সুদানে গ্রামীণ ছাত্রদের শহুরে জীবন

যেসব সুদানি ছাত্র পড়াশোনা করতে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে তারা রীতিনীতি, চালচলন ও লাইফ স্টাইলের ভিন্নতায় প্রভাবিত হয়েছে। তাদের কেউ কেউ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে অথবা নতুন বাস্তবতাকে ভালোবেসে ফেলেছে। আর কেউ কেউ পুরোনো জীবনের প্রতি মায়াটা এখনও ধরে রেখেছে।
২১ বছর বয়সি মুহাম্মাদ আহমাদ মধ্য সুদানের জাজিরা প্রদেশের ওয়াদবাতরো গ্রাম থেকে সুদানের রাজধানী খারতুমে এসেছে ‘হাই ক্লাস’ একাডেমিতে পাইলটিং বিদ্যায় পড়াশোনা করতে। সেখানে সে লক্ষ করল, শহুরে জীবন একেবারেই গ্রামের জীবনের মতো নয়। আল-আরাবি আল-জাদিদকে সে বলে, শহরের জীবনটা তার গ্রামের বদ্ধমূল রীতিনীতি ও চালচলন থেকে ভিন্ন। এমনকি মানুষের দৈনন্দিন আচরণও ভিন্ন। সে এদিকে ইঙ্গিত করে বলে, খারতুমে থাকাকালে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন পরিস্থিতি তাকে কারও সঙ্গে সে রকম চলাফেরা ও আচরণ করতে বাধ্য করে, যদিও তাদের লাইফ স্টাইল কোনো কিছুতেই তেমন নয়। সে স্পষ্ট করে উল্লেখ করে, তার খাদ্যাভ্যাসও পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগে সে দেশীয় সাধারণ খাবার যেমন কাসরা রুটি, ওয়াইকা, সুদানি ছারিদ ইত্যাদির ওপর নির্ভর করত, এখন সে ফাস্টফুড খেতে শুরু করেছে।
মুহাম্মাদ আহমাদ বলে, এমনকি আমার পোশাকও পরিবর্তন হয়েছে। আমি গ্রামে অধিকাংশ সময় সুদানি লম্বা জামা ও পায়জামা পরতাম। কিন্তু এখন শহরে আমি সবসময় শার্ট ও পেন্ট পরি। এ বিষয়টি তাকে অনেকটা অবাক করেছে, গ্রামের সাধারণ পেন্ট যেটা সে পরত, খারতুমে যে পেন্ট সে দেখতে পেয়েছে তা এক রকম নয়। এখানে পেন্টের এত এত স্টাইল ও রূপ, যা পরার কথা সে কখনও ভাবেনি। যেমনÑ জিন্স, টি-শার্ট ইত্যাদি। গ্রামের অনেক ছেলে এ ধরনের স্টাইলে প্রভাবিত হয়েছে বলে সে ইঙ্গিত করে। তবে তা তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি।
শহরে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টার সঙ্গে সে আকস্মিক মুখোমুখি হয়েছে, সেটি হলো নারী-পুরুষের অবাধ ও উন্মুক্ত সম্পর্ক এবং রিলেশন, বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের রিলেশন। গ্রামে রিলেশনটা অনেক বেশি সীমিত। সে মনে করে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যকার এ রিলেশনের দুটি দিক আছে। একটি নেতিবাচক, আরেকটি ইতিবাচক। এ কথা ঠিক যে, কিছু সম্পর্ক চিন্তার বিনিময় ও আলোচনা-পর্যালোনার বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, তবে কিছু সম্পর্ক শুধুই বিনোদনে সীমাবদ্ধ। তার ক্লাসমেট ফাতেমা সুদানের হোয়াইট নীল প্রদেশ থেকে এসেছে। সে বলে, শহরে তার জীবন অনেক কঠিন। শহরে সে এমন কাউকে পায় না যে, তাকে বিভিন্ন কঠিন মুহূর্ত ও পরিস্থিতিতে সহযোগিতা করবে এবং তার পাশে দাঁড়াবে। এটা গ্রামের জীবনের উল্টো। সে ইঙ্গিত করে বলে, শহরে সামাজিক হস্তক্ষেপের পরিধি অনেকটাই দুর্বল। গ্রামের একজন নারী হিসেবে সে এর মূল্য অনুভব করে। তার ক্লাসমেট মারইয়াম তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে। সে কিসলা অঞ্চলের একটি গ্রাম থেকে এসেছে। সে মনে করে, গ্রামের জীবন থেকে শহুরে জীবনে আসার ইতিবাচক দিকগুলোই বেশি নেতিবাচক দিকগুলোর চেয়ে। সে উল্লেখ করে, শহরে শিক্ষার সুযোগগুলো বিশাল। এছাড়াও এখানে নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করা যায়, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও নতুন ব্যক্তিদের পরিচয় লাভ করা যায়, যা সুদানের সামাজিক বন্ধনগুলোকে শক্তিশালী করছে। সেই সঙ্গে রয়েছে বড় বড় সামাজিক শৃঙ্খল থেকে নারীর মুক্তিলাভ, গ্রামের জীবন যেগুলোকে চাপিয়ে দেয়।
পশ্চিম কর্ডোফান অঞ্চলের একটি গ্রাম থেকে আসা খামিস আবদুল্লাহ নামক শিক্ষার্থী, সে উম্মেদারমান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে। তার কথা হলো শহরে অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এখানে শিক্ষার্থী অন্যদের সঙ্গে সহাবস্থানের সুযোগ পায়। সে আরও যোগ করে বলে, সুদানের প্রান্তিক গ্রাম্যজীবন অন্যদের সঙ্গে কুটিল আচরণ ও গোত্রীয় বিভিন্ন বিরোধ এবং সংঘাতে জর্জরিত, যা সামাজিক গঠনে প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে শহরে শিক্ষার্থীর জন্য বড় বড় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। যেমনÑ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিকাশ। একই সময়ে সে একথাও জোর দিয়ে বলে, সে তার পরিবারের প্রতি টান অনুভব করে, যা মাঝেমধ্যে তাকে ক্লান্ত করে তোলে। তার মন চায়, রাসায়নিক পদার্থমুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে। শহরে সে ফাস্টফুডের ওপর নির্ভরশীল। আরেক শিক্ষার্থী সালেম স্বীকার করে, নারী সম্পর্কে তার মত সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। একসময় সে নারীর দিকে তাকাত; তাকে জীবনের একটি প্রান্তিক সত্তা হিসেবে। এখন সে তাকে স্বাধীন ব্যক্তিত্ব মনে করে, যাকে বান্ধবী, সঙ্গী ও বোন হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব।
সমাজবিষয়ক গবেষক ফয়সাল জাইন বলেন, গ্রাম থেকে শহরের দিকে সামাজিক স্থানান্তরটা জীবনের পরিবেশের একটি সামগ্রিক পরিবর্তনের নামান্তর। যে অঞ্চল থেকে ছাত্রছাত্রীরা শহরে এসে থাকে সে অনুসারে শহরের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, গ্রামাঞ্চলের কিছু কিছু অভ্যাস ও রীতি শহরের চেয়ে বেশি একটা ভিন্ন নয়।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা শহরে এসে বিশাল একটা স্বাধীনতা পায়। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি পায়। একই সময়ে জীবনের কিছু কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, বিশেষ করে জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে, যা তার ব্যক্তিত্বে বড় বড় পরিবর্তন ঘটায়।
আল-আরাবি আল-জাদিদকে তিনি আরও বলেন, ছাত্র কিংবা ছাত্রীর আচরণে শহরে আগমনের ফলে যে পরিবর্তনটা ঘটে থাকে, তা ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সেখানে কেউ কেউ যথাসম্ভব দ্রুত নতুন জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং পুরোপুরি তাতে মিশে যেতে পারে। তবে শহুরে জীবন অন্য একটা অংশকে পরিবারে চলতে থাকা কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাদের অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়। তিনি এ অবক্ষয়টাকে ওই পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত মনে করেন, যেটা সামাজিক মূল্যবোধগুলোর ওপর এসে আপতিত হয়, যা ব্যক্তির আচরণে পুরোপুরি প্রতিফলিত হতে থাকে। তিনি ব্যক্ত করেন, সেখানে এমন কিছু লোকের খুব সফল দৃষ্টান্তও রয়েছে, যারা এ স্থানান্তর থেকে উপকৃত হয়ে তাদের জীবনের গতিপথকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
ফয়সাল জাইন এদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, গ্রামের ছাত্রদের শহরের প্রতি প্রভাবের মাত্রানুসারে তাদের নেতিবাচক প্রভাবও সেই শহরে পড়ে থাকে। গ্রাম থেকে শহরে বয়ে আনা অভ্যাস ও স্বভাবের ফলে। আর এ বিষয়টি বড় আকারে লক্ষ করা যায়। খারতুম ও অন্যান্য শহরে মানুষ শহরকে গ্রামীণকরণের এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে।
খারতুম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপিকা আবির আবদুর রহমান আল-আরাবি আল-জাদিদকে বলেন, গ্রাম থেকে শহরে আসা ব্যক্তির আচরণে পরিবর্তনের মাত্রার হার সেই ব্যক্তির নিজের সঙ্গেই জড়িত। কিছু উচ্চ সংবেদনশীল ব্যক্তির শহরের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, বিভিন্ন সমস্যা ও জটিলতার মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সেসব ছাত্রী, যাদের সমাজকে ভয় পাওয়ার মাত্রা অনেক বেশি। তিনি ইঙ্গিত দেন, কখনও এ স্থানান্তর শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন একাডেমিক সমস্যারও কারণ হয়ে থাকে।

ি সূত্র : নিউ এরাব 


ইসলামে অকারণে গাছ কাটা নিষিদ্ধ
রাসুলে করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যখন কোনো মুসলিম গাছ লাগায়
বিস্তারিত
দুনিয়া আসক্তির ভয়ানক পরিণতি
কিছু সময়ের জন্য আমরা এ দুনিয়ায় এসেছি। এ কথাটি সাধারণত
বিস্তারিত
ইমাম বোখারি (রহ.) ও এক হাজার
ইমাম বোখারি (রহ.) একবার সমুদ্রপথে সফরে বেরিয়ে পড়লেন। সফরের পাথেয়
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী  পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেনÑ সৃষ্টি
বিস্তারিত
মসজিদে আকসার পুরাকীর্তি জাদুঘর
ইসলামি পুরাকীর্তি জাদুঘরটিকে পবিত্র মসজিদে আকসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন,
বিস্তারিত
ভ্যালেন্টাইনসের বদলে বোন দিবস!
  ভ্যালেন্টাইনস ডের নাম বদলে ‘বোন দিবস’ করেছে পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়।
বিস্তারিত