জ্ঞান সাধনায় মুসলিম মনীষীদের অবদান

আল-বেরুনী ‘মা লিল-হিন্দ’ গ্রন্থটি বিশ্বে আল-বেরুনীর ভারত দর্শন নামে পরিচয় লাভ করে। বিভিন্ন বিজ্ঞানে, গণিত, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসা শাস্ত্র, ভূগোল, ইতিহাস নিয়ে গভীর সাধনা করেন আল-বেরুনী। তার গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা সম্বন্ধে লিখিত ‘আলমামুদ ফিল হায়াৎ ওয়ান্নাজুম’ এবং ‘কানুন’ গ্রন্থদ্বয় এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য, যার মধ্যে ছিল জ্যোতির্বিদ্যা, ক্যালকুলাস, ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি ও অঙ্ক

বিশ্ব মানব সভ্যতায় ইসলামের মহানতম অবদান হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাকে আল্লাহ তায়লা এতখানি মূল্য দান করেছেন, যার ফলে দুনিয়ার সব কিছুর ওপরে জ্ঞান ও শিক্ষাকেই গুরুত্ব দিয়েছে ‘আল কোরআন’। নবী করিম হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর ওপর সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় ‘ইকরা’ অর্থাৎ ‘পড়’ বাক্য দিয়ে। সূরাটির প্রথম আয়াত ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ জ্ঞান সাগরের মহাধিপতি মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) ঘোষণা করেনÑ ‘খোদার সৃষ্টি সম্পর্কে নিবিষ্ট মনে এক ঘণ্টা চিন্তা করা এক হাজার বছর রাত জেগে ইবাদত করা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট।’
জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি ইসলামের এমন গুরুত্ব আরোপের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে মধ্যযুগের মুসলমানরা আপন হৃদয়ের জ্ঞানরূপ আলোকবর্তিকা দিয়ে পৃথিবীর সব জ্ঞান ভা-ার আহরণ করে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেন। মুসলিম বৈজ্ঞানিকরা লোহাকে সোনা করার কৌশল আয়ত্ত করার জন্য অনেক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, যদিও তা সম্ভব হয়নি। তথাপি এ গবেষণার ফলে নব নব উপাদান আবিষ্কারের পথ খুলে যায়। খলিফা মনসুর, হারুন আল রশিদ, মালিক শাহ ও মামুনের সময় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও সাধনা চরমে পৌঁছে ছিল। বাগদাদ, মিশর, মরক্কো, স্পেন, পারস্য, সিসিল গ্রানাডা প্রভৃতি স্থান ছিল কাব্য সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, ভূগোল, উদ্ভিদবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, অঙ্ক, বিজ্ঞান, বীজগণিত, জ্যামিতি, চিকিৎসা শাস্ত্র, সামরিক শিক্ষা, তফসির, হাদিস, ফেকাহ, শিল্পকলা, নৌবিদ্যা, শিল্প-বাণিজ্য ইত্যাদি শিক্ষা লাভে ও চর্চার  প্রাণকেন্দ্র। সংক্ষেপে বলতে গেলে ইউরোপে যখন জ্ঞানের আলো পৌঁছেনি তখনও আরববাসী জ্ঞান-বিজ্ঞানে ছিলেন অনেক পারদর্শী।
রসায়ন শাস্ত্রকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং প্রাচীন লোকের ভ্রান্ত ধারণা থেকে উদ্ধার করে পরিপূর্ণ বিজ্ঞান হিসাবে উন্নত করতে মুসলিম বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ানের অভূতপূর্ব অবদান রয়েছে। জার্মান প-িত ঔ জঁংশধ, চধঁষ কৎধঁং, ইংল্যান্ডের ঊ. ঔ. ঐড়ষহুধৎফ এবং আমেরিকার এ. ঝধৎঃড়হ স্বীকার করেন যে, জাবির ইবনে হাইয়ান ছিলেন পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রসায়নবিদ। ইবনে নাদিমের মত জাবির (এবনবৎ) দু-হাজারেরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন; তার মধ্যে রয়েছে ২৬৭ খানা গ্রন্থ রসায়ন শাস্ত্র সম্পর্কিত। জাবির কুফায় একটি খধনড়ৎধঃড়ৎু স্থাপন করে অক্লান্ত পরিশ্রম এবং অসাধারণ কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেন, যার ফলে সৃষ্টি হয় কিমিয়া বা কেমেস্ট্রি।
মধ্যযুগে চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে গভীর সাধনা করেন ইবনে সিনা, ইবনে জাহর, আল জাহরাওয়ি, উবায়দুল্লা জেব্রিল, আলী ইবনে সহল রব্বান আল-তাবারি, আল রাজী, আলী বিন-আব্বাস ও আল মজসি। চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে ইবনে সিনার লিখিত গ্রস্থ ‘আল কানুন’কে চিকিৎসা শাস্ত্রের বাইবেল বলা হয়।
আরববাসীর মধ্যে গণিত শাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন আল খারেজমি ও ইবনে মুল্লাহ। খারেজমি লিখিত ‘হিসাবুল জবর ওয়াল মুকাবিলা’ গ্রন্থটি সর্বপ্রথম বীজগণিতের পাঠ্যপুস্তক রূপে সমাদৃত হয়। পৃথিবী যে গোল তাও তিনি ১১৮৬ সালে তার রচিত ‘সুরাত আল আরদ্ব’ নামক গ্রন্থ দ্বারা প্রমাণ করে দেখান। তাছাড়া ইবনে মুসা একধারে গণিতবিদ, ভূগোলবিদ, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক ছিলেন। ৮৫০ সালে তিনিই প্রথম মানচিত্রের ব্যবহার দেখান।
নৌসংক্রান্ত কম্পাস আবিষ্কার করে মধ্য যুগের মুসলমানরা সমুদ্র যাত্রা করে বিভিন্ন দেশ আবিষ্কার করেন। আবদুর রহমান, জায়হানি, আল ইদ্রিসী, আল বকরি, খুরদেচ্ছি, আল মামুদি, হাওকল আল-মাকদাসি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভূগোলজ্ঞ ছিলেন। আরবি নাবিক আবদুর রহমানের নির্দেশনায় কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন। ১৫১৩ সালে নায়ক পিরি রইস দূরত্ব ও কম্পাস নির্দেশনার মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা উপকূল হরিণের চামড়ার ওপর অঙ্কন করেন। তিনি নৌবিজ্ঞান, আটলান্টিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর ও পারস্য উপসাগর নিয়ে অতি মূল্যবান কয়েকখানা গ্রন্থ রচনা করেন। বৈজ্ঞানিক আবদুর হাসান টিউব থেকে টেলিস্কোপ আবিষ্কার করেন। আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ ও ইবনে বয়তার মুসলিম স্পেনে উদ্ভিদ বিদ্যায় অসাধারণ পা-িত্য দেখিয়েছিলেন। 
আল-মাজিরিত, আল জারকালি ইবনে আফলাহ মোহাম্মদ বিন ইব্রাহিম ও আল ফাজারি সে যুগের প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ছিলেন। ১০৬৮ সালে স্পেনের সঈদ আসসাফি একটি অ্যাস্ট্রোলব তৈরি করেন যা দ্বারা বছরে  সূর্যের গতিপথ নির্দেশিত এবং ২৮টি তারকার অবস্থান বোঝা যায়। বর্তমানে এটা অক্সফোর্ডের মিউজিয়াম অব হিস্ট্রি অব সায়েন্সে সংরক্ষিত আছে।
মধ্যযুগে কাব্য ও সাহিত্য সাধনায় অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন ইবনে আব্দে রাব্বি, আবু ওয়ালিদ, শেখ সাদী, ইসফাহানী, ইবনে খাল্লিখান, ফেরদৌসী, আবু নেওয়াজ, দাকিকি, জালাল উদ্দিন রোমী ও মোহাম্মদ বিন ইসহাক। সাদীর গুলিস্তান, বোস্তান এবং ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’ গ্রন্থ পৃথিবীতে বিরল। ইবনে আল কাতিব, ইবনে খালদুন আবু উবায়দুল্লাহ, আবু মারওয়ান, আলী ইবনে হাজম স্পেনের সমুন্নত ঐতিহাসিক ছিলেন। হাজন ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, তর্কশাস্ত্র ও কবিতা নিয়ে চারশত অধ্যায়ের গ্রন্থ রচনা করেন। মুসলিম মনীষীদের মধ্যে ওমর খৈয়ামের দান অতুলনীয়। তিনি গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, ঔপন্যাসিক ও প্রসিদ্ধ কবি ছিলেন। পদার্থ বিদ্যা, অঙ্ক, রসায়ন শাস্ত্রে মুসলিম সাধক আল কাবরীর রয়েছে অসংখ্য অবদান। দর্শন নিয়ে গভীর সাধনা করে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছেন ইমাম গাজ্জালি, আলফারাবী, ইবনে সিনা এবং আলকিন্দি। মালিক শাহ নিজামুল মুলকের সরকারের নিয়ম-কানুন ও কৌশলসংক্রান্ত ‘সিয়াসতনামা’ গ্রন্থটি রাজনীবিদদের পথপ্রদর্শক স্বরূপ।
খলিফা মনসুর পৃথিবীর প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদ বিভাগ স্থাপন করেন। খলিফা হারুণ ও মামুনের সময় তা আশাতীত প্রসার লাভ করে। মামুন লুকের ছেলে কাতাকে আর্কিমিডিস, ইউক্লিড, এরিস্টটল, প্লেটো, গ্যালন প্রমুখ গ্রিক মনীষীর গ্রন্থাবলি অনুবাদের পদে নিযুক্ত করেন। প-িত হোসাইনকে বিদেশি বিজ্ঞানের গ্রন্থাবলি, আহয়া নামক পারসিককে ফার্সি গ্রন্থাবলি এবং ভারতের ব্রাহ্মণ দুবানকে সংস্কৃত ভাষায় মূল্যবান গ্রন্থ অনুবাদের জন্য নিয়োগ করেছিলেন। তিনি ‘বায়তুল হিকমত’ বাগদাদে স্থাপন করে তাতে  কবি আব্বাস ও আলকিন্দিকে নিযুক্ত করেন। প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ মোহাম্মদ-বিন-ইব্রাহিম আল ফাজারী খলিফা মামুনের অনুরোধে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার ‘সিদ্ধান্ত’ গ্রন্থটি আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন।
৭১২ সালে আরবরা যখন ভারতের সিন্ধু, মুলতান ও পাঞ্জাব জয় করে তখন থেকে আরব জাতি ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। আল-বেরুনী মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে সংস্কৃত ভাষায় পা-িত্য লাভ করে আরবি ভাষায় সংস্কৃতের অনেক নীতিমূলক গল্প ও তত্ত্ব তুলে ধরেন। বিশ্ব বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতাও এক্ষেত্রে ভারতের মান-মর্যাদাগুলো পৃথিবীর মানুষের সম্মুখে তুলে ধরেছেন। তাছাড়া আল-বেরুনী ‘মা লিল-হিন্দ’ গ্রন্থটি বিশ্বে আল-বেরুনীর ভারত দর্শন নামে পরিচয় লাভ করে। বিভিন্ন বিজ্ঞানে, গণিত, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসা শাস্ত্র, ভূগোল, ইতিহাস নিয়ে গভীর সাধনা করেন আল-বেরুনী। তার গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা সম্বন্ধে লিখিত ‘আলমামুদ ফিল হায়াৎ ওয়ান্নাজুম’ এবং ‘কানুন’ গ্রন্থদ্বয় এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য, যার মধ্যে ছিল জ্যোতির্বিদ্যা, ক্যালকুলাস, ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি ও অঙ্ক।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান বিশ্বের বিশেষ করে ইউরোপের নবজাগরণই হচ্ছে মধ্যযুগের মুসলিম মনীষীদের সাতশত বছরের জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার অমৃত ফল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম মানব সভ্যতাকে উন্নত শিখরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে।


২০১৯ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যা হতে
আমেরিকার ব্লুমবার্গ এজেন্সি ২০১৯ সালের মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে
বিস্তারিত
ইসলামই হবে পৃথিবীর শীর্ষ ধর্ম
ইউরোপজুড়ে বাড়ছে মুসলিমবিদ্বেষ। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ
বিস্তারিত
হামাস চায় জাতীয় ঐক্য
হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া বলেছেন, দলটি জাতীয় ঐক্য চায়। তিনি
বিস্তারিত
ভোট প্রদানের জাতীয় দায়িত্ব
কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, অত্যাচারী, পাপাচারী, ও বেঠিক
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার প্রতি যা ওহি হয়,
বিস্তারিত
ধনীদের সম্পদে রয়েছে গরিবদের অধিকার
চাঁদপুর ট্যুর থেকে ফিরছিলাম। ভোরে সদরঘাট থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের
বিস্তারিত