মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

রীতি-রেওয়াজ এবং এর প্রভাব

রীতি তৈরি হয় পরিবেশ ও সমাজব্যবস্থা থেকেÑ ভালো-মন্দ, প্রাচুর্য-দারিদ্র্য, জ্ঞান-অজ্ঞান, অস্থির-অনড় সবকিছু। উৎকৃষ্ট জীবনে তৈরি হয় উন্নত রীতি আর নিকৃষ্ট জীবন থেকে উদ্ভব হয় ঘৃণ্য ও জঘন্য রেওয়াজ। প্রত্যেক সমাজের রীতি-রেওয়াজ ওই সমাজের অস্থিরতা-সুস্থিরতা ও উদারতা-সংকীর্ণতার প্রতিচ্ছবি

 

ইসলাম এসেছে বান্দার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ স্বার্থ-কল্যাণ বাস্তবায়নে। আকিদা ও ইবাদত, লেনদেন ও রীতি-নীতি, মূল্যবোধ ও আখলাক এবং সামাজিক যোগাযোগ ও মানবিক সম্পর্কÑ সব ক্ষেত্র ঠিক করতে। যাতে করে ইহ-পরকালে মানুষের জীবন সুশৃঙ্খল হয়।
মানুষের যাবতীয় কর্মÑ হয় তা ইবাদত, যার ওপর তার দ্বীন নির্ভর করে, নয়তো তা আদত বা রীতি-অভ্যাস, যা দিয়ে তার দুনিয়া ঠিক হয়। আর আচার-রীতি বান্দার নিয়তের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর ভালোটা ভালো এবং মন্দটা মন্দ। হাদিসে ওমর বিন খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রতিটি কর্মের ফল নির্ভরশীল তার নিয়তের ওপর। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে যার সে নিয়ত করে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে তারাই সুমতিসম্পন্ন, যারা সেরা উপায় অবলম্বন করে এবং উৎকৃষ্ট উপমা অর্জনে চেষ্টা করে। মনোজগতে অভ্যাস ও রেওয়াজের প্রভাব এবং মানবজীবনে এর কর্তৃত্ব অনস্বীকার্য। এসব থেকে তাদের সরানো কঠিন। এসব থেকে মুক্ত হওয়া মুশকিল। মানবপ্রকৃতি অভ্যাসপ্রিয় ও পরিচিত সঙ্গকামী। মানুষের রীতি ও সংস্কার তাদের জীবনের অংশ। তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতীক। এ জন্যই পবিত্র শরিয়ত এসব রীতি-রেওয়াজকে স্বীকার করেছে এবং স্বীকৃতি দিয়েছে। এটা শুধু প্রতিষ্ঠিত সুরীতি ও সুরেওয়াজের ক্ষেত্রে। নয়তো কুরীতি ও কুরেওয়াজকে শরিয়ত বারণ করে এবং তাতে অস্বীকৃতি জানায়।
ইমাম শাতেবি (রহ.) বলেন, ‘শরিয়ত যদি অভ্যাস-প্রচলনকে স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে মানুষকে সাধ্যাতীত বিষয়ে বাধ্য করা হবে।’ জ্ঞানীরা বলেন, ‘মানুষই রীতি-রেওয়াজ নির্মাতা।’ বলা হয়, ‘মানুষ হলো জমিনে বিচরণশীল কিছু রীতির সমষ্টি।’ আরও বলা হয়, ‘মানুষ স্বভাবের দাস নয়, অভ্যাসের দাস।’ 
রীতি তৈরি হয় পরিবেশ ও সমাজব্যবস্থা থেকেÑ ভালো-মন্দ, প্রাচুর্য-দারিদ্র্য, জ্ঞান-অজ্ঞান, অস্থির-অনড় সবকিছু। উৎকৃষ্ট জীবনে তৈরি হয় উন্নত রীতি আর নিকৃষ্ট জীবন থেকে উদ্ভব হয় ঘৃণ্য ও জঘন্য রেওয়াজ।  প্রত্যেক সমাজের রীতি-রেওয়াজ ওই সমাজের অস্থিরতা-সুস্থিরতা ও উদারতা-সংকীর্ণতার প্রতিচ্ছবি। পুণ্যবানরা জন্ম দেয় পুণ্যময় রীতি-অভ্যাস। মূর্খরা জন্ম দেয় অর্বাচীন রীতি-নীতি। যখন সমাজের নিষ্ঠা ও চেতনা সুন্দর হয়, তার শিক্ষা সুস্থির হয়, সংস্কৃতি উন্নত হয় এবং সচেতনতা ব্যাপক হয়, তার রীতি-রেওয়াজও হয় সমৃদ্ধ। কমে আসে সেখানে মন্দ আচার-রীতি।
ইসলামি শরিয়ত তার বিধিবিধানে মানুষের অবস্থা, তাদের প্রতিষ্ঠিত রীতি ও প্রচলিত রেওয়াজকে বিবেচনা করেছে। যাতে করে তাদের চাওয়া ও স্বার্থ রক্ষা হয়। এটি বরং নবী (সা.) মানুষকে যার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন তার অন্তর্ভুক্ত। তারা যাতে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে চলতে পারে, যদি না তা শরিয়ত বিরুদ্ধ বা জুলুম সমর্থনকারী না হয়। এটি রাসুল (সা.) এর এ বাণীর ব্যাপকতায় দাখিল হবেÑ ‘তোমাদের দুনিয়াবি বিষয় তোমরাই ভালো জান।’ (আহমদ, মুসলিম ও ইবনে মাজাহ)। 
এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, মানুষের মাঝে যা প্রচলিত, তারা যাতে অভ্যস্ত এবং যা তারা অবলম্বন করে, সে বিষয়ে যদি শরিয়তের লব্ধ কোনো বিধি না থাকে, তাহলে তাকে মতলব ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে শরিয়তের কল্যাণী মাপকাঠিতে মাপা হবে। অতএব, অভ্যাস বা প্রচলন যদি মানুষের অগ্রাধিকারযোগ্য কল্যাণ বাস্তবায়ন করে কিংবা তাদের থেকে প্রকাশ্য অনিষ্ট প্রতিহত করে আর তা সমাজে বিঘœও না ঘটায় তবে সেটি গ্রহণযোগ্য রেওয়াজ এবং কার্যকর অভ্যাস। ইসলাম সৎ ও কল্যাণী রীতিকে স্বীকৃতি দেয় যতক্ষণ তা পবিত্র শরিয়তের বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। তেমনি ইসলাম কিছু অভ্যাসের সংস্কার ও পরিমার্জন করে। 
আল্লাহ তায়ালা (নাবালগ এতিমের) অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়কদের উদ্দেশে বলেন, ‘যারা সচ্ছল তারা অবশ্যই এতিমের মাল খরচ করা থেকে বিরত থাকবে। আর যে অভাবগ্রস্ত সে সঙ্গত পরিমাণ খেতে পারে।’ (সূরা নিসা : ৬)। আল্লাহ তায়ালা তেমনি প্রসূতি মায়ের খাদ্য-বস্ত্রের অধিকার সম্পর্কে বলেন, ‘আর সন্তানের অধিকারী তথা পিতার ওপর সেসব নারীর খোরপোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী। কাউকে তার সামর্থ্যরে অতিরিক্ত চাপের সম্মুখীন করা হয় না। আর মাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না এবং যার সন্তান তাকেও তার সন্তানের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন করা যাবে না। আর ওয়ারিশদের ওপরও দায়িত্ব এই।’ (সূরা বাকারা : ২৩৩)। নবী (সা.) হিন্দা বিনতে উতবাকে তার স্বামীর (আবু সুফিয়ানের) সম্পদ থেকে (বিনা অনুমতিতে) গ্রহণ সম্পর্কে বলেন, ‘তুমি নিজের ও তোমার সন্তানের জন্য প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ করতে পার।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
অভ্যাস ও রেওয়াজ মৌলিকভাবে বৈধ ও অনুমোদিত। উপরন্তু কখনও অভ্যাস বা আদত কিছু ক্ষেত্রে ইবাদত কিংবা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য আদর্শে পরিণত হয়। চাই সেটি ভালো হোক বা মন্দ। মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, জারির বিন আবদুল্লাহ বাজালি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামে একটি উত্তম রীতির প্রচলন করল, সে সেটার পুরস্কার লাভ করবে এবং যারা কেয়ামত পর্যন্ত সে রীতির অনুসরণ করবে, তাদের আমলের পুরস্কারও লাভ করবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি একটি মন্দ-নিকৃষ্ট নীতি প্রচলন করল, সেটার দায়ভার তার ওপর বর্তাবে এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা সেটার অনুসরণ করবে, তাদের আমলের দায়ভারও তার ওপর বর্তাবে। অথচ তাদের প্রতিদান থেকে এতটুকু কমানো হবে না।’ 
ভালো অভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করে কোরআনুল কারিম বলেছে, ‘আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোল, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাক।’ (সূরা আরাফ : ১৯৯)।

২৮ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত 
ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব


বিশ্বাস ও কর্মে কোরআনের মহিমা
দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতের মুক্তির পথ রচনা করতে কোরআনে হাফেজ
বিস্তারিত
অসিয়ত কার্যকরের পদ্ধতি
প্রশ্ন : কোনো এক ব্যক্তি ওসিয়ত করলÑ সে মৃত্যুবরণ
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছেÑ ‘...আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর
বিস্তারিত
ইখলাস ছাড়া আমল ফুটো থলিতে
নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সব আমলের মধ্যে শুধু
বিস্তারিত
ইসলামে শালীনতার গুরুত্ব
শালীনতা অর্থ মার্জিত, সুুন্দর ও শোভন হওয়া, ভদ্রতা, নম্রতা, লজ্জাশীলতা
বিস্তারিত
ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য
ইসলামি অর্থনীতির এমন কিছু বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে; যেগুলো অপরাপর
বিস্তারিত