস্নাত সকাল, কাঁচাসোনা রোদমাখা স্নিগ্ধসৌম্য দুপুর, পাখির কলকাকলি ভরা আলো-আঁধারিময় সন্ধ্যা আর মেঘমুক্ত আকাশে জ্যোৎস্নাময় আলোকিত রাত হেমন্তের মায়াবী রূপকে যেন আরও রহস্যময় করে তোলে সবার চোখে। চারপাশে শুধু প্রকৃতির সুন্দর রূপ খেলা করে। মহান আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি দেখে ক্ষণিকের জন্য হলেও নন্দন মুগ্ধতায় হারায় ভাবুক মন। হেমন্তের সৌন্দর্যের স্রোতে ভেসে কবি সুফিয়া কামাল লিখেছেনÑ ‘সবুজ পাতার খামের ভেতর/হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে/কোন পাথারের ওপার থেকে/আনল ডেকে হেমন্তকে।’
হেমন্ত প্রকৃতিতে গ্রামীণ জীবনের নিখুঁত চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে পল্লিকবি জসীম উদ্দীনের কবিতায়। তিনি লিখেছেনÑ ‘আশ্বিন গেল কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান/সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান। 
ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়ায় বায়ু/কলমি লতায় দোলন লেগেছে, ফুরাল ফুলের আয়ু।’ (সুখের বাসর, নক্সীকাঁথার মাঠ)।
হেমন্তের মাঠ ছেয়ে যায় হলুদ-সোনালি ধানে ধানে। কৃষকের মুখে তখন ফুটে ওঠে অকৃত্রিম আর অনাবিল হাসি। ধান কাটার পর শুরু হয় নবান্ন উৎসব। নবান্ন মানেই চারদিকে পাকা ধানের ম-ম গন্ধ, নতুন অন্ন, গ্রামের মাঠে মাঠে চলে ধান কাটার ধুম। হেমন্তে এ ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন উৎসব। গৃহস্থবাড়িতে নতুন ধানে তৈরি পিঠাপুলির সুগন্ধ বাতাসে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে হেমন্তের এ শাশ্বত রূপ চিরকালীন।
একসময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। সম্রাট আকবর বাংলা পঞ্জিকা তৈরির সময় ‘অগ্রহায়ণ’ মাসকেই বছরের প্রথম মাস বা খাজনা আদায়ের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ‘অগ্র’ এবং ‘হায়ন’ এ দুই অংশের অর্থ যথাক্রমে ‘ধান’ ও ‘কাটার মৌসুুম’। বর্ষার শেষদিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে পরিপক্ব হয় ধান। অগ্রহায়ণে ফসল ঘরে তোলা হয়। বলা হয়ে থাকে, ‘মরা’ কার্তিকের পর আসে সর্বজনীন লৌকিক উৎসব ‘নবান্ন’।
হেমন্তের নবান্ন উৎসবের ছোঁয়া লেগেছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়। তিনি লিখেনÑ ‘ঋতুর খাঞ্জা ভরিয়া এলো কি ধরণীর সওগাত?/নবীন ধানের আঘ্রাণে আজি অঘ্রান হলো মাৎ।
‘বিন্নি পলাশ’ চালের ফিরনি/তশতরি ভরে নবীনা গিন্নি/হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশিতে কাঁপিছে হাত/শিরনি রাঁধেন বড় বিবি, বাড়ি গন্ধে তেলেসমাত। মিঞা ও বিবিতে বড় ভাব আজি খামারে ধরে না ধান/বিছানা করিতে ছোট বিবি রাতে চাপা সুরে গাহে গান; শাশবিবি কন, আহা, আসে নাই/কতদিন হলো মেজলা জামাই।’
হেমন্তে চোখ-জুড়ানো মন-মাতানো ফুলের বাহারে সাজে অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতি। ফুলের সৌরভে সুরভিত হয় চারপাশ। এ ঋতুতে ফোটে গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, শাপলা, পদ্ম, কামিনী, হিমঝুরিসহ নাম না-জানা হরেক রকম ফুল। খালবিল, নদীনালা আর বিলজুড়ে দেখা যায় সাদা-লাল শাপলা আর পদ্মফুলের মেলা। বসন্তকে ঋতুর রাজা বলা হয়। বিপরীতে হেমন্তকে ঋতুর রানি বললে অত্যুক্তি হবে না একটুও। মহান স্রষ্টার সুন্দর এতসব সৃষ্টি দেখে মনের অজান্তেই মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে আল্লাহর এ অমেয় বাণী, ‘পৃথিবীর ওপর যা রয়েছে, সেগুলোকে আমি তার শোভা করেছি মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ।’ (সূরা কাহাফ : ৭)।
হেমন্তে হাওর-বিল ও খাল-নদীর পানি কমে গিয়ে বেরিয়ে আসে ছোট-বড় অনেক মাছ। জেলেদের মাছ ধরার চিত্র তখন হয় চোখে পড়ার মতো। সকালের হিম কুয়াশা গায়ে মেখে গ্রামের শিশিরসিক্ত আলপথ ধরে কিশোররা দলবেঁধে চলে মাছ ধরতে। ঠান্ডা পানিতে নেমে মাছ ধরার আনন্দটাই যেন অন্যরকম। সারাদিন ছোট-বড় মাছ ধরে ডেকচি ভরে সন্ধ্যায় জেলেরা নিয়ে যায়। গ্রামের সে অনিন্দ্য চিত্র সত্যিই মুগ্ধকর।
যে মহান আল্লাহ হেমন্তের এ সুন্দর প্রকৃতি আমাদের উপহার দিলেন তাঁর কৃতজ্ঞতা জানানো প্রত্যেকের কর্তব্য। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেনÑ ‘আমার নেয়ামত পেয়ে যদি শুকরিয়া আদায় করো, তাহলে আমি নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তাহলে মনে রেখো, আমার শাস্তি খুবই কঠিন।’ (সূরা ইবরাহিম : ৭)।
হেমন্তকে আমরা পাই আমাদের প্রাণের মধ্যখানে। মহান আল্লাহর সৃষ্ট এ বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম মেনে ভালোলাগার অপূর্ব পরশ বুলিয়ে একসময় আমাদের থেকে বিদায় নেয় চির আরামপ্রদ এ ঋতু। আরও একটি বছরের জন্য হারিয়ে যায় বাংলার চতুর্থ ঋতু হেমন্ত।


পরস্পর দয়া প্রদর্শনে উপদেশ দিন
উসামা বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজির মেয়ে
বিস্তারিত
যিনি ধনীদের মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে
আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) এর স্মৃতি জর্দানের রাজধানী আম্মানের উত্তরের
বিস্তারিত
কীভাবে বুঝবেন আল্লাহ আপনার প্রতি
আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রতিটি বিশ্বাসী হৃদয়ের একান্ত চাওয়া। কিন্তু কীভাবে বুঝবেন
বিস্তারিত
আল্লাহর অন্যতম নেয়ামত মাছ
প্রকৃতিজুড়ে এখন চলছে হেমন্তের রাজত্ব। নতুন ধানের নবান্ন উৎসবের পাশাপাশি
বিস্তারিত
রূপে ভরা হেমন্ত
প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছে হেমন্ত। শিশির বিন্দু
বিস্তারিত
প্রাণীবন্ধু গাসসান রিফায়ি
টানা ৩০ বছর বাইতুল মুকাদ্দাস চত্বরের বিড়াল ও পাখিদের খাবার
বিস্তারিত