শ্রেষ্ঠ সদকা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শ্রেষ্ঠ সদকা তো সেটাই, যা সচ্ছলতা রেখে করা হয়।
সদকা করার জন্য এ এক মূলনীতি। সদকা এ পরিমাণ করুন, যেন নিজের সচ্ছলতাও অবশিষ্ট থাকে। নিজেকে যেন আবার অভাবে পড়ে যেতে না হয়। পুরো সম্পদ যে সদকা করে দেয় সে মাজজুব। এতে সওয়াব তো অবশ্যই হবে; কিন্তু এ পদ্ধতি শুদ্ধ নয়। 
মানুষ বলে থাকে, দেখ, হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) রাজক্ষমতা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ধন-সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনটি জিনিস নিয়ে সোজা জঙ্গলে চলে গিয়েছিলেন। একটি বালিশ, একটি বালতি ও রশি আর পানি পানের একটি পেয়ালা। রাস্তায় দেখলেন, এক লোক মাথার নিচে হাত রেখে ঘুমিয়ে আছে। তিনি তখন বললেন, মানুষ যখন হাতকেই বালিশ বানাতে পারে তাহলে এ বালিশের আর কী প্রয়োজন? এ বলে বালিশ তিনি ছুড়ে ফেলে দিলেন। আরেকটু সামনে এগিয়ে দেখলেন, এক লোক হাতের অঞ্জলি ভরে পানি খাচ্ছে। এটা দেখে তিনি ভাবলেন, হাতেই যখন পানি খাওয়া যায় তাহলে এ পেয়ালা আর কেন? এ তো অনর্থক। আরেকটু সামনে গিয়ে যখন তৃষ্ণা পেল তখন তিনি একটি কূপের কাছে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন বেশ কয়েকটি হরিণ। সেগুলো তৃষ্ণার্ত। কিন্তু কূপের পানি খুবই গভীরে। এ অবস্থা দেখে হরিণগুলো আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল। আর তখন আল্লাহ পাকের রহমতে পানি উথলে উঠল। কূপের গভীর থেকে পানি ওপরে উঠে এলো। হরিণগুলো পানি খেয়ে চলে গেল। 
হজরত ইবরাহিম আদহাম এ দৃশ্য দেখে কূপের কাছে গেলেন এবং পানি পান করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি কূপের কিনারে যাওয়া মাত্রই পানি আগের মতো গভীরে চলে গেল। আল্লাহ তায়ালাকে তিনি তখন ডেকে বললেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আপনার কাছে কি ইবরাহিমের এতটুকু মূল্য নেই, যা এই হরিণগুলোর রয়েছে?’ জবাব এলো, ‘ইবরাহিম! এ ঘটনা থেকে মূল্য আন্দাজ করতে যেও না। আল্লাহ তায়ালা একেকজনের সঙ্গে একেক রকম আচরণ করে থাকেন। এ হরিণগুলোর কাছে বালতি-রশি কিছুই নেই। এগুলোর কোনো শক্তিও ছিল না। এগুলো আমার দিকে তাকিয়েছে। আমিও এগুলোকে এভাবেই পানি খাইয়েছি। কিন্তু তোমার নিকট তো বালতি-রশি সবই আছে। শক্তিও আছে। তুমি এসব ব্যবহার করে পানি বের করে নাও।’ তিনি তখন বালতি আর রশিও ছুড়ে ফেলে দিলেন।
এটি একটি ঘটনা মাত্র। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মধ্য থেকে একজনমাত্র এমনটি করেছেন। সঙ্গত কারণেই এটি শরিয়তের কোনো বিধান হতে পারে না। হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) যা করেছেন তা যদি শরিয়তের হুকুম হতো, তাহলে দুনিয়াবাসী বেঁচে থাকত কীভাবে? তারা তো সবাই ধ্বংস হয়ে যেত। হজরত আম্বিয়া (আ.) পৃথিবী আবাদ করেছেন, এরপর পৃথিবীবাসীকে দাওয়াত দিয়েছেন। অলি-আউলিয়াদের এসব ঘটনা সত্য, তবে তা নবীজির শিক্ষা নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এজন্য আগমন করেননি। প্রিয় নবীজির শিক্ষা তো সেটাই, যা হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছেÑ সে সদকা পছন্দনীয় নয় যার কারণে তোমার নিজেকেই আবার হাত পাততে হবে। এক্ষেত্রে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা স্বাভাবিক নীতি হচ্ছে, দান-সদকা করার পরও দানকারীর ব্যবসা-বাণিজ্যে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু কথা হলো, অলি-আউলিয়াদের ঘটনার প্রতি মানুষ যতটুকু আকৃষ্ট হয়, প্রিয় নবীজি (সা.) এর হাদিসের প্রতি ততটুকু আকৃষ্ট হয় না। আম্বিয়ায়ে কেরাম এমন সব কথাই বলতেন, যা পুরো দুনিয়ার মানুষ পালন করতে পারে। এটা একটা মূলনীতি। 
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ওপরের হাত নিচের হাত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। ওপরের হাত বলতে দাতার হাত উদ্দেশ্য, আর নিচের হাত বলতে গ্রহীতার হাত। এটাই স্বাভাবিক। দাতার হাত ওপরে থাকে আর গ্রহীতার হাত থাকে নিচে। কী চমৎকার নির্দেশনা। তোমরা দাতা হও, গ্রহীতা হয়ো না। কেউ যদি বাধ্য হয়ে কোনো দান গ্রহণ করে তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে যাও যেন দাতা হতে পার। মানুষের কাছ থেকে হাত পেতে নিয়ে খাওয়ার অভ্যাস কর না। প্রত্যেকের মনেই এ উদ্দীপনা থাকা উচিত। আমি অন্যকে দেব, অন্যের কাছ থেকে নেব না। 
অভিজ্ঞতা সাক্ষী, যার নেওয়ার অভ্যাস হয় সে-ই ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নেয়। যত সম্পদই তার থাকুক না কেন, সে অন্যের জন্য তা থেকে কিছুই খরচ করতে প্রস্তুত থাকে না। আবেগ ও চেতনা যদি থাকে, তাহলে প্রত্যেককেই কিছু না কিছু দান করার শক্তি থাকা উচিত। যদি কেউ ১০ টাকার মালিক হয় তাহলে সে প্রয়োজনে এক পয়সা দান করবে, তবুও করবে। যে শুধুই অন্যের দান গ্রহণ করে তার সম্পর্কে তো এক কথা প্রসিদ্ধ। সে বলতে থাকে, তোমরা আমার কাছে এলে কী নিয়ে আসবে? আর আমি যদি তোমাদের কাছে যাই তাহলে আমাকে তোমরা কী দেবে? 
এ হাদিসের কারণে আজকাল কোনো কোনো পীর আবার নতুন এক পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। পীরের সামনে এক হাতের ওপর আরেক হাত রেখে তাতে টাকার ব্যাগটা রাখ, এরপর পীরের সামনে তা পেশ কর। পীর তা গ্রহণ করবেন এবং তার হাত থাকবে ওপরে। আর যে দিল তার হাত নিচে। নজরানা নেওয়ার সময়ও হাত ওপরে রাখে। উদ্দেশ্য একটাই, যেন পীরের হাতই শ্রেষ্ঠ হাত হয়। এসবই ভুল ব্যাখ্যা। বাহ্যিক ওপর-নিচ এখানে মূল বিষয় নয়। হাদিসের শিক্ষা হলো, দাতার হাতই শ্রেষ্ঠ হাত, তা নিচে থাকলেও শ্রেষ্ঠ, ওপরে থাকলেও শ্রেষ্ঠ।

অনুবাদ : মাওলানা শিব্বীর আহমদ


বিশ্বাস ও কর্মে কোরআনের মহিমা
দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতের মুক্তির পথ রচনা করতে কোরআনে হাফেজ
বিস্তারিত
অসিয়ত কার্যকরের পদ্ধতি
প্রশ্ন : কোনো এক ব্যক্তি ওসিয়ত করলÑ সে মৃত্যুবরণ
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছেÑ ‘...আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর
বিস্তারিত
ইখলাস ছাড়া আমল ফুটো থলিতে
নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সব আমলের মধ্যে শুধু
বিস্তারিত
ইসলামে শালীনতার গুরুত্ব
শালীনতা অর্থ মার্জিত, সুুন্দর ও শোভন হওয়া, ভদ্রতা, নম্রতা, লজ্জাশীলতা
বিস্তারিত
ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য
ইসলামি অর্থনীতির এমন কিছু বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে; যেগুলো অপরাপর
বিস্তারিত