মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন যেভাবে

সুদৃঢ় শরিয়ত আনীত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন এবং একে মৃত পতিত জাহেলি ধ্যান-ধারণা ও প্রচলিত ভ্রান্তি থেকে মুক্ত ও শুদ্ধ করা। যাতে করে তা হয়ে যায় সুস্পষ্ট দ্বীনের অনুকূল ও মোমিনদের আদর্শের অনুগামী। উভয় ওহি তথা কোরআন ও সুন্নাহে নজর ও গভীর দৃষ্টি দিলে আমরা এ বিষয়ে নানা চিত্র ও দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। তাহলে আসুন আমরা বিভিন্ন বিষয়ের বাস্তবতা ব্যাখ্যায় ইসলাম ধর্মের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের কিছু উপমা দেখি। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মানব, আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।’ (সূরা হুজুরাত : ১৩)। 
জাহেলি যুগে মানুষ বংশ ও বাপ-দাদার কৃতিত্ব নিয়ে গর্ব করত। এমন প্রেক্ষাপটে শরিয়ত মানুষের সামনে সম্মানের সঠিক মানদ- উপস্থাপন করে। সেটি হলো শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হবে শুধু তাকওয়া ও আল্লাহভীরুতার ভিত্তিতে। অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই তাকওয়া ছাড়া। তাই যেখানকার মানুষই তাকওয়া বাস্তবায়ন করবে সেটি হবে তার জন্য পূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক। আর তিনিই প্রকৃত সম্মানী। 
নবী (সা.) এর সুস্পষ্ট বাণীতেও এ বাস্তবতা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সম্পদ মর্যাদা আর তাকওয়া সম্মান।’ অর্থাৎ মানুষের মাঝে মর্যাদা নিরূপিত হয় সম্পদের আলোকে আর আল্লাহর কাছে সম্মান নির্ণীত হয় তাকওয়ার সুবাদে। এখানে খেয়াল করুনÑ দুনিয়াদার ও আল্লাহর কাছে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। এ জন্য তাকওয়া, ঈমান ও শুদ্ধতার অধিকারীরাই প্রকৃতপক্ষে নবীজি (সা.) এর আত্মীয়Ñ তারা তাঁর রক্ত সম্পর্কীয় হন আর না হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষের মধ্যে মোত্তাকিরাই আমার সবচেয়ে কাছের। তারা যখনকার এবং যেখানকার হোক না কেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘জেনে রেখো, অমুক আল বা বংশের লোকেরা আমার স্বজন নয়, আমার স্বজন হলেন আল্লাহ ও নেককার মোমিনরা।’ অর্থাৎÑ যে পুণ্যবান, সেই তো আমার বন্ধু-স্বজন। যদিও তার বংশ হয় আমার চেয়ে দূরের। পক্ষান্তরে মন্দকর্মীরা আমার বন্ধু নয়, যদিও তার বংশ হয় আমার কাছের। 
সাহাল বিন সাদ সাআদি (রা.) বলেন, একবার এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সামনে দিয়ে গমন করল। তিনি তখন তাঁর কাছে উপবিষ্ট এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, যে লোকটি এ মাত্র চলে গেল তার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? সে বলল, ইনি তো সমাজের অন্যতম সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। আল্লাহর কসম, ইনি এরূপ যোগ্য ব্যক্তি, যে কোনো পাত্রীর কাছে তার বিয়ের পয়গাম গেলে সে তার সঙ্গে বিয়েতে রাজি হবে। ইনি সুপারিশ করলে সে সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। সাহাল বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরপর কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। অতঃপর আরেক ব্যক্তি এদিক দিয়ে চলে গেল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সম্পর্কেও নিকটে বসা লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, এ লোক সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? সে বলল, এ ব্যক্তি তো এক দরিদ্র মুসলমান। সে তো এর যোগ্য, যে কোনো পাত্রীর প্রতি সে বিয়ের পয়গাম পাঠালে কেউই তা গ্রহণ করবে না। আর সে যদি কারও ব্যাপারে কোনো সুপারিশ করে তাও কবুল করা হবে না। সে কোনো কথা বললে তা শোনা হবে না। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমি যার প্রশংসা করলে সারা জগৎ তার মতো লোকে পরিপূর্ণ থাকলেও তাদের সবার তুলনায় এ লোকটি উত্তম।’
এর সঙ্গে যোগ হবে আরেকটি বিষয়। তা হলোÑ রিজিক প্রশস্ত বা সঙ্কুচিত হওয়ার সঙ্গে আল্লাহর প্রিয় বা অপ্রিয় হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি বান্দার যোগ্য হওয়ার প্রমাণও নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা আরও বলেছে, আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধ, সুতরাং আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না। বলুন, আমার পালনকর্তা যাকে ইচ্ছা রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং পরিমিত দেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা বোঝে না।’ (সূরা সাবা : ৩৫-৩৬)।
অর্থাৎÑ আল্লাহর প্রতি উদ্ধত আচরণকারীরা বলছে, আমরা জনবল ও অর্থবলের অধিকারী আর আমরা আখেরাতে শাস্তিপ্রাপ্ত হব না। কেননা আল্লাহ যদি আমাদের কওম ও কর্মে সন্তুষ্ট না হতেনÑ আমাদের সন্তান ও সম্পদ দিতেন না। প্রশস্ত করতেন না আমাদের রিজিক। আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব ছাড়া আমাদের অগ্রাধিকার দিতেন না অন্যদের ওপর। বস্তুত, তাদের সামনে থেকে উবে গিয়েছিল এ প্রকৃত অবস্থাÑ আল্লাহ নিজ সৃষ্টি থেকে পৃথিবীতে যাকে চান রিজিক প্রশস্ত করে দেন। যাকে চান রিজিক সংকীর্ণ করে দেন। এটা তিনি তাঁর প্রিয়তা বা নৈকট্যের যোগ্যতা বলে নয় কিংবা যাকে সংকটে রেখেছেন তার অপ্রিয়তার জন্য নয়। বরং এটি করেন তিনি বান্দাকে পরীক্ষা করা ও বাজিয়ে দেখার উদ্দেশ্যে। অথচ অধিকাংশ মানুষ বোঝে না যে, আল্লাহ এটা করছেন তাঁর বান্দাকে পরীক্ষা হিসেবে।
যদি রিজিকের প্রশস্ততাই সম্মান ও সন্তুষ্টির প্রমাণ হতো, তাহলে তা শুধু আনুগত্যশীলদের জন্যই বিশিষ্ট করতেন। তেমনি রিজিকের সংকট যদি অসম্মান ও অসন্তুষ্টির প্রমাণ হতো, তাহলে তা শুধু অবাধ্যদের জন্যই বরাদ্দ করতেন। বরং আল্লাহ কখনও বান্দাকে দুনিয়ার কিছু দেন তাকে আত্মপ্রবঞ্চনা ও ধোঁকায় ফেলতে। যেমন রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন আল্লাহকে দেখবে অবাধ্যতা সত্ত্বেও বান্দার পছন্দ মাফিক দুনিয়া দিয়ে দিচ্ছেন, বুঝবে, এটি ইস্তেদরাজ বা আত্মপ্রবঞ্চনামাত্র।’ অতঃপর তিনি তেলাওয়াত করলেন, ‘অতঃপর তারা যখন ওই উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদের দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি তাদের সামনে সব কিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম। এমনকি, যখন তাদের প্রদত্ত বিষয়াদির জন্য তারা খুব গর্বিত হয়ে পড়ল, তখন আমি অকস্মাৎ তাদের পাকড়াও করলাম। তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল।’ (সূরা আনআম : ৪৪)। 
সাহাবায়ে কেরামকে শেখানো এবং তাদের উত্তম আদর্শের দীক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করে দেওয়ার আরেকটি নববি পদ্ধতি ছিল প্রশ্ন করা। আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘হে আবু জর, তুমি কি সম্পদের প্রাচুর্যকে ধনাঢ্যতা বলে মনে করো?’ আমি বললাম, জি হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)। এরপর তিনি বললেন, ‘তুমি কি অর্থের অভাবকে দারিদ্র্য মনে করো?’ আমি বললাম, জি হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)। রাসুল (সা.) বললেন, ‘অর্থের নয় বরং অন্তরের প্রাচুর্য হলো আসল প্রাচুর্য। আর মনের দারিদ্র্য হলো প্রকৃত দারিদ্র্য।’ অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘ধনের আধিক্য হলে ধনী হয় না, অন্তরের ধনীই প্রকৃত ধনী।’ 
একই অর্থে আরেকটি বিষয় এখানে যোগ করা যায়। সেটি হলোÑ প্রকৃত নিঃস্ব ও পতিত দরিদ্র সেই বান্দা যে কেয়ামতের দিন তার রবের সামনে নেকিনিঃস্ব হয়ে উপস্থিত হবে। তার কাছে কোনো নেকি থাকবে না। এ বাস্তবতাও আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন নবীজি (সা.)। একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে? তারা বললেন, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব ওই ব্যক্তি, যার কাছে কোনো মুদ্রা বা সামগ্রী নেই। তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে (আসল) নিঃস্ব তো সে ব্যক্তি, যে কেয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম, জাকাত নিয়ে হাজির হবে। কিন্তু সে এমন অবস্থায় দাঁড়াবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে। কারও প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছে, কারও মাল (অবৈধভাবে) ভক্ষণ করেছে, কারও গিবত করেছে, কারও রক্তপাত করেছে এবং কাউকে মেরেছে। অতঃপর ওই (অত্যাচারিত) ব্যক্তিকে তার নেকি দিয়ে দেওয়া হবে। পরিশেষে যখন তার নেকি অন্যদের দাবি পূরণ করার আগেই শেষ হয়ে যাবে, তখন অত্যাচারিত বা অপমানিত বা তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাপরাশি নিয়ে তার ওপর নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ 

২৪ সফর ১৪৪০ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব


বেনামে সুদ : একটি শরয়ি
অনেক ওলামায়ে কেরাম জমি বন্ধকের এ মুয়ামালাটিকে জায়েজ করার জন্য
বিস্তারিত
মিতব্যয়িতা ইসলামে পছন্দনীয় কাজ
মানুষকে মিতব্যয়ী হতে উৎসাহিত করতে প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে
বিস্তারিত
ইসলামের দৃষ্টিতে উপহার বিনিময়
পারস্পরিক উপহার আদান-প্রদান আমাদের সামাজিক জীবনের একটি সাধারণ বাস্তবতা। বিষয়টি
বিস্তারিত
মনের জমিনের বিষাক্ত চারাগাছ
ফিলিস্তিনে মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন আল্লাহর নবী দুনিয়ার বাদশাহ হজরত
বিস্তারিত
ইসলামে মানবজীবনের দায়িত্ব
দায়িত্ব ও দায়িত্ববোধ ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এখানে প্রত্যেকেই তার
বিস্তারিত
মোজেজার তাৎপর্য
  মোজেজা চিরন্তন রীতিবহির্ভূত হতে হবে। অতএব কোনো ব্যক্তি যদি রাতের
বিস্তারিত