সাজেক ভ্যালি

মেঘ যেখানে ছুঁয়ে যায়

সাজেক ভ্যালিতে মেঘ ছুঁয়ে যায়

অপরূপ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে সাজেক ভ্যালিতে দু-এক রাত কাটিয়ে আসা একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা হতে পারে। সেখানে পাহাড়ের লতা-গুল্ম বৃক্ষরাজিতে নিয়ত চুমু খায় আকাশের দিগন্ত রেখা। প্রভাতে দিগন্ত বিস্তৃত শুভ্র-সুন্দর কুয়াশার চাদর আপনাকে স্বাগত জানাবে। গোধূলির আবির-মাখা রং আপনার দেহ-মন রাঙিয়ে তুলবে। মেঘের বুকে চাঁদের লুকোচুরি আপনার রাতের নিস্তব্ধতাকে কাব্যিক আবেগে ভরে তুলবে। টিনের চালে বৃষ্টির নাচন এক মোহময় পরিবেশের জন্ম দেবে, যা শহুরে জীবনে বিরল। প্রকৃতি যেন মনের মাধুরী মিশিয়ে সৃষ্টি করেছে এ সাজেক ভ্যালি।
এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে আপনি যেমন অভিভূত হবেনÑ তেমনি মোহাবিষ্টিত হবেন এখানকার পাহাড়ি মানুষের সহজ-সরলতায়। নাগরিক জীবনের কোলাহল যেমন সেখানে নেইÑ তেমনি নেই শহুরে জীবনের কূটিলতা। প্রকৃতির কোলে বড় হওয়া বলেই হয়তো তাদের বেশিরভাগ মানুষ কপটতা জানে না; জানে না কী করে অন্যকে ঠকাতে হয়। 
খাগড়াছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে ৬৯ কিলোমিটার পাহাড়ি এ পথটি সত্যিই একটা অ্যাডভেঞ্চার। এতে সত্যিকারের ভ্রমণ পিপাসা মেটানোর সব ধরনের উপকরণ আছে। এক পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আরেক পাহাড়ের শীর্ষদেশ অতিক্রম করার এক নিরন্তর প্রচেষ্টার ভেতর দিয়ে আপনি পৌঁছে যাবেন সাজেকের চূড়ায়। পথের এ চড়াই-উতরাই আপনার মনে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগাবে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছতে হলে, প্রকৃতিকে চেখে অনুভব করতে হলে আপনাকে পথের ছোটখাটো বাধা অতিক্রম করতেই হবে। 
পথের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে আছে আবিষ্কার করার মতো নানা কিছু। পথপাশে একটু তাকালেই দেখবেন প্রকৃতির কোলে জন্ম নেওয়া কিছু পাহাড়ি মায়াময়ী শিশু আপনাকে হাত নেড়ে নেড়ে স্বাগত জানাচ্ছে। এসো, এসো, এসো আমার আতিথেয়তায় এসো। চিপস, চকলেট বা অন্য কোনো শুকনো মিষ্টি জাতীয় খাবার দিয়ে এদের স্বাগত আহ্বানের সাড়া দিতে হয়। এদের দেখে আপনার গাড়ি থেমে গেলে ওরা আরও আপন করা হস্ত-ভঙ্গিমায় আপনাকে স্বাগত জানাবে। আপনি আপনার আদরের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তাদের জন্য বয়ে নেওয়া উপঢৌকন তাদের হাতে পৌঁছে দেবেন। এ এক অন্যরকম অনুভূতিÑ বাংলাদেশের অন্য কোনো অঞ্চলে এ ধরনের আচার দেখা যায় কি না আমার জানা নেই। খবর নিয়ে জানা গেল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা পাহাড়ি-বাঙালির মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনুষঙ্গ হিসেবে এ আচারের সূচনা করেছিলেন। আজ এ চমৎকার প্রচলনটি সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে। 


তবে আপনি ব্যথিত হবেন, আমাদের মতো কিছু কিছু শহুরে মানুষের আচরণ দেখে। তারা গাড়ি থেকে নামা তো দূরে থাকুক, গাড়ির গতি সামান্যটুকুও শ্লথ করেন না, পাখিকে খাবার ছিটানোর মতো করে চলন্ত গাড়ি থেকে খাবার ছুড়ে মারেন। এ দৃশ্য আমাকে ব্যথিত করেছে। মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, স্নেহ-মমতার লেশমাত্র থাকলে এমনটি করা সমীচীন নয়। 
পাহাড়ের পথ চলায় আরও যা দেখবেন তা হলো সমতল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। চার-পাঁচজন পাহাড়ি নারী রাস্তার পাশে কিংবা ছোট ছোট চালা ঘরের মেঝেতে বসে গল্প করার ছলে ক্ষণিক বিশ্রাম নিচ্ছেন। তারপর হয়তো আবার জীবন-সংগ্রামের কঠোর ব্রতে নিয়োজিত করছেন নিজেদেরÑ সকাল-সন্ধ্যা-রাত পর্যন্ত। 
ভোর বেলায় সাজেকে আরও সুখকর একটি দৃশ্য চোখে পড়ে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বই-খাতা হাতে হেঁটে যাচ্ছে তাদের গন্তব্যেÑ স্কুলের দিকে। তাদের সঙ্গে কোনো অভিভাবক নেই। তাদের মনে কোনো শঙ্কাও নেই। দুর্ঘটনা বা হারিয়ে যাওয়া বা ছেলে-ধরার কোনো ভীতি নেই। প্রকৃতির মতোই নির্ভয় নিঃশঙ্ক তাদের চলাচল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল সাজেক ভ্যালিতে দুটি বিদ্যালয় আছেÑ একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়; অন্যটি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেখাপড়া শেখানো হয়। সম্ভবত ডিজিটাল বাংলাদেশের এটি উল্লেখযোগ্য অবদান। পাহাড়ের পাদদেশে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেখাপড়ার সুযোগ তৈরিÑ সত্যিই আশার আলো ছড়ায়। অন্য স্কুলটি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। যেখানে পাহাড়ি ছেলেমেয়েরা নিঃশঙ্ক-নির্ভাবনায় লেখাপড়া করে। 
সাজেকের কটেজগুলো রঙিন করে সাজানো। দুটো রং বিশেষভাবে ব্যবহৃত হচ্ছেÑ লাল ও নীল। সবুজের সমারোহে লালের তিলকসম কটেজগুলো পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। 
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের উত্তর-পূর্ব কূল ঘেঁষে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়ন এখন দেশ-বিদেশে ‘সাজেক’ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সমাদৃত। সাজেকের দু-পাশে ভারতের মিজোরাম। 


বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দুর্গম সাজেক উপত্যকাকে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে কাজ শুরু করে। কাজের দায়িত্ব বর্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর খাগড়াছড়ি রিজিয়নের ওপর। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার চ্যালেঞ্জে সেনাবাহিনীর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর সাজেকের রুইলং এলাকায় পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কাঠামোগত উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চালায় সেনাবাহিনী। বর্তমানে সাজেক বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে রূপ পেয়েছে। সাজেকের পর্যটন খাতকে পুঁজি করে জীবিকা নির্বাহ করছে সাজেকের অদিবাসীসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যবসায়ী। 
সাজেকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকায় সৌরবিদ্যুৎ একমাত্র ভরসা। এছাড়া কিছু কিছু কটেজ ও ব্যবসায়ী জেনারেটরের সাহায্যে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করেছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ ফুট উচ্চতায় সাজেকের রুইলুইপাড়া অবস্থিত হওয়ায় পানির লেয়ার পাওয়া খুব কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। রুইলুইপাড়ার নিচের একটি পাহাড়ি ছড়া থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। স্থানীয়দের জন্য সুপেয় পানির জন্য সেনাবাহিনী উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে একটি চৌবাচ্চায় তা সংরক্ষণ করে। সেখান থেকে সবাই পানি ব্যবহার করেন। 
পর্যটন কেন্দ্রে রূপ পাওয়ার পর থেকে সাজেকে বসবাসকারীদের জীবনযাত্রার মান ব্যাপকভাবে উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, দরিদ্র অধিবাসীদের জন্য উন্নত বাসস্থানসহ এলাকার আমূল উন্নয়ন সাধন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর খাগড়াছড়ি রিজিয়ন।
সাজেক রাঙ্গামাটি জেলার অন্তর্গত হলেও সড়কপথে যোগাযোগ করতে হয় খাগড়াছড়ি দিয়ে। খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৬৯ কিলোমিটার। আঁকাবাঁকা সর্পিল পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যেতে হয় সাজেকে। পথিমধ্যে চোখ আটকে যাবে পাহাড়ি নদী কাচালং-মাচালং ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার দৃশ্য দেখে। সাজেকে ঢুকতেই রুইলুইপাড়া। রুইলুইতে পাংখো ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বসতি। সড়কগুলোও উন্নত কাঠামোর আদলে গড়া। রুইলুইপাড়ায় সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু বিনোদনের মাধ্যম রাখা হয়েছে। এর মধ্যে হ্যারিজন গার্ডেন, ছায়াবীথি, রংধনু ব্রিজ, পাথরের বাগান উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য একাধিক বিশ্রামাগার ও ক্লাবঘরও রয়েছে রুইলুইপাড়ায়। সাজেকের সবশেষ সীমানা কংলাক। কংলাক রুইলুই থেকে আরও দেড় ঘণ্টার হাঁটার পথ। কংলাক পাংখোয়াদের আদি নিবাস। পাংখোয়ারা সবসময় সবার উপরে থাকতে বিশ্বাসী। তাই তারা সর্বোচ্চ চূড়ায় বসবাস করে। কংলাকের পরেই ভারতের মিজোরাম।
সাজেক ভ্যালিতে কোনো বাজার এখনও গড়ে ওঠেনি। সেখানকার মানুষদের সওদার জন্য বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিয়ে মোছালং নামক স্থানে যেতে হয় কেনাকাটার জন্য। তবে রাস্তার ধারে মাঝেমধ্যে ছোটখাটো দোকানের দেখা মেলে। সেখানে আপনি ইচ্ছে করলে হালকা খাবার খেয়ে নিতে পারেন। সাজেকে যেমন বাজার নেই, তেমনি নেই কোনো ওষুধের দোকান। ছোটখাটো শারীরিক সমস্যার সমাধানে আগে থেকেই সতর্ক হয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। 
সমতল থেকে যেসব খাবার আনা হয় যেমনÑ চাল-ডাল-সবজি-মাছ-মাংস ইত্যাদি বেশ চড়া দামে বিক্রি হয়। চাল প্রতি কেজি ৫০/৬০ টাকা। অথচ সাজেকে যেসব ফলমূল উৎপাদিত হয়Ñ কলা-আনারস-পেঁপে-কাঁঠাল এগুলো বড়ই সস্তা। আপনি এক কাঁদি কলা ১০০ টাকায় কিনতে পারবেন অথবা ৫ টাকায় একটি বড় আনারস।


অথচ যারা পৃথিবীর উন্নত দেশের দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করেছেন তারা জানেন ট্যুরিস্ট স্পটে জিনিসের দাম অন্য জায়গা থেকে বেশি। যেমনÑ সিঙ্গাপুরের সান্তুসা কিংবা ফ্লোরিডা ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে যান, দেখবেন ৫ ডলারের জিনিসের দাম ১৫ ডলার। পর্যটকরা যেন টাকা খরচ করতে গা-ই করেন না। অথচ সাজেকে দেখছি এক ধনাঢ্য ব্যক্তি এক হালি বেশ বড় বাংলা কলা ৮ টাকায় কিনে এনে তার পরিবারকে বলছেনÑ এখানে কলার দামটা একটু বেশি! 
যারা ভূস্বর্গ সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহর অথবা সিকিমের গ্যাংটক কিংবা দার্জিলিংয়ের কালিম্পংয়ে গেছেন তাদের কাছে হয়তো সাজেক ভ্যালি খুব বেশি আকর্ষণীয় মনে হবে না। দার্জিলিংয়ে আপনি অবলীলায় মেঘ ছুঁতে পারেন; কিন্তু সাজেক ভ্যালিতে মেঘ আপনাকে ছুঁয়ে যাবে। রাতে ফানুস ওড়ানোর চেষ্টা করবেন, সফল না-ও হতে পারেন। কারণ ফানুস-বেলুনটি আপনার অগোচরেই ভিজে গ্যাছে বৃষ্টি নয়Ñ না-দেখা মেঘের ছোঁয়ায়। 
তবে সাজেকের স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন কিন্তু সহজ নয়। প্রকৃতির কোলে প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। বনের ফল-ফসলই তাদের আহার-আশ্রয়ের ভরসা। পাহাড়ে উৎপাদিত ফল-ফসলের মধ্যে কলা-আনারস-পেঁপে-কাঁঠাল অন্যতম। পথের দুধারে কলা আর কাঁঠালের বাগান পাহাড়িদের জীবিকার অন্যতম উপাদান। 
তাদের জীবন-সংগ্রামকে কঠিন করে রেখেছে প্রধানত দুটো জিনিসের অভাব। প্রথমত পানি, দ্বিতীয়ত বিদ্যুৎ। পানির জন্য তারা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। পানির উৎস প্রধানত দুটোÑ বৃষ্টির পানি এবং ছড়া বা ঝরনার পানি। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি পাত্রে জমিয়ে রেখে তারা পানির অভাব পূরণ করে। তার সঙ্গে আরও একটি সোর্স আছে পাহাড়ি ছড়াÑ যা দুই পাহাড়ের পাদদেশে শত শত ফুট নিচ দিয়ে বয়ে চলা ক্ষুদ্র পানির স্রোত। ওইসব প্রাকৃতিক আধার থেকে পাহাড়ি নারীরা বহু কষ্টে মাথায় করে পানি বহন করে আনেন। যেখানে সমতলের মানুষের জন্য শুধু শরীরটাকে বহন করে উপরে ওঠাই দায়, সেখানে তারা কলসিভর্তি পানি মাথায় নিয়ে দৃঢ়পদে আস্তে আস্তে শত শত ফুট উপরে উঠে আসে পরিবারের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য। 
সাজেক ভ্যালিতে প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় নির্ধারিত আছে। আপনি ইচ্ছে করলেই দিনের যে কোনো সময়ে সেখানে যাতায়াত করতে পারবেন না। সাজেকে প্রবেশের সময় সকাল সাড়ে ১০টা ও  বিকাল সাড়ে ৩টা এবং প্রস্থানের সময় সকাল সাড়ে ১০টা ও  বিকাল সাড়ে ৩টা। এখানে প্রবেশ ও প্রস্থানের যথেষ্ট কড়াকড়ি আছে সমতলবাসীদের জন্য। বেশ কয়েকটি চেকপোস্টে আপনার পরিচয় দিয়ে সেখানে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে হবে। তবে পাহাড়িদের জন্য কোনো সময় বেঁধে দেওয়া নেই। তারা তাদের ইচ্ছেমতো দিনের যে কোনো সময়ে আসা-যাওয়া করতে পারেন। 
সাজেকের জীবন সন্ধ্যা ৯টার মধ্যে স্থবির হয়ে যায়। এমনিতেই সেখানে নেই গাড়ির ধোঁয়া, নেই হর্নের আওয়াজ অথবা হকারের ডাক। আকাশ আড়াল করা অট্টালিকা নেই; সেখানে শহুরে জীবনের কোলাহল নেই; নেই যানজটে ওষ্ঠে-ওঠা প্রাণ।
সম্প্রতি আমরা কয়েকটি পরিবার সাজেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সেখানে গিয়েছিলাম। ঢাকার কলাবাগান থেকে হানিফ পরিবহনের বাসে করে রাত সাড়ে ১০টায় রওনা হয়ে খাগড়াছড়ি বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছি সকাল ৭টায়। এরপর আরও ৬৯ কিলোমিটার যাই চাঁন্দের গাড়িতে করে। সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা। বাস জার্নি মোটামুটি ভালো। তবে যাত্রীদের কারও কারও মাঝে যদি সিভিক্স সেন্সের অভাব থাকে, তাহলে সেটা হতে পারে অন্যের জন্য চরম বিরক্তিকর। যেমন, আমাদের বাসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪/৫ জন ছাত্র ছিল। তাদের আচরণে মনে হচ্ছিল বাসটিতে যেন এরা ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী নেই। উচ্চশব্দ করে কথা বলা, ব্যক্তিগত গল্পকাহিনি বলাবলির মাধ্যমে গভীর রাতে বাসের পরিবেশ অসহনীয় করে তুলছিল। বাস অ্যাটেন্ট বাসের সব আলো নিভিয়ে দিয়ে যাত্রীদের ঘুমের আমেজ তৈরি করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ছাত্ররা এ পরিবেশকে ভ্রুকুটি করে যেন নিজেদের জাহির করার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এ আচরণ কখনও কাম্য নয়। 
সাজেক দেখে মনে হলো সাজেকের দিগন্ত রেখার দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশ কিছু স্থাপনা গড়ে উঠছে। যেগুলো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সাজেকের চেহারা পাল্টে দিতে পারে। 
খবর নিয়ে জানা গেছে, এই নতুন গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলো সমতলের মানুষের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তবে পাহাড়িরা তাদের জমির মালিকানা বিক্রি করে দিচ্ছে না, বরং কয়েক বছর মেয়াদি লিজ দিচ্ছে। এ চুক্তিবদ্ধ সময় অতিক্রান্ত হলে সমতলবাসীরা এ স্থাপনাগুলো জমির মালিক পাহাড়িদের কাছে ফিরিয়ে দেবে ও তারাই হবে এগুলোর প্রকৃত মালিক। সমতলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এ চুক্তিগুলো সম্পাদন করেন পাহাড়িদের হেডম্যানরা। এ হেডম্যানরা চেয়ারম্যান-মেম্বারদের চেয়েও অনেক বেশি সম্মানের আসনে আসীন। তাদের কথার বাইরে পাহাড়িদের কোনো কাজ হয় না বা করেন না। তারা পাহাড়িদের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকেন। তাদের সঠিক পথে চলতে নির্দেশনা দেন। তারা অতি সম্মানীয়, শ্রদ্ধেয়। 
সাজেকের সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল বাংলাদেশি-আমেরিকান ষোড়শী নদী নামক এক তরুণীর সঙ্গে। দেশে বেড়াতে এসেছে বাবা-মায়ের সঙ্গে। জিজ্ঞেস করলাম কেমন লাগছে সাজেক? উত্তরে নদী বলল বেশ ভালো, আমাদের আমেরিকার চেয়েও ভালো লাগছে। 
আসলে ভালো লাগার অনুভূতি ও অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে যদি কেউ সাজেকে যান, সত্যিই ভালো লাগার সব উপকরণ পাবেন সেখানে। নির্জনে খানিকক্ষণ বসে প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যে নিজেকে মেলে ধরেনÑ মনে হবে আপনি আর প্রকৃতি একে অপরের খুব কাছাকাছি। 
সাজেকের সৌন্দর্য উপভোগ করা সেদিন পর্যন্তও সম্ভব ছিল না। ১৯৯৬ সালের শান্তিচুক্তির পর থেকে শুরু হয় পাহাড়ি বাঙালির মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। এ কাজে যাদের ভূমিকা অগ্রণী তারা হলো আমাদের সেনাবাহিনী। পাহাড় কেটে রাস্তা বানিয়ে আমাদের সঙ্গে পাহাড়ের সংগ্রামী কিন্তু সরল মানুষের মাঝে সম্প্রীতির চেষ্টা ফললাভ করে ২০১৩ সালে এসে। সমতলবাসী আর পাহাড়িদের মধ্যকার অবিশ্বাস, অস্বস্তি দূর করে শান্তির ও সম্প্রীতির এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী। 


সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত
পাখি শিকারিদের পা
অর্ধমৃত চোখটি পাহারা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে অন্য চোখ।
বিস্তারিত
এমনই নিশ্চিহ্ন হবে একদিন
এমনই নিশ্চিহ্ন হবে সব চিহ্ন একদিন মুছে যাবে অক্ষত ক্ষতচিহ্ন, ছোপ
বিস্তারিত
পদ্মপ্রয়াণ
বিগত পুকুর ভরাট করে সূর্যমুখীর চাষ করেছি  সেদিন জলের টান ছিঁড়ে
বিস্তারিত
শিল্পীর দায় ও সমাজ
শিল্পীর সামাজিক দায়ের বিষয়টি আপেক্ষিক ও বহুমাত্রিক। সমাজ ও সময়ের
বিস্তারিত