বিমানের সফর যা শেখায়

কিছুদিন আগের কথা। লন্ডন টু বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটে আমরা দুজন বসে গল্প করছি। বিবিধ প্রসঙ্গে কথা চলছে। একপর্যায়ে জীবনসঙ্গিনীকে জিজ্ঞেস করলাম, বলো তো বিমানে চড়ে এত ঊর্ধ্ব আকাশে উড়ার ফিলিংসটা কী! বিমান তখন প্রায় ৩৫ হাজার ফিট ওপরে। আমি ব্যাগ থেকে নোটবুক বের করে পয়েন্ট লিখতে লাগলাম। দুজন মিলে যৌথভাবে বেশ কয়েকটি পয়েন্ট বের করলাম। আনন্দ, বিনোদন, উপভোগ এসব ছাড়াও বিমানে চড়ে আকাশে উড়ার সময় মনের ভেতর কী প্রতিক্রিয়া জাগ্রত হয়, কী অনুভূতি আসে কিংবা এ যাত্রা আমাদের কী মনে করিয়ে দেয়? সেই সময় লিখিত অনেক পয়েন্ট থেকে এখানে সম্মানিত পাঠকদের সামনে কয়েকটিমাত্র পেশ করা হলো।

এক. স্থলযান, জলযান কিংবা বিমান যে-কোনো বাহন ও পরিবহনে আরোহণের সময় পড়ার জন্য ইসলাম আমাদের একটি চমৎকার দোয়া শিখিয়ে দিয়েছে। দোয়াটি সবার জানা থাকার কথা। সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা...। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘যাতে তোমরা তাদের পিঠের ওপর আরোহণ করো। অতঃপর তোমাদের পালনকর্তার নেয়ামত স্মরণ করো এবং বল, পবিত্র তিনি, যিনি এদেরকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন এবং আমরা এদের বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না।’ (সূরা জুখরুফ : ১৩)। কেমন চমৎকার অর্থবহ চির আধুনিক একটি দোয়া। সেই প্রাচীন যুগের বাহন জন্তু থেকে নিয়ে আধুনিক যুগের উড়োজাহাজ পর্যন্ত সর্বত্রই এ দোয়া উপযোগী, কার্যকর ও চলনসই। সত্যিই তো! আল্লাহ তায়ালা যদি এসব যন্ত্রপাতি আমাদের অনুগত ও বশীভূত না করে দিতেন তবে কি শূন্য আকাশে এত হাজার হাজার ফিট ওপরে উড়া আমাদের পক্ষে সম্ভবপর হতো?
দুই. মানুষের আকাশে উড়ার চেষ্টা অনেক আগের কথা। ইতিহাসের বিভিন্নকালে অনেক ব্যক্তিই এ চেষ্টা করেছেন। তবে মানব ইতিহাসে প্রথম সফলভাবে আকাশে উড়ার স্বীকৃতি রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের, যারা ১৯০৩ সালে প্রথম তাদের উদ্ভাবিত উড়োজাহাজ নিয়ে আকাশে উড়েন এবং সফলভাবে অবতরণ করেন। কিন্তু তাদের অনেক আগেই একজন মুসলিম বিজ্ঞানী প্রথম সফলভাবে আকাশে ওড়েন, যদিও তার অবতরণ সফল হয়নি।
আব্বাস ইবনে ফিরনাস নামের এ বিজ্ঞানী ছিলেন বার্বার বংশোদ্ভূত আন্দালুসিয় মুসলিম পলিমেথ (বহু শাস্ত্রবিশারদ)। তার আসল নাম আব্বাস আবুল কাসিম ইবনে ফিরনাস ইবনে ইরদাস আত তাকুরিনি। তিনি ৮১০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি ছিলেন একাধারে একজন আবিষ্কারক, প্রকৌশলী, উড্ডয়ন বিশারদ, চিকিৎসক, আরবি সাহিত্যের কবি এবং আন্দালুসীয় সুরকার। আন্দালুসিয়ার কর্ডোভায় বসবাস করতেন তিনি। এ বিজ্ঞানী ৮১০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাসে ইবনে ফিরনাস প্রথম ব্যক্তি, যিনি সফলভাবে তার আবিষ্কৃত যন্ত্রের সাহায্যে আকাশে উড়েছিলেন। তার আবিষ্কৃত যন্ত্র নিয়ে তিনি স্পেনের কর্ডোভার উঁচু পাহাড় ‘জাবাল আল-আরুস’র চূড়া থেকে ঝাঁপ দেন। যেসব নির্ভরযোগ্য লেখক এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন তাদের মতে তিনি প্রায় পাখির মতোই গ্রহণীয় মাত্রার দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হন। প্রায় ১০ মিনিট আকাশে উড্ডয়ন করেন। তবে অবতরণের সময় তিনি পিঠে মারাত্মকভাবে আঘাত পান। এর কারণ, পাখিরা অবতরণের সময় লেজের ব্যবহার করে, যার ব্যবস্থা তিনি তার যন্ত্রে রাখেননি।
বিজ্ঞানজগতে তার অবদান ও সাফল্য তাকে পৃথিবীর জ্ঞানের ইতিহাসে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির মর্যাদায় ভূষিত করেছে। সম্মানসূচক ইরাকের রাজধানী বাগদাদের বিমানবন্দর সংলগ্ন সড়ক এবং স্পেনের কর্ডোভার একটি সেতু তার নামে ‘ইবনে ফিরনাস’ নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া চাঁদের একটি জ্বালামুখের নামও তার নামে নামকরণ করা হয়েছে। (ইন্টারনেট)।
তিন. মনে পড়ল শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুহাম্মাদ তাকি উসমানির কথা। জ্ঞান ও অভিজ্ঞানে আল্লাহ তায়ালা তাকে এক ঈর্ষণীয় স্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। সমকালীন বিশ্বে তার মতো সর্বমহলে আদৃত মুসলিম গবেষক আলেম আরেকজন মেলানো ভার। পশ্চিমা অমুসলিম দেশগুলোর ব্যাংকগুলোও পরামর্শের জন্য তার দ্বারস্থ হয়। দ্বীনের দাওয়াত, বিশেষ করে ইসলামি আইনের ব্যাখ্যা এবং চলমান বিশ্বে সেগুলোর প্রায়োগিক পদ্ধতি বিশ্লেষণ করতে তিনি দুনিয়ার বহু দেশ সফর করছেন। তার ভাষায়Ñ পাখির মতো অবিরত আকাশে উড়ে চলছেন। কয়েক বছর আগে তার রচিত পবিত্র কোরআনের একটি সহজ ও সংক্ষিপ্ত তাফসিরগ্রন্থ বের হয়েছে এবং এরই মধ্যে সেটি বাংলাসহ পৃথিবীর অনেক ভাষায় অনূদিত হয়ে এসেছে। সেই গ্রন্থের ভূমিকা এবং প্রতি সূরার পরে উল্লিখিত রচনার স্থান ও সময় পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আল্লাহর পবিত্র কালাম যেমন ওপর থেকে এ দুনিয়ায় অবতীর্ণ হয়েছে, তেমনি তাকি উসমানি এ রচনাকর্মের সিংহভাগই আঞ্জাম দিয়েছেন বিমানের সফরে আকাশে উড়ে উড়ে। বস্তুত তার এ বিরল ও দুর্লভ কর্মে আমাদের জন্য রয়েছে শিক্ষার অনেক উপকরণ।
চার. আজকাল সাধারণত বিমানের প্রত্যেকটি আসনের সামনে একটি টাচ স্ক্রিন থাকে। সেখানে ম্যাপস অন করলে দেখা যায়, উড়ন্ত বিমান কোন কোন দেশ বা জনপদের ওপর কিংবা পাশ দিয়ে অতিক্রম করছে। নামগুলো যখন চোখের সামনে চলে আসে, তখন মনের আয়নায় ইসলামি ইতিহাসের অনেক ছবি ভেসে ওঠে। কুফা, বসরা, বাগদাদ, বোখারা, সমরকন্দ, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তানসহ আরও কত অঞ্চল! যেসব অঞ্চলের সূর্যসন্তানরা তাদের কর্ম ও কৃতিত্ব দ্বারা ইসলামের ইতিহাসে এবং শিক্ষানুরাগী মুসলিমদের হৃদয়ে একটি উচ্চ আসন গ্রহণ করে চিরজীবী হয়ে আছেন। ইমাম আবু হানিফা, বোখারি, নাসায়ি আরও কত মহান পূর্বসূরি মনীষী। তাদের অবদানগুলো স্মরণ হলে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় দিল বিগলিত হয়ে আসে।
পাঁচ. শুধু কি তাই? বিমান যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম জনপদগুলো অতিক্রম করে চলে, তখন হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে যায় এবং হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে। জোর গলায় কাঁদতে ইচ্ছে করে। সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, আফগান, ফিলিস্তিন আরও কত মুসলিম অঞ্চলের ওপর পৈশাচিক ও অমানবিক নির্যাতন চলছে! জেনোসাইড পরিচালিত হচ্ছে! কিন্তু এসব নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই! উত্তরণের কোনো চিন্তা-ফিকিরও নেই! নির্যাতিত ভাইবোনদের পাশে দাঁড়ানো কিংবা ন্যূনতম সাহায্য করার ঈমানি শক্তিও আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি বোধ হয়!


ভোট প্রদানের জাতীয় দায়িত্ব
কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, অত্যাচারী, পাপাচারী, ও বেঠিক
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার প্রতি যা ওহি হয়,
বিস্তারিত
ধনীদের সম্পদে রয়েছে গরিবদের অধিকার
চাঁদপুর ট্যুর থেকে ফিরছিলাম। ভোরে সদরঘাট থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের
বিস্তারিত
মুসলমান শব্দের আক্ষরিক ব্যাখ্যা
  আরবি ‘মুসলিম’ শব্দের ফারসি রূপ হচ্ছে ‘মুসলমান’। মুসলমান শব্দটি লিখতে
বিস্তারিত
মহান মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের অবদান
আলেম সমাজের মাঝে যিনি সর্বপ্রথম পশ্চিম পাকিস্তানের জালেম শাসকদের জুলুম-অত্যাচারের
বিস্তারিত
কীভাবে কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বাড়াবেন
বলা হয়ে থাকেÑ  Human assets can not be reflected অর্থাৎ, মানবিক শক্তি
বিস্তারিত