মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

পরস্পর দয়া প্রদর্শনে উপদেশ দিন

মসজিদে নববিতে রিয়াজুল জান্নাত সংলগ্ন মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা প্রদান করছেন খতিব শায়খ সালাহ। গত জুমার খুতবার এ ছবিটি হারামাইন-শরিফাইনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত

উসামা বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজির মেয়ে তাঁর কাছে খবর পাঠালেন, আমার ছেলে মারা গেছে তাই আপনি আমাদের কাছে আসুন। তারপর ছেলেটিকে আল্লাহর রাসুলের কাছে তুলে ধরা হলো। তখন তাঁর মন অস্থির হয়ে পড়ছিল। তাঁর দুই চোখ অশ্রুপ্লাবিত হয়ে পড়ল।’ তখন সাদ (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, এটা কী? তিনি বললেন, ‘এটা সেই দয়া যা আল্লাহ স্বীয় বান্দার হৃদয়ে তৈরি করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ নিজের দয়াবান বান্দাদের প্রতিই দয়া করেন।’ (বোখারি)

 

যারা কল্যাণ ও বরকতময় জীবনের অধিকারী তারা পরস্পর দয়া, অনুগ্রহ ও দান-দাক্ষিণ্যের মাধ্যমে মমতা প্রদর্শন করে। মার্জনা, ক্ষমা ও উদারতার দ্বারা অনুগ্রহশীল হয়। পরস্পর দয়া প্রদর্শনের উপদেশ প্রদান করে। পরস্পর দয়া দেখানোর উপদেশ প্রদান করা অনেক বড় একটি গুণ ও বিশাল একটি আনুগত্য। আমাদের রব বলেন, ‘তারপর সে তাদের দলভুক্ত হয়েছে যারা ঈমান এনেছে, একে অন্যকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পর দয়া দেখানোর উপদেশ প্রদান করেছে। আর তারাই বরকতের অধিকারী।’ (সূরা বালাদ : ১৭-১৮)। 
পরস্পর দয়া প্রদর্শনের উপদেশ প্রদান করার মানে হলো, তাদের একজন আরেকজনকে মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন ও সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি দেখানোর উপদেশ প্রদান করবে। তারা একে অন্যকে দরিদ্র, দুস্থ, শিশু, অনাথ, রোগী ও আহতদের প্রতি কোমল আচরণ, নম্রতা ও মমতা দেখাতে উদ্বুদ্ধ করবে। মূর্খ ও পাপী লোকদের প্রতি সদয় হবে উপদেশ, নসিহত, সৎকর্মের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করার মাধ্যমে। তাতেই রক্ষা হবে মানুষের কাঠামো। তারা যদি পরস্পর সদয় না হয় তবে তারা ধ্বংস হবে। 
যারা আল্লাহকে ভালোবাসে তিনি তাদের পাঁচটি বিশেষণে ভূষিত করেছেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে, তারা মোমিনদের প্রতি কোমল ও সদয় থাকে। যার মানে হলো মোমিনদের প্রতি তাদের মধ্যে আছে কোমল আচরণ, নম্রতা, দয়া ও সহানুভূতি। যেমন আল্লাহ তাঁর রাসুলকে বলেন, ‘মোমিনদের মধ্যে যারা আপনার অনুসরণ করেছে আপনি তাদের জন্য নিজের ডানাকে অবনমিত করুন।’ (সূরা শুআরা : ২১৫)। রাসুলের সাহাবায়ে কেরামকেও তিনি অনুরূপ অভিধায় ভূষিত করে বলেন, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল, যারা তাঁর সঙ্গী তারা কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং মোমিনদের প্রতি সদয়।’ (সূরা ফাতহ : ২৯)। 
তারা পরস্পর অনেক বেশি কোমল আচরণকারী ও দয়াশীল। মোমিন ব্যক্তি হবে দয়াবান ও সৎকর্মশীল। সে নিজের মোমিন ভাইয়ের সামনে থাকবে সদা হাস্যরত ও প্রফুল্ল। আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) এর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি মোমিনদের প্রতি মমতাবান ও দয়াশীল।’ (সূরা তওবা : ১২৮)।
আমাদের নবী তওবা ও পরস্পরের প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা নিয়ে আগমন করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তওবার নবী এবং দয়ার নবী।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যারা পৃথিবীতে আছে তোমরা তাদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ ‘যে মানুষের প্রতি দয়া করে না আল্লাহ তাকে দয়া করেন না।’ ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের প্রতি শ্রদ্ধার হক বোঝে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ ‘দুর্ভাগা লোকের অন্তর থেকেই শুধু দয়া উঠিয়ে নেওয়া হয়।’
উসামা বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজির মেয়ে তাঁর কাছে খবর পাঠালেন, আমার ছেলে মারা গেছে তাই আপনি আমাদের কাছে আসুন। তারপর ছেলেটিকে আল্লাহর রাসুলের কাছে তুলে ধরা হলো। তখন তাঁর মন অস্থির হয়ে পড়ছিল। তাঁর দুই চোখ অশ্রুপ্লাবিত হয়ে পড়ল।’ তখন সাদ (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, এটা কী? তিনি বললেন, ‘এটা সেই দয়া যা আল্লাহ স্বীয় বান্দার হৃদয়ে তৈরি করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ নিজের দয়াবান বান্দাদের প্রতিই দয়া করেন।’ (বোখারি)। 
আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজের জাতির কাছে যারপরনাই কষ্ট ও প্রত্যাখ্যান পেয়েছিলেন। আয়েশা (রা.) তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনার জীবনে ওহুদ যুদ্ধের দিনের চেয়ে কঠিন কোনো দিন এসেছে কি?’ তিনি বললেন, ‘আকাবার দিন আমি তোমার সম্প্রদায় থেকে যে কষ্ট পেয়েছিলাম তা ছিল তাদের থেকে পাওয়া আমার সবচেয়ে কঠিনতম মুহূর্ত। আমি সেদিন ইবনে আবদে ইয়ালিল ইবনে আবদে কুলালের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করেছিলাম, সে আমার ইচ্ছার প্রতি কোনো সাড়াদান করেনি। তখন আমি বিষণœ চেহারা নিয়ে চলতে থাকলাম। করনে ছাআলিব নামক জায়গায় পৌঁছার আগ পর্যন্ত আমার কোনো অনুভব ছিল না। তখন হঠাৎ আমি দেখলাম একটি মেঘ আমাকে ছায়া দিচ্ছে। আমি তাকিয়ে দেখি সেখানে জিবরাইল (আ.) উপস্থিত। তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বললেন, আল্লাহ আপনার জাতির কথা এবং আপনাকে তারা যে উত্তর দিয়েছে তা শুনেছেন। তিনি আপনার কাছে পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন, যেন তাকে আপনি তাদের বিষয়ে আপনার যা ইচ্ছা তার আদেশ করেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডাক দিল, সে আমাকে সালাম দিয়ে বলল, হে মুহাম্মদ, আল্লাহ আপনার জাতির কথা শুনেছেন। আমি পাহাড়ের ফেরেশতা, আপনার রব আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন, যাতে আপনি আমাকে যা ইচ্ছা তা আদেশ করতে পারেন। আপনি চাইলে আমি তাদের ওপর দুটি পাহাড়কে চাপিয়ে দিতে পারি।’ আল্লাহর রাসুল (সা.) তাকে বললেন, ‘বরং আমি আশা করি আল্লাহ তাদের বংশধরদের থেকে এমন মানুষ জন্ম দেবেন যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করবে না।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন, ‘এ হাদিসে স্বজাতির প্রতি নবী করিম (সা.) এর মমতা, তাঁর বিশাল ধৈর্য ও সহনশীলতার বর্ণনা আছে। সেটি আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীর অনুরূপÑ ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অনুগ্রহের মাধ্যমে আপনি তাদের জন্য কোমল আচরণকারী হোন।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)। আল্লাহ এরকম আরও বলেন, ‘আপনাকে আমি বিশ্ববাসীর জন্য শুধু রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া : ১০৭)। এ হলো আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) এর চরিত্র এবং মোমিনদের চরিত্র, সুতরাং দয়াশীলদের জন্য শুভ সংবাদ।
হে আমার প্রিয় ভ্রাতা, নিজের জন্য ও অপরের জন্য আপনি দয়াশীল হোন। নিজের সম্পদ দ্বারা স্বেচ্ছাচারী হবেন না। আপনার জ্ঞান দিয়ে মূর্খের প্রতি, আপনার প্রতিপত্তি দিয়ে অভাবীর প্রতি, আপনার অর্থ দ্বারা দরিদ্রের প্রতি, আপনার স্নেহ দিয়ে ছোটদের প্রতি, আপনার দাওয়াতের মাধ্যমে পাপীদের প্রতি ও আপনার মমতা দিয়ে জীবজন্তুর প্রতি আপনি দয়া করুন। কারণ, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর রহমতের নিকটবর্তী হলো ওই লোক যে তার সৃষ্টির প্রতি বেশি দয়াশীল। তাই তাঁর সৃষ্টির প্রতি যার দয়া বেশি হবে এবং তাঁর বান্দার প্রতি যার অনুগ্রহ অধিক হবে আল্লাহ তাকে তাঁর রহমত দিয়ে তার প্রতি দয়া করবেন, তাকে তাঁর মর্যাদার জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, তাকে তার কবরের শাস্তি ও আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করবেন। তাকে নিজের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন।


১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ

 


নির্বাচনি ইশতেহারে ইসলামের প্রেরণা
ইশতেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বন্ধের ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য দেখতে পাওয়া যায়
বিস্তারিত
মানুষ মানুষের জন্য
শুক্রবার মানেই সাপ্তাহিক ছুটি। ছুটির দিন নানাজন নানাভাবে কাজে লাগিয়ে
বিস্তারিত
শীতের নেয়ামত বিচিত্র পিঠা
  প্রকৃতিতে বইছে শীতের সমীরণ। কুহেলিঘেরা সকাল মনে হয় শ্বেত হিমালয়।
বিস্তারিত
মহামানবের অমীয় বাণী
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে আমার উম্মতের স্বার্থে
বিস্তারিত
যুদ্ধাহত শিশুদের কথা
৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে ‘নিউ এরাব’ আরব বিশ্বের
বিস্তারিত
সুদানে গ্রামীণ ছাত্রদের শহুরে জীবন
যেসব সুদানি ছাত্র পড়াশোনা করতে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে তারা
বিস্তারিত