মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

মুসলিমের প্রতি মুসলিমের হক

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আড়াল থেকে মুসলিমের জন্য কেউ দোয়া করলে তা কবুল হয়ে যায়। তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে। যখনই সে তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দোয়া করে, তখন দায়িত্বশীল ফেরেশতা আমিন বলে এবং বলে, ‘তোমার জন্যও অনুরূপ হোক।’

মুসলিম সমাজ নানা কর্মব্যস্ততা ও বস্তুবাদী জীবনের প্রচ- স্রোতে দায়িত্ব-কর্তব্য ও সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করার বিষয়ে উদাসীন হয়ে আছে। সেখানে ফেরার আশাটাও সে ভুলে যাচ্ছে কিংবা ভুলে থাকার ভান করছে। তার জীবনের সম্পর্ক ও যাত্রাপথের সংশোধনের কথাও তার কাছে বিস্মৃত। বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে, জীবনের দিনগুলো ফুরিয়ে যাচ্ছে আর গ্যাপ ও শূন্যতা বাড়ছে তো বাড়ছেই। জীবনকে আচ্ছন্ন করে আছে নির্মম মানসিকতা ও নির্দয় আবেগ।
ইসলাম সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধনগুলোকে গুরুত্ব প্রদান করেছে। সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণে প্রেরণা দিতে প্রতিদানের ব্যবস্থা করেছে, যেন হৃদয়গুলো পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয়, বন্ধনগুলো সুদৃঢ় হয়, প্রয়োজনে সাড়া মেলে। যেন সমাজের সদস্যরা উন্নত নৈতিক চরিত্র ও সুন্দর কাজের মনোভাব নিয়ে বেড়ে ওঠে। যেন পুণ্যের পাল্লা ভারী হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
অধিকারগুলো আদায় করা হলে এবং সম্পর্কগুলো শক্তিশালী হলে সমাজের বাহু সংহত হবে, তার খুঁটি মজবুত হবে এবং ভিত্তি শক্ত হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের ছয়টি হক আছে।’ বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, সেগুলো কী কী? তিনি বললেন, ‘তার সঙ্গে দেখা হলে সালাম দেবে, সে তোমাকে দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করবে, সে তোমার কাছে পরামর্শ চাইলে তার কল্যাণ কামনা করে পরামর্শ দেবে, সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে তার জবাব দেবে, সে অসুস্থ হলে তার খোঁজ নেবে এবং সে মারা গেলে তার জানাজায় উপস্থিত হবে।’
এটি একটি বিশাল গুরুত্ববাহী হাদিস, যা সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে দিগন্ত খুলে দেয়। জীবনে প্রাণ সঞ্চার করে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তাদের অন্তরগুলোকে এক করে দিয়েছেন, আপনি পৃথিবীর সবকিছুর বিনিময়েও তাদের মনগুলোকে এক করতে পারতেন না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মাঝে সৌহার্দ্য তৈরি করে দিয়েছেন।’ (সূরা আনফাল : ৬৩)।
মুসলিমের প্রতি মুসলিমের সর্বপ্রথম হক হলোÑ প্রীতি ও ভালোবাসার বাণী, জান্নাতবাসীদের অভিবাদন সালাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা মোমিন হতে না পারলে জান্নাতে যেতে পারবে না, আর পরস্পরকে ভালো না বাসলে মোমিন হতে পারবে না। আমি কি তোমাদের এমন কিছু বাতলে দেব, যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে? তোমরা পরস্পর সালামের প্রচলন করো।’
সালাম হৃদয়ের ভালোবাসার চাবিকাঠি। যে-কোনো দ্বারে প্রবেশের অনুমতির মাধ্যম, যা জীবনকে বরকত, উন্নতি ও সমৃদ্ধি দিয়ে পরিপুষ্ট করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা গৃহে প্রবেশ করলে নিজেদের মধ্যে সালাম দাও, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতময় পবিত্র অভিবাদন।’ (সূরা নূর : ৬১)।
সালাম নিরাপত্তা ও শান্তির পয়গাম। সালাম ঈমানদার ব্যক্তির পরিচায়ক। যে লোক সালামের মর্ম ও মর্যাদা চিনেছে এবং তার তাৎপর্য ও সম্মান অনুসারে জীনবযাপন করেছে তার আত্মা পবিত্র হয়েছে, তার আচরণ পরিশীলিত হয়েছে এবং দ্বীন ও দুনিয়া উভয় দিক দিয়ে তার সামাজিক উন্নতি হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘এর দ্বারা তিনি ওই ব্যক্তিকে সালাম বা শান্তির পথ দেখান, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে, তিনি তাদের স্বীয় অনুগ্রহে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান এবং তাদের সঠিক পথের দিশা দান করেন।’ (সূরা মায়েদা : ১৬)।
মুসলিম ভাইয়ের প্রতি মুসলিমের আরেকটি হক হলোÑ তার নিমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া, তার আয়োজিত উৎসবে ও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া, তার মনকে খুশি করা, তার আনন্দে অংশগ্রহণ করা। পরস্পর দাওয়াত গ্রহণ করলে তা একতা ও সম্প্রীতি আনে, সাক্ষাৎ ও মিলন ঘটায় এবং এর ছত্রছায়ায় সমস্যাগুলো দূর হয়। বুদ্ধিমানরা তিরস্কার থেকে বাঁচতে পারে। ফলে বন্ধনগুলো মজবুত হয়, দূরত্বগুলো ঘুচে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কাউকে খাবারের নিমন্ত্রণ করা হলে তাতে সাড়া দেবে, তার মন চাইলে খাবে নতুবা রেখে দেবে।’
উৎসবের মান খরচের আকার ও লৌকিকতার আধিক্য দিয়ে মাপা যাবে না; বরং তা মাপা হবে মুসলমানের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে। অনুষ্ঠানগুলোতে অপচয় করা নিন্দনীয় কাজ, শরিয়ত তাতে সায় দেয় না। ফলে বরকত নষ্ট হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, তবে অপচয় করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালোবাসেন না।’ (সূরা আরাফ : ৩১)। 
মুসলিমের প্রতি তৃতীয় হকটি হলোÑ তার মুসলিম ভাইকে বিনয় ও নম্রতা সহকারে পরামর্শ প্রদান করা। কল্যাণের পরামর্শ দান করা মুসলিমের পক্ষ থেকে তার ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসার বার্তা। কেননা সে তাকে ভালোবাসে; তাই তার জন্য কল্যাণ কামনা করে। তার যাবতীয় অনিষ্টতায় আশঙ্কা ব্যক্ত করে। কল্যাণ কামনাকারীর জন্য ইসলামে বিরাট মর্যাদা আছে। যেদিন মানুষ তার রবের সামনে দাঁড়াবে, সেদিন তার বিশেষ সম্মান থাকবে। নসিহত প্রদানকারী যখন নসিহত করে, তখন সত্যবাদী ব্যক্তির মন নসিহতের প্রতি প্রফুল্ল হয়, তার মন তা নীরবে শোনে, তার অন্তর তা মেনে নিতে অগ্রসর হয়। নসিহতকারীর প্রতি ভুল ধারণার কারণে সে তা ফিরিয়ে দেবে না। ভুল ব্যাখ্যা করবে না। আমিরুল মোমেনিন ওমর (রা.) বলতেন, ‘আল্লাহ ওই লোকের প্রতি দয়া করুন, যে আমাদের দোষ-ত্রুটি সঠিক করে দেয়।’ প্রকৃত কল্যাণকামী দয়াবান উপদেশদাতা আর উপদেশের আড়ালে কুৎসা রটনাকারী নিন্দুকের মাঝে অনেক তফাত। একজন ভালোবেসে দোষ ঢেকে রাখে আর অন্যজন সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, অপবাদ দেয়, দোষ প্রকাশ করে।
চতুর্থ হকটি হলোÑ হাঁচিদাতার জবাব দেওয়া, তার জন্য রহমতের দোয়া করা। সব মানুষই দোয়া পেলে খুশি হয়। সে আরও বেশি রহমতের প্রত্যাশা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আড়াল থেকে মুসলিমের জন্য কেউ দোয়া করলে তা কবুল হয়ে যায়। তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে। যখনই সে তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দোয়া করে, তখন দায়িত্বশীল ফেরেশতা আমিন বলে এবং বলে, ‘তোমার জন্যও অনুরূপ হোক।’
হাঁচি বান্দার জন্য আল্লাহর একটি নেয়ামত, যা শোকর ও প্রশংসার দাবি রাখে। হাঁচিদাতার জন্য রহমত কামনা করলে, তার জন্য দোয়া করলে, আল্লাহর জিকির করলে শয়তান ক্রুদ্ধ হয়, তাড়িত হয়। হাঁচিদাতার জন্য নির্দেশ হলো, সে যেন তার শ্রোতার জন্য, তার রহমতকামনাকারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, তার হেদায়েত ও আত্মার পরিশুদ্ধি চায়।
মুসলিমের প্রতি মুসলিমের অন্যতম আরেকটি হক হলোÑ অসুস্থতার সময় তার দেখাশোনা করা। কারণ রোগী ব্যক্তি কষ্ট ও ক্লেদের মধ্যে ভুগতে থাকে, কখনও তার রোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়, কয়েক সপ্তাহ ও কয়েক মাস হয়ে যায়, তার চোখের পাতা বন্ধ হয় না, তার মন স্থির হয় না; বরং সে ব্যথায় দগ্ধ হতে থাকে, কষ্টে এপাশ-ওপাশ করে। সে দোয়া করতে থাকে যেন আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করেন। ফলে যেন তার পুণ্য বৃদ্ধি করেন। অন্যের দেখা-সাক্ষাৎ তার কষ্ট লাঘব করে। একটি কথা দুঃখের মাঝেও তাকে সান্ত¡না দেয়। একটি স্নেহের পরশ তাকে ভাইদের সান্নিধ্যের অনুভব প্রদান করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোগীকে দেখতে যায়, যার মৃত্যুর সময় এখনও আসেনি, তারপর তার কাছে গিয়ে সাতবার এ দোয়াটি বলেÑ আমি মহান আরশের মালিক আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন তোমাকে আরোগ্য দান করেন, তবে আল্লাহ তাকে সুস্থতা দিয়ে দেন।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘যে রোগীকে দেখতে যায় অথবা তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যায়, তখন আল্লাহর কাছে একজন ঘোষক ঘোষণা করেÑ তুমি ভালো থেকো, তোমার যাত্রা শুভ হোক, জান্নাতে তোমার ঠিকানা হোক।’
জানাজায় অংশগ্রহণ করে ও দোয়ার মাধ্যমে মুসলিমের হক মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি মৃত্যুর পরও চলতে থাকে। ইসলাম কত মহান ধর্ম! মুসলিম মারা গেলে তাকে গোসল দেওয়া হয়, কাফন পরানো হয়, তার জন্য নামাজ ও দোয়া করা হয়। তার কবর পর্যন্ত তাকে বিদায় জানানো হয়। মাটি দিয়ে দাফন করা হয়। কবরের সুরক্ষা করা হয়, যাতে তার অবমাননা না হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিমের জানাজায় উপস্থিত হবে, নামাজ পর্যন্ত তার সঙ্গে থাকবে, তার দাফনে অংশ নেবে, সে দুই কিরাত পরিমাণ সওয়াব নিয়ে ফিরে আসবে, প্রতি কিরাত ওহুদ পাহাড় সমান।’ এ হকগুলো আদায় করলে সমাজের বন্ধন অটুট থাকবে।


২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


ভোট প্রদানের জাতীয় দায়িত্ব
কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, অত্যাচারী, পাপাচারী, ও বেঠিক
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার প্রতি যা ওহি হয়,
বিস্তারিত
ধনীদের সম্পদে রয়েছে গরিবদের অধিকার
চাঁদপুর ট্যুর থেকে ফিরছিলাম। ভোরে সদরঘাট থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের
বিস্তারিত
মুসলমান শব্দের আক্ষরিক ব্যাখ্যা
  আরবি ‘মুসলিম’ শব্দের ফারসি রূপ হচ্ছে ‘মুসলমান’। মুসলমান শব্দটি লিখতে
বিস্তারিত
মহান মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের অবদান
আলেম সমাজের মাঝে যিনি সর্বপ্রথম পশ্চিম পাকিস্তানের জালেম শাসকদের জুলুম-অত্যাচারের
বিস্তারিত
কীভাবে কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বাড়াবেন
বলা হয়ে থাকেÑ  Human assets can not be reflected অর্থাৎ, মানবিক শক্তি
বিস্তারিত