জলের ফলে দিন বদল

নদী মাতৃক এই দেশ। সারা দেশে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে হাজারো নদী, খাল, বিল, ডুবা ও পুকুর। চলমান নদীতে প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ ছাড়া ইচ্ছানুযায়ী কোনো ফসল চাষ করার উপায় না থাকলেও, বদ্ধ জলাশয় তথা খাল, বিল, ডুবা ও পুকুরে বিভিন্ন দেশি মাছ ও পানিফলের সমন্বিত চাষে বাড়তি আয়ের পথ খোঁজে পেয়েছেন অনেকেই।

শেরপুরের নকলা উপজেলায় পানিফল যেমন-সিংড়া, শাপলা, শালুক চাষের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে অগণিত মৎসজীবী পরিবার বদ্ধ পানির নিচে মাছ ও উপরে পানি ফল চাষ করে দিন বদল করেছেন। মাছ, সিংড়া, শাপলা, শালুকেই তাদের ভাত-কাপড় তথা জীবন জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়।

উপজেলার দরপট, দশানী, পাঁচকাহনিয়া, কৈয়াকুড়ী, তাতড়াকান্দা, পলশকান্দি, কায়দা, ছতরকোনা, ধামনা, চন্দ্রকোণা, নারায়নখোলা, চড়অষ্টধর, বারমাইশা, শালখা, পিছলাকুড়ী, বিহাড়ীরপাড়, বানেশ্বর্দীসহ জলমগ্ন প্রায় সব এলাকায় মাছ চাষের সাথে বিভিন্ন পানিফল চাষ করা হচ্ছে।

চাষী বাজু মিয়া, আব্দুছ ছাত্তার, আজহারুল ইসলাম ফকির, আব্দুল কাদির, হানিফ উদ্দিন, মোফাজ্জল হোসেন, মিন্টু মিয়া, আলমাছ আলী, সুরুজ আলী ও মোতালেবের মত বেশ কয়েকজন চাষীর সাথে কথা হলে তারা জানান, বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে বীজ বা কাটিং করা গাছ রোপন করা হয়। তিন মাসেই উৎপাদন শুরু হয়।

ত্রৈমাসিক এসব পানিফল (সিংড়া) গাছ হতে ৪ থেকে ৫ বার ফল তুলা সম্ভব হলেও, পানিযত বেশি হয় ফলন তত ভালো হয়। তারা আরও জানান, উপজেলাতে ৩০ থেকে ৪০ জন পাইকারী ও ৮০ থেকে ৯০ জন খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন। এই ফল বিক্রি করেই পরিবার পরিজনের ভরণ-পোষণ করেন তারা।

শেরপুরের বিভিন্ন জলমগ্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে পানিফল চাষ হলেও নকলায় বাণিজ্যিকভাবে পানিফলের চাষ ব্যাপক হারে বেড়েছে। শুধু সিংড়া, শাপলা ও শালুক বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছে উপজেলার তিনশতাধিক পরিবার। মাছ ও পানিফল বিক্রির জন্য খাল-বিলের তীরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী বাজার। স্থানীয় বাজারে এইসব ফল খুচরা ও পাইকারী হিসেবে প্রচুর বিক্রি হচ্ছে।

চাষীদের দেওয়া তথ্যমতে, এক কাঠা (৫ শতাংশ) জমিতে সিংড়া চাষ করে বিক্রি পর্যন্ত চাষীদের ব্যয় হয় এক হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা। আর ব্যয় বাদে এক কাঠা জমি থেকে গড়ে লাভ হয় ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা, যা অন্য কোন ফসলে অসম্ভব। আর সিংড়ার নিচে চাষ করা দেশীয় মাছ বিক্রি করে আয় হয় কমপক্ষে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা।

তারা জানান, প্রতিটি সিংড়া গাছ থেকে এক মৌসুমে ৪ থেকে ৫ বার ফলন পাওয়া যায়। এতে প্রতি কাঠাতে ৮ থেকে ১০ মন করে সিংড়া হয়। প্রতি মন সিংড়ার বর্তমান পাইকারী মূল্য ৬০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা। সে হিসাব অনুযায়ী প্রতি ৫ শতাংশ জমি থেকে এক মৌসুমেই ৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকার সিংড়া বিক্রি করা যায়।

সিংড়ার ইংরেজী নাম Water chestnut এবং বৈজ্ঞানিক নাম trapa natans L. কৃষি বিভাগের তথ্যমতে এটির কোন অনুমোদিত জাত নেই। গরুর মাথার মত এফলের ভিতর সাদা শাঁশযুুক্ত। এই শাঁশ বেশ সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। এটি এলার্জি ও হাত-পা ফোলা রোগের উপশম কারি ভেষজ ওষুধ। তাছাড়া তলপেটের ব্যাথা, পিত্তথলিতে প্রদাহ, উদারাময় ও পোকা মাকড়ের কামড়ে এর শাঁশের প্রলেপ বেশ উপকারী।

এ বিষয়ে সিনিয়র উপজেলা মৎস কর্মকর্তা সুলতানা লায়লা তাসনীম জানান, কীটনাশক ব্যবহার ছাড়া দেশিয় মাছ ও পানিফলের সমন্বিত চাষে একদিকে বিলুপ্তপ্রায় দেশিয় মাছ সংরক্ষণ হচ্ছে, অন্যদিকে মৎসজীবীরা দ্বিগুণহারে লাভবান হচ্ছেন। দেশিয় মাছকে বিলুপ্তের হাত থেকে রক্ষা করায় নকলা উপজেলার মৎস্য চাষী হিসেবে সরকারি পরিচয়পত্র বহনকারী ২ হাজার ২৪০ জন মৎসজীবী হতে পারে দেশের রোল মডেল।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস জানান, নকলায় তুলনামুলক খালের পরিমাণ কম থাকলেও ১১টি বিল, ১১টি জল মহাল, উপজেলার উপর দিয়ে ভয়ে যাওয়া ৫টি নদী, কমবেশি ৪ হাজার ১২০ টি পুকুর রয়েছে।

তাছাড়া এক হাজার ৬৬৪ হেক্টর নিচু জমি রয়েছে, ওইসব নিচু জমি বর্ষাকালে পানিতে তলিয়ে থাকে। সেইসব জলাবদ্ধ পতিত জমিকে কাজে লাগাতে কাটিং ও বীজ থেকে সিংড়ার চাষ করা সম্ভব।

জলাবদ্ধ যেসব জমিতে আমন ধান বা অন্যান্য আবাদ করা সম্ভব না, সেসব জমিতে সিংড়া, শাপলা, শালুক চাষ করে যে কেউ স্বাবলম্বী হতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।

উপজেলায় এবছর বিভিন্ন পানিফল চাষের পরিমাণের বিষয়টি সুস্পষ্ট ভাবে জানা সম্ভব না হলেও, অন্তত শত একর জমিতে পানিফল চাষ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন তথ্যে জানাগেছে। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠ পোষকতা পেলে দেশের শুধু বদ্ধ জলাশয়েই লাখো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ।


পঞ্চাশ বছর ধরে শিক্ষার আলো
কোথাও খোলা উঠুনে চাটাই পেতে। আবার কোথাও কারো বাড়ির বারান্দায়।
বিস্তারিত
রংপুরে শিম চাষে কৃষকের সাফল্য
রংপুর জেলায় শিম চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখছে কৃষকরা। অপরদিকে
বিস্তারিত
কিশোরগঞ্জের হাওরে নির্মিত হচ্ছে স্বপ্নের
কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে প্রায় ৯ শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে সারা
বিস্তারিত
বাসক পাতায় ভাগ্য বদল
বাসক পাতার ঔষধি গুণাগুণ সম্পর্কে কম-বেশি সবাইর জানাশোনা আছে। সর্দি-কাশি
বিস্তারিত
মতলব উত্তরে আখের বাম্পার ফলন
মতলব উত্তর উপজেলায় এ বছর চিবিয়ে খাওয়া আখের বাম্পার ফলন
বিস্তারিত
রংপুরে সড়ক-মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ
রংপুরে সড়ক-মহাসড়কগুলোতে ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে অবৈধ নছিমন, করিমন, মুড়িরটিন, মোটরসাইকেল,
বিস্তারিত