মুহাম্মদ সামাদের একটি কবিতা

কাঁঠালিয়া নদী, দাউদকান্দি, কুমিল্লা ছবি : গাজী মুনছুর আজিজ

এ কবিতার খুব বড় একটি বিষয় হলোÑ এখানে কবি এত এত অনুষঙ্গকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে আমাদের চেতনায় আঘাত করে বোঝাতে চেয়েছেন যে, একটি জাতির নিজস্বতা না থাকলে তা অচিরেই ভাগাড়ে যাওয়ার প্রবণতাকে যেমন টেনে আনে, তেমনি যথাযথ মর্যাদা দিলে তরতরিয়ে যেতে পারে উন্নতির সোপানে

কবি মুহাম্মদ সামাদের একটি কবিতা : ‘আমি তোমাদের কবিÑ তোমরা আমাকে নাও।’ কবিতাটি তুমুল আলোড়িত করেছিল আমাকে, হাসান আরিফ আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন কোনো এক গুণীজনের সংবর্ধনায়। প্রথম শুনেই মনে হয়েছিলÑ এটা সাধারণ কোনো কবিতা নয়, একে ধরতে গেলে একজন কবিকে জটিল ধ্যানমগ্ন হতে হয় আর তবেই না তন্ন তন্ন করে একশ আটটি নীল পদ্ম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। সেই বিস্ময় অনুভূত হয়েছিল প্রচ- রকম, একটা ঝাঁকুনিও খেয়েছিলাম। হয়তো অনেকেই মনে করবেন কবিতা আবৃত্তিযোগ্য হলে সেটার আর মান থাকে না, সেটা একক অর্থে লীন হয়ে যায়, তার আর বহুমুখী অর্থ থাকে না। ফলে সেটি দুর্বল হয়ে থাকে। কিন্তু এ কবিতাটি সেরকম নয় বলে মনে করা যায়। এর মধ্যে যেমন রয়েছে আবৃত্তিগুণ, তেমনি রয়েছে কবিতাকে কবিতা হয়ে ওঠানোর অন্য একটি আকর্ষণীয় গুণও। এ কবিতার ভেতর ভীষণ ধরনের কাতরতা আর নিজেকে বহির্মুখী করার এক উদার আহ্বান শোনা যায়Ñ যা বাঙালির হাজার বছরের অনুভবযোগ্য সম্পদ বলে বিবেচনা করি, এতে ভালো লাগাও আছে অত্যধিক রকমের। যে কবিতার মধ্য দিয়ে পার হয়ে এসেছেন আমাদের পূর্বপুরুষ, এমনকি পার করছি আমরাও। তার এ কবিতাটি পাঠে মনে হয়েছেÑ আমি আমার দেশকে স্যালুট জানাচ্ছি, বারবার টেনে আনছি অনুভব-মানচিত্রে, আর ছড়িয়ে দিচ্ছি সবদিক এর ব্যাপ্তি ও গৌরবকে। এখানে এমন একটি মিলনমেলার আয়োজন করা হয়েছে যেখানে বাঙালি সংস্কৃতির নানা উপাদানে সমৃদ্ধ। আছে ইতিহাস-ঐতিহ্য-বাঙালির মূল সূত্র, যা পুরো সমাজ অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানকে একত্রে রাখার চরিত্রকে ধারণ করে খুব সহজ ও সংগতভাবে। ফুটে উঠেছে গ্রামবাংলার চিরায়ত চিত্রÑ যা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। চিত্রে চিত্রে বর্ণনা করা হয়েছে দেশের নানা রূপ। সে হিসেবে এটি চিত্রময় কবিতা বলা যায়, যা পঠনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চোখের সামনে এসে উপস্থিত হয়। 
‘আমি তোমাদের কবি’Ñ এখানেই লুকিয়ে আছে দৈশিক চেতনায় উজ্জীবিত আমূল ভাবনা। ‘আমি’কেই তিনি কখনও বুঝিয়েছেন গাঁয়ের মাটির মসজিদ যেখানে যেতে হলে বাঁশের ছোটো সাঁকো পার হতে হয়, কখনও বারোয়ারি মন্দির, বাড়ির পাশ থেকে ভেসে আসা গির্জার ঘণ্টা, কখনও কিয়াঙে কিয়াঙে জোড়হাতেÑ বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি... কখনও লাল হালখাতা, যে হালখাতার সূচনা করেছিলেন সম্রাট আকবর, গ্রামের মেলায় দেখা সারি সারি দোকানের সামনে গুড়-চিনির হাতি-ঘোড়াÑ ঠাকুরমা কিনে এনে খেতে দিতেন, কখনও মাটির হাঁড়ি বানানোর কুমোরের চাকা, কখনও মাটির পুতুল, কখনও ঢেঁকিতে গাঁয়ের বধূর ধানভানার দৃশ্য, কখনও শিশু-কিশোরদের নাগরদোলার ঘূর্ণির আনন্দ, শীতের রাতে চলা যাত্রাপালা, লালন, জাতীয় কবি নজরুল, বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ, কখনও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আবার কখনও একুশে ফেব্রুয়ারিÑ যা অর্জন করতে প্রাণ দিতে হয়েছিল আমাদের ভাইবোনদের, আমাদের জাতীয়তাবোধ উন্নীত করতে যে সময় থেকে বাঙালি পেয়েছে স্বাধীনভাবে বাংলায় কথা বলতে, কখনও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, কখনও ৭ মার্চের ভাষণ, যা রাজনৈতিক কবিতা হিসেবেও খ্যাত এবং এটি ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যে স্থান পেয়েছে, কখনও বা দেশরক্ষার স্বার্থে অগণিত নারী-পুরুষ প্রাণ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে ঠিক তার কথাই, কখনও বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে থাকা চোখ ঝলসানো চৈত্রের প্রচ- গরম হাওয়া, কখনও গাছের নতুন পাতা ভীষণ চকচকে, আমের সুসজ্জিত টোপর পরা মুকুল, পদ্মার ইলিশ, পোয়াতি কাতলা ও তার ভবিষ্যৎ, কখনও নিজের দেহমন পবিত্র করার উদ্দেশে সংঘটিত অষ্টমীর স্নান, যমুনার ঘোলা জল ও ঘোলা মেয়ে, নদনদীর উর্বর পলি, কখনও জমির চিকন আল ছুঁয়ে ধানের খেতে বাতাসের দোলা, জারি-সারি-কবিগান আর এসবের টান, কখনও বিলের কলমি গল্প করছে খলসে মাছের সঙ্গে, হিজিবিজি কচুরিপানার ফুল, কখনও কাশবাগানের পাশ ঘেঁষে বিলের অল্প জলে মাছ খোঁজা সাদা বক, গ্রাম ও শহরের বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ, কখনও ঈদ, কখনও দুর্গাপূজা, কখনও বড়দিন, কখনও বুদ্ধপূর্ণিমা, কখনও নৌকার বহর, নদীতে দু-একজন মাঝির ভাটিয়ালি, কখনও মারফতি গানের আওয়াজ, ঈদে কিংবা পূজায় পাওয়া দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত কিশোরীর নতুন পিরান যা আনন্দে ভাসিয়ে দেয় তাকে, কখনও পৌষের পিঠাপুলি, আউশের ফেনাভাত, পাটশাক, সজনের ডাঁটা, শুকনও মরিচ, কখনও বাউরি বৃষ্টির সঙ্গে ঝরে পড়া কাঁচা আম, মায়ের হাতের পায়েস, ডালায় বিন্নির খই, ঘরেপাতা দই, কখনও রঙিন কাচের চুড়ি, মাটির গয়না, কখনও রুপোর নোলক, লাল-নীল-বেগুনি পুঁতির মালা, কখনও ঘোলা জলের মেয়ের খোঁপায় জড়ানো শাপলা, কখনও কালো টিপ, কখনও লাল ঠোঁট...।
আর ‘কবি’ বলতে কবি বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সাংস্কৃতিক উপাদান সমৃদ্ধ বিষয়-আশয়কে বুঝিয়েছেনÑ যা একান্তই আমাদের চিত্তের। এসবে না আছে অন্যদের হস্তক্ষেপের অধিকার, না আছে প্রভাবিত করার কৌশল। এ কবিতার খুব বড় একটি বিষয় হলোÑ এখানে কবি এত এত অনুষঙ্গকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে আমাদের চেতনায় আঘাত করে বোঝাতে চেয়েছেন যে, একটি জাতির নিজস্বতা না থাকলে তা অচিরেই ভাগাড়ে যাওয়ার প্রবণতাকে যেমন টেনে আনে, তেমনি যথাযথ মর্যাদা দিলে তরতরিয়ে যেতে পারে উন্নতির সোপানে। তার এ কবিতায় নিসর্গের প্রতি গভীর প্রেম ও দার্শনিকতা একটি অনবদ্য ব্যঞ্জনা সূচিত করে। আমাদের অনুভবের দ্বারকে করে বহু মুখে প্রসারিত। এত সব ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বরণ করে নেওয়ার প্রতি তিনি আমাদের সবাইকে আহ্বান জানান। ফলে ‘আমি তোমাদের কবি’Ñ এখানে ‘আমি’ ও ‘কবি’ শব্দ দুইটি অভিন্ন অর্থকেই প্রকাশ করছে এবং এর প্রস্ফুটিত সুগন্ধ ছড়িয়ে যায় সবার মাঝে অর্থাৎ ‘তোমাদের’ হয়ে যায়। এক সময় ‘আমি’, ও ‘কবি’ ‘তোমাদের’ শব্দটির মাঝে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আর তখনই গ্রহণের ব্যাপারটি বোধে এসে পড়ে। এভাবেই কবি আমাদের নাড়িয়ে দেন, শানিত করে দেন স্নায়ুতন্ত্রকে। হ


রুদ্রর কবিতা উচ্চারণ থেকে কথনে
রুদ্রর বহির্মুখী চেতনারাশির ওপর তার ভাবকল্প ও সংরাগবহুলতার তোড় আছড়ে
বিস্তারিত
আলো জেলে রাখি কবিতার খাতায়
কী নীরব রাত! একা একা বসে লিখছি। লেখার মাঝে দুঃখগুলো
বিস্তারিত
কতিপয় বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের টীকা
  ১. নিরন্তর শুষ্কতার বশে আমি এক মরুকাঠ; অথচ ঠান্ডাজলপূর্ণ কিছু
বিস্তারিত
রৈখিক রক্তে হিজলফুল
বৃষ্টি হৃদয় উঠোন ভিজিয়ে যায় বিপ্রতীপ বিভাবন আঁধারের ক্লান্তিলগ্নে চোখের
বিস্তারিত
অপারগতা
না তুষার ঝড় না মাইনাস ফোর্টি শীতের রাত তো, বুড়োটা কিছুক্ষণ
বিস্তারিত
যন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাস
  অলীক স্বপ্ন, অসীম দহন, সমুখের হিসাব নিকাশ প্রদীপের শিখা ছিল
বিস্তারিত