দীননাথের দুঃখগুলো

আমাদের দীনুদা। পরিপাটি পঞ্চাশোর্ধ্ব ভালো মানুষ, তবে তার বড্ড বেশি দুঃখবিলাস। অল্পতেই অমনি তার আঁতে ঘা লাগে, দুঃখবোধ জাগে। খুব স্পর্শকাতর আমাদের এ দীনুদা। লজ্জাবতী লতার মতো সামান্য আঁচড়ে আঘাতে তার পাতা কুঁকড়ে যায়। তিনি বেসরকারি চাকরি করেন। সেখানে তাকে প্রচুর খাটতে হয়। দীনুদার ধারণা, তাকে যেটুকু পারিশ্রমিক দেয়, তার চেয়ে বেশি খাটানো হয়। কারণ তিনি হীনবল, তার পক্ষে কথা বলার মতো আদতে কেউ নেই। বস্তুত তিনি আন্দোলন-সংগ্রাম পছন্দ করেন না। তার গলার স্বর নিচু, তাই তাকে কেউ মিছিলে নেয় না, পাত্তাও দেয় কম। উত্তুঙ্গ গলায় সেøাগান দিতে না পারলে তাকে মিছিলে ডেকে লাভ কী! হয়তো ভাবছেন, বেসরকারি অফিসে আবার মিটিং-মিছিল কেন! আছে ভাই আছে। তবে মিছিল সবসময় চোখে দেখা যায় না, মালুম হয় শুধু। নইলে দীর্ঘ চার দশক চাকরি করার পরও কাউকে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বের করা হয় কী করে! অর্থাৎ দীনুদার মিছিলের জোর কম, গলায় ভলিউম কম, কেউ তার বিরুদ্ধে নিজ দায়িত্বে নিশ্চয়ই মালিকের কানে ফুসমন্তর দিয়েছেন। 
দীনুদার দুঃখগুলো মূলত ঘরোয়া। তার বড়ভাই পানুদা হালে দুপাখি জমির মালিক হয়েছেন। তাও আবার এ ঢাকা শহরের। ভাবা যায়! কেমনে কী করে হলো ভেবে পান না দীনুদা। পানু কি তবে আলাদিনের চেরাগ পেল নাকি! অবশ্য তিনি চাকরি-বাকরি কিছু করেন না, তার পেশা দালালি। এতে ওস্তাদ। 
নিজের ভাই ভালো করছেন, ঢাকার বুকে জমি কিনেছেন, দশতলা বাড়ি উঠবে এতে বরং দীনুদার খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু আদতে তা তিনি হননি। বরং তার বুকে সশব্দে ভাঙচুর চলছে। যেন দুরমুশ পিটাচ্ছে কেউ। এর নাম ঈর্ষা। সত্যি বলতে, মানুষের জীবনে কষ্টের যতরকম কারণ আছে তার মাঝে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো ঈর্ষাকাতরতা।
পানুদা পেশাদার দালাল। পরের হয়ে কথা চালাচালি করাই তার কাজ। দীনুদা নিজে যেহেতু তেমন কিছু করে উঠতে পারেননি, তাই তার মনোকষ্ট বেশি। তিনি নিজের মনে গজগজ করেন। জমি কিনেছে কিনুক, কিন্তু কী করে কিনল তা তো সবাই জানে। ওর কোনো প্রেস্টিজ আছে নাকি! ও তো একটা দালাল। মেয়েছেলের দালালি করছে কি না তাই বা কে জানে! ‘মেয়েছেলের দালাল’ কথাটা খুব একটা বিশুদ্ধ কিছু নয়। এমনকি, শ্রবণসুখকরও নয়। তাতে কেমন যেন আঁশটে গন্ধ। এর ইংরেজি নাম পিম্প। পানুদা দালালি করে কাঁচা টাকা কামান। না না, কাঁচা টাকা আর পাকা টাকা আসলে ভিন্ন কিছু নয়। চট করে কব্জির মোচড়ে টাকা কামালে তাকে কাঁচা টাকা বলে। সেখানে খানিক ছিঁচকেমির সংশ্লেষ থাকে। দুনম্বরি কারবার যাকে বলে। 
দীনুদা ভাইকে শুনিয়ে সমানে গাল পাড়েন। গালাগাল দিয়ে মনের কষ্ট কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা। আদতে কি আর তা হয়! অন্যের নামে বদনাম করলে তাতে নিজের ভেতরে জাজ¦ল্যমান স্টিম ইঞ্জিনটাই বরং আরও বেগবান হয়। কখনও কখনও তার এ-ও মনে হয়, এ জমিটা পানু না কিনে অন্য কেউ কিনলে তার অত বেশি জ¦লুনি হতো না। ভাই বলে তার কাছে কোনো রেয়াত নেই। বরং পানু যে তার চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এতেই যত কষ্ট দীনুদার। 
দিন দুই কেটে গেলে তার কষ্টের বেগ কিছুটা কমে। প্রেসার কুকারের হুসহুসানি নেমে যায়; কিন্তু দীনুদার কষ্টের আবার নতুন এক অনুষঙ্গ তৈরি হয়। এটি মূলত অফিসঘটিত। বস তাকে কেন যেন ঠিক দেখতে পারেন না। মনে মনে সন্ত্রস্ত বোধ করেন দীনুদা। কেমন এক বিপন্নতা পেয়ে বসে তাকে। তার কেন যেন মনে হয়, বস এবার তাকে খেদাবে, মানে জবাব দেবে। কানাঘুষায় তিনি শুনেছেন, তার স্থলে নতুন রিক্রুট হতে যাচ্ছে। এ খবরটাই উঁকুনের মতো তার মগজে সারাক্ষণ কুটকুট করে কামড়ায়।
ছিঃ ছিঃ ছিঃ! বস এমন নির্মম হতে পারলেন! এ অফিসে তিনি কতকাল কাজ করছেন! দিনরাত একাকার করে খেটেছেন। এখন তার বয়স হয়েছে, চুল পেকেছে, বাঁ চোখে চালশে, এ বয়সে দীনুদার সবটুকু রস চুষে-চিবিয়ে খেয়ে এখন তাকে তাড়িয়ে দেবে! এমন অনাচার ধম্মে সয়! সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন তিনি, কারণ এ মর্মে গুজব চালু আছে যে, দীনুদার জায়গায় একটা সুন্দরী মেয়ে চাকরি পাচ্ছে, যে কি না আবার মালিকের বিশেষ পেয়ারের মানুষ। দীনুদা ছোট চাকরি করলেও তিনি বোকা নন, তার আত্মসম্মানবোধ আছে। তিনি এখানে লৈঙ্গিক বৈষম্যের দুর্গন্ধ পাচ্ছেন। পুরুষের বদলে নারী করবে চাকরি! তাও আবার সুন্দরী। তার মানে যোগ্যতা বা বয়স নয়, তিনি নারীর নারকীয় মাধুর্যের কাছে হেরে গেলেন! তিনি সাহস করে মালিকের ঘরে ঢুকতে পারেননি। কারণ বস ভীষণ বিজি। বসরা ব্যস্তই থাকবেন সারাজীবন। অধস্তনের জন্য তাদের কোনো টাইম নেই। টাইম ইজ মানি। আর মানি নাকি হানির চেয়েও মিষ্টি। এই যে মানি বা হানি, সেখানে দীনুদার আদৌ কোনো স্থান নেই। ক্ষুণœ মনে বাসার পথ ধরলেন দীনুদা। গিয়ে দেখেন তার গিন্নি পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। গিন্নিকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। কারণ তিনি আজ একটু বেশি আগে বাসায় ফিরেছেন। দুপুরের খাবার গ্রহণ করে ভাতঘুম যাওয়া গিন্নির দীর্ঘদিনের অভ্যেস। আজ হঠাৎ রীতি ভঙ্গ করে তো সে জেগে থাকবে না। বরং রীতি ভেঙেছেন দীনুদা নিজে। গুজবে কান দিয়ে মনে ভরপুর কষ্ট নিয়ে অসময়ে বাসার পথ ধরেছেন। 
বসের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি তার, সেই রাগ গিয়ে পড়ল নিজের গিন্নির ওপর। তিনি হেঁড়ে গলায় বললেন, বলি কেসটা কী বলো তো! দরজা খুলতে এত টাইম লাগে? গিন্নিও কিছু কম যান না। তিনি পানচুপচুপে সুরে বললেন, বেটাইমে আসলে দোর খুলতে টাইম তো লাগবেই। তুমিই বা কেন আজ অসময়ে আসলা! শরীর খারাপ, নাকি মালিক তোমারে জবাব দিয়েছে? ব্যস, একেবারে মোক্ষম জায়গায় গিয়ে শেল বিঁধল দীনুদার। বলে কিনা মালিক তাকে জবাব দিয়েছেন! তিনি কী জবাব দিবেন, জবাব তো চাইবেন দীনুদা নিজে। কেন এ লৈঙ্গিক বৈষম্য! সেই সুন্দরীর চেয়ে দীনুদা কিসে অযোগ্য শুনি! বড় ভাই পানুর ওপর থেকে সব রাগ উঠে গিয়ে পড়ল কল্পিত সুন্দরীর ওপর। ভাই জাতে পুরুষ, তার সাতখুন মাফ। কিন্তু রূপসী লিঙ্গবিচারে মহিলা। নিজের প্রতি অবিচার হয়েছে বলে মনে করেন দীনুদা। এর পরিপ্রেক্ষিতে এক অদ্ভুত কাজ করে বসলেন দীনুদা। বেছে বেছে যত নারীকেন্দ্রিক জিনিসপত্র আছে ঘরে, সব বিদায় করলেন। প্রথমে তিনি বাদ দিলেন দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসার ছবি। তার মতে এমন বাজে হাসি নাকি জীবনে কেউ দেখেনি। মোনালিসার হাসিকে তিনি নিছক ‘ঠোঁট ভেটকানি’ বলে মনে করছেন। না-হাসি না-কান্না টাইপ একটা মুখভঙ্গি করে বসে আছে মোনালিসা। একে একে আরও অনেক কিছু বাদ দেওয়ার পর কোপ গিয়ে পড়ল পোষা বিড়ালটার ওপর। দীনুদা অনেক নেড়েঘেঁটে বুঝলেন এটা হুলো নয়, মাদি বিড়াল। সো একে রাখা যাবে না। কিছুতেই না। তিনি চটের বস্তা আনলেন দুইটা। তারপর ছেলেকে ডাকলেন, কই রে তনু, বিল্লিটারে ধরি আন। কেন বাবা, ও আবার কী করল! উঁহু, মুখে মুখে তক্কো নয়। যা বলছি তাই কর। দৌড়ে গিয়ে বিল্লি ধরো। মামুলি মেয়েছেলের কাছে জীবনের শেষ বয়সে এসে এমন গোহারা হারলাম! এ লজ্জা কোথায় রাখি! 
বাবাকে ভয় পায় বাচ্চা। সে বেশি কথা না বলে বিল্লি ধরে আনল। মাদি হোক বা হুলো, বিড়ালের মগজে কিন্তু বেজায় বুদ্ধি। সে বুঝতে পারছে যে দীনুদা তাকে নির্বাসন দ- দেবেন। সে কি আর সহজে বস্তায় ঢুকতে চায়! মেলা জোরাজুরি করতেই বিড়াল দিল খাঁমচি। তাতে দীনুদার চোখের চশমা ওল্টালো, আরেকটু হলেই তার চোখের বারোটা বাজত। শুরু হতো দীনুদার নতুন দুঃখ।
তাই বলি কি, মিছে দুঃখবিলাস নয়, যেখানে যা যতটুকু আছে, যেভাবে আছে, তাই নিয়ে খুশি থাকুন। নিজের মনে নিত্যনতুন দুঃখ পয়দা করে কী লাভ বলুন। কপালে যা সুখ আছে তাই তো পাবেন। সেই যে কথায় বলে, কপালে না থাকলে ঘি, ঠক ঠকালে 
হবে কী! 


পাথরের ফাঁক-ফোকর দিয়েই
  বিজয়ী ঝকঝকে চোখগুলো এখন তন্দ্রা আর ঝিমুনিতে ঝাপসা।
বিস্তারিত
বিজয়ের তানপুরা
  হাসপাতালের করিডোর ছেড়ে রাস্তায় নামলেন ডাক্তারেরা তড়িঘড়ি তাদের উচ্চারণÑ
বিস্তারিত
রোদ
  রোদ ছিল ব’লে শয্যাপ্রান্তে উম ছিল ঘোর ছিল, ঘুম
বিস্তারিত
অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ
  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাঃ গৌরব আর সৌরভে সম্ভার, মুক্তিযোদ্ধারা;
বিস্তারিত
কোটি স্বপ্নের একটি নাম
  এসেছিল মাঠের কিষান, কিষানি বধূ ফসলের শিল্প গড়া, চাষিরা, 
বিস্তারিত
স্বপ্নসিক্ত ম্যুরাল
  তুমি থাকলে শস্যবীজ পুষ্ট হয় নদীস্রোত কুলুকুলু বহে, ফুল
বিস্তারিত