মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

নির্মল ও পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হোন

রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলা হলো, সবচেয়ে উত্তম মানুষ কে? তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক নিষ্কলুষ হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি ও প্রত্যেক সত্যভাষী ব্যক্তি।’ তারা বলল, সত্যভাষী তো বুঝলাম, নিষ্কলুষ হৃদয় মানে কী? তিনি বললেন, ‘সে পবিত্র পরহেজগার ব্যক্তি, তার মধ্যে কোনো সীমালঙ্ঘন নেই, পাপ নেই, হিংসা কিংবা বিদ্বেষও নেই।’ (ইবনে মাজাহ)

 

নানারূপে ও বিভিন্ন আকারে পার্থিব জীবনের মোহ, আসক্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছেÑ এমন সময়ে মুসলিম সমাজকে ওই বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যা তাকে অন্যদের ভালোবাসতে প্রেরণা দেবে। তাদের কল্যাণকর ও ভালো কাজে উৎসাহিত করবে। অন্যায় করা ও কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে তাদের উদ্বুদ্ধ করবে। এমন এক চরিত্র ও শিক্ষা হলো অন্তরের শুদ্ধতা ও বক্ষের নির্মলতা, যার দ্বারা মুসলিম ব্যক্তি সুখে-শান্তিতে, আনন্দে ও প্রফুল্লচিত্তে জীবনযাপন করতে পারে। 
অন্তরের নির্মলতা একটি মহৎ গুণ ও শ্রেষ্ঠতম বৈশিষ্ট্য। এর মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তি বিশাল প্রতিদান ও বিরাট পুরস্কার অর্জন করে। আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন সম্পদও কাজে আসবে না, সন্তানাদিও কাজে আসবে না, তবে কাজে আসবেÑ যে আল্লাহর কাছে নির্মল হৃদয় নিয়ে হাজির হবে।’ (সূরা শুআরা : ৮৮-৮৯)।
ঈমান, তৌহিদ, তাকওয়া ও ইয়াকিন বা নিশ্চিত বিশ্বাসের পরে নির্মল পরিশুদ্ধ হৃদয়ের আলামত হলো হৃদয়টা হিংসা, বিদ্বেষ ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা থেকে পবিত্র থাকবে। মুসলিম তার মুসলিম ভাইদের সঙ্গে হৃদয়ের স্বচ্ছতা, মনের পবিত্রতা ও ভেতরের সৌন্দর্য নিয়ে বসবাস করবে। তাদের জন্য কোনো দ্বেষ বা ঘৃণা পোষণ করবে না। মনের মধ্যে তাদের প্রতি কোনো প্রতারণার মনোভাব, ধোঁকাবাজি, প্রতিহিংসা ও চক্রান্ত লুকিয়ে রাখবে না। বরং এমন অন্তর নিয়ে জীবনযাপন করবেÑ যা কল্যাণ, সদাচরণ, সুন্দর চরিত্র, নির্মলতা ও স্বচ্ছতায় ভরপুর। সে নিজেও মনের দিক থেকে শান্তিতে থাকবে, মানুষও তার থেকে নিরাপদে থাকবে। তার পক্ষ থেকে মানুষের কোনো অনিষ্ট ও বিপদ আসবে না। তার দ্বারা মানুষ কষ্ট, যাতনা ও ভোগান্তি পোহাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মোমিন হবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে যা নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
এ পৃথিবীতে একটি অগ্রিম নেয়ামত ও সুখ আছে, বরং সেটিকে দুনিয়ার জান্নাত বলা যেতে পারেÑ যার মাধ্যমে জীবনের স্বাদ লাভ করা যায়। সেটি হলো মুসলিম ব্যক্তি হৃদয়ের নির্মলতা ও পবিত্রতার নেয়ামত অর্জনে সচেষ্ট হবে। সে যাদের সঙ্গে বসবাস করবে বা মেলামেশা করবে, এমনকি প্রত্যেক মুসলমানের প্রতিই তার এ নির্মলতা থাকবে। জান্নাতবাসীর বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের অন্তরগুলো থেকে দ্বেষ নির্মূল করে দিয়েছি।’ (সূরা আরাফ : ৪৩)।
ইবনে আতিয়্যা (রহ.) এ আয়াত প্রসঙ্গে বলেন, ‘এর কারণ হলো বিদ্বেষ পোষণকারী শাস্তি পায়, আর জান্নাতে কোনো শাস্তি নেই।’ ঈমানদার লোকদের অন্যতম প্রধান একটি দোয়ায় আল্লাহ বর্ণনা করেন, ‘আর যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদের ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের ওই ভাইদের ক্ষমা করুন যারা ঈমান নিয়ে আমাদের আগে চলে গেছে, আমাদের হৃদয়ে ঈমানদারদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ সৃষ্টি করবেন না, হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি করণাময় দয়ালু।’ (সূরা হাশর : ১০)।
অন্যতম উত্তম একটি আমল হলো যাবতীয় প্রতিহিংসা, সব ধরনের ঘৃণা, হিংসা ও শত্রুতা থেকে হৃদয়ের পবিত্রতা ও নির্মলতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলা হলো, সবচেয়ে উত্তম মানুষ কে? তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক নিষ্কলুষ হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি ও প্রত্যেক সত্যভাষী ব্যক্তি।’ তারা বলল, সত্যভাষী তো বুঝলাম, নিষ্কলুষ হৃদয় মানে কী? তিনি বললেন, ‘সে পবিত্র পরহেজগার ব্যক্তি, তার মধ্যে কোনো সীমালঙ্ঘন নেই, পাপ নেই, হিংসা কিংবা বিদ্বেষও নেই।’ (ইবনে মাজাহ)।
মুসলিম উম্মাহর মহান পূর্বসূরিরা এ পরম সত্য অনুধাবন করেছিলেন। এটা পালন করেছিলেন। এর প্রতি দাওয়াত দিয়েছিলেন। একদা জায়েদ ইবনে আসলাম (রা.) আবু দুজানা (রা.) এর কাছে গমন করেন, তিনি অসুস্থ ছিলেন, তবুও তার চেহারা হাস্যোজ্জ্বল ছিল। আবু দুজানা তাকে বললেন, তোমার কী হলো, মুখে এত হাসি কেন? তিনি উত্তরে বলেন, ‘শুধু দুটি কাজ আমার কাছে অনেক শক্তিশালী। একটি হলো আমি অনর্থক কথা বলি না, আরেকটি হলো আমার হৃদয় মুসলমানদের জন্য নির্মল।’
ফজল ইবনে ইয়াদ (রহ.) বলেন, ‘আমাদের যারা যা কিছু পেয়েছে তারা অধিক নফল নামাজ ও নফল রোজার দ্বারা তা পায়নি, বরং আমাদের সবাই তা পেয়েছে শুধু মনের উদারতা, অন্তরের নির্মলতা ও উম্মতের কল্যাণকামিতার দ্বারা।’
অন্তরের পবিত্রতা ও নির্মলতা অর্জনের সহায়ক উপায় হলোÑ আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ ও আন্তরিক হওয়া, তার প্রতি সত্যনিষ্ঠ হওয়া, বান্দার জন্য পৃথিবীতে আল্লাহর নির্ধারিত ফয়সালা ও তকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, সবসময় আল্লাহর আনুগত্য করা, বেশি বেশি আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করা, হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতারণা এরকম নিকৃষ্ট ও মন্দ ব্যাধিগুলো থেকে নিজের মনকে রক্ষা করার লড়াইয়ে মানুষের অক্লান্ত সাধনা করা। সেই সঙ্গে সব সময় এ কথা মনে রাখা, এসব নিকৃষ্ট স্বভাব ও চরিত্র মানুষের জীবনে ইহকাল ও পরকালে ভয়ানক অমঙ্গল এবং অনিষ্ট বয়ে আনে। তারপর বান্দা খাঁটি আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে চেষ্টা করবে যেন আল্লাহ তাকে নির্মল পবিত্র হৃদয় ও সত্যনিষ্ঠ জিহ্বা দান করেন। পাশাপাশি সে এমন সৎকর্ম করবেÑ যা ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বয়ে আনে, ঘৃণা ও বিদ্বেষ দূর করে। যেমন, সালাম বিনিময় করা, অন্য মানুষের বিষয়ে অনর্থক নাক না গলানো, হাদিয়া ও উপহার প্রদানে যতœশীল হওয়া। এগুলো ভালোবাসা সৃষ্টি করে, আর ঘৃণা দূর করে।
তদ্রƒপ মুসলমান অন্য সব মুসলিমের জন্য দোয়া করবে, মন্দ আচরণ করলে ক্ষমা করবে, কথা ও কাজের দ্বারা বিভিন্নভাবে ও নানারূপে অন্যের প্রতি অনুগ্রহ ও সদাচরণ করবে, যার ফলে তাদের অন্তরে আনন্দ ও খুশির উদ্রেক হবে। মুসলিমের স্বভাবই হলো অন্যকে খুশি করে নিজে আনন্দিত হওয়া, তাদের সুখে ও দুঃখে সমবেদনা জানিয়ে তাদের সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা। 
শয়তানের সঙ্গে দুর্বার লড়াইয়ে সচেষ্ট থাকুন। কারণ শয়তান অন্তরকে বিদ্বেষী করে তুলতে ও হৃদয়কে বিচ্যুত করতে সদা তৎপর থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন সেকথাই বলে যা সর্বোত্তম, নিশ্চয় শয়তান তাদের মাঝে প্ররোচনা সৃষ্টি করে, নিশ্চয় শয়তান মানুষের চরম শত্রু।’ (সূরা ইসরা : ৫৩)। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আরব উপদ্বীপে নামাজি লোকেরা শয়তানের উপাসনা করবে এ বিষয়ে সে নিরাশ হয়ে গেছে, তবে তাদের মাঝে কলহ সৃষ্টি করতে সে নিরাশ হয়নি।’ (মুসলিম)।
যেসব বিষয়, ইস্যু, ঘটনাবলি নিয়ে তর্কবিতর্ক ও বিবাদ করলে কোনো উপকার নেই, সেগুলো থেকে দূরে থাকলে মুসলিম নিরাপদ থাকতে পারবে। কারণ এগুলো হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়। শত্রুতা সৃষ্টি করে, মুসলমানদের মাঝে দূরত্ব তৈরি করে। তর্কবিতর্ক তখনই প্রশংসিত হবে যখন তা কোনো সত্য বাস্তবায়নের জন্য এমন জ্ঞানী লোকের পক্ষ থেকে হবেÑ যে সত্যনিষ্ঠ এবং তর্কবিতর্কের যাবতীয় শর্ত ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, পাশাপাশি চূড়ান্ত ভদ্রতা, শিষ্টাচার ও উচ্চ চরিত্রের অধিকারী হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা মানুষের জন্য সুন্দরটা বল।’ (সূরা বাকারা : ৮৩)।
অন্তরের নির্মলতা স্থায়ী সুখের বড় একটা দ্বার। একজন পূর্বসূরি বলেছেন, ‘দ্বীনের মূল হলো তাকওয়া, আর সেরা ইবাদত হলো রাতে ইবাদতের সাধনা করা, আর জান্নাতের সংক্ষিপ্ততম রাস্তা হলো অন্তরের নির্মলতা।’ আপনারা অন্তরের পবিত্রতা ও হৃদয়ের নির্মলতাকে আঁকড়ে ধরুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যকে ঘৃণা করো না, একে অন্যকে পিঠ প্রদর্শন করো না। তোমরা ভাই ভাই হয়ে যাও। কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি কথা না বলে থাকা বৈধ নয়।’ (মুসলিম)।

২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত 
ভাষান্তর মাহমুদুল হাসান জুনাইদ 

 


ইসলামে অকারণে গাছ কাটা নিষিদ্ধ
রাসুলে করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যখন কোনো মুসলিম গাছ লাগায়
বিস্তারিত
দুনিয়া আসক্তির ভয়ানক পরিণতি
কিছু সময়ের জন্য আমরা এ দুনিয়ায় এসেছি। এ কথাটি সাধারণত
বিস্তারিত
ইমাম বোখারি (রহ.) ও এক হাজার
ইমাম বোখারি (রহ.) একবার সমুদ্রপথে সফরে বেরিয়ে পড়লেন। সফরের পাথেয়
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী  পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেনÑ সৃষ্টি
বিস্তারিত
মসজিদে আকসার পুরাকীর্তি জাদুঘর
ইসলামি পুরাকীর্তি জাদুঘরটিকে পবিত্র মসজিদে আকসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন,
বিস্তারিত
ভ্যালেন্টাইনসের বদলে বোন দিবস!
  ভ্যালেন্টাইনস ডের নাম বদলে ‘বোন দিবস’ করেছে পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়।
বিস্তারিত