মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

শীতকালের বিধান ও তাৎপর্য

ঋতু ও মৌসুমের পালাবদলে এবং রাত ও দিনের নিরন্তর বিবর্তনে রয়েছে শিক্ষা ও উপদেশ। জ্ঞানীদের অবশ্য কর্তব্য, শিক্ষা গ্রহণ ও আত্মপর্যালোচনার উদ্দেশ্যে খানিক দাঁড়ানো। অনাগত দিনগুলো নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা। কত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কত সময় খরচ করা হয়েছে। অথচ সেসবের চলে যাওয়া নিয়ে অনুভূতি অল্প। চলে যাওয়া থেকে শিক্ষা ও উপদেশ নেওয়ায় কত দুর্বল। ‘যারা অনুসন্ধানপ্রিয় অথবা যারা কৃতজ্ঞতাপ্রিয় তাদের জন্য তিনি রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন পরিবর্তনশীলরূপে।’ (সূরা ফোরকান : ৬২)।

অতএব, আপনারা হিসাব করে দেখুন, কাল হলো কিছু নিঃশ্বাসের সমষ্টি যা ফিরে আসবে না। যে এ সম্পর্কে উদাসীন, তার সময়গুলো ব্যর্থ, তার ক্ষতি প্রভূত, তার আফসোস তীব্র। সে যখন জানবে কীই না বরবাদ করেছে, দুনিয়াতে ফিরে যাওয়ার আবেদন করবে, তখন তার আর ফিরে যাওয়ার মাঝে আড়াল টেনে দেওয়া হবে। কবি বলেন, 

মানুষ তো কেবল তার হায়াতের পিঠে আরোহী

এমন সফরে যা দিনে-মাসে ফুরিয়ে যায়। 

প্রতিটি দিন ও রাত সে কাটায় আর

দুনিয়া থেকে দূরে সরে এবং কাছে যায় কবরের। 

এমন মুহূর্তে যখন আসমান তার ঘোমটা পরেছে। বাতাস বইছে হিম বাহে। শীত শুরু করেছে তার চোখ দিয়ে আমাদের ভয় দেখাতে এবং তার আঙুল দিয়ে আমাদের চিমটি দিতে। কারও কারও ওপর শীত ঢেলে দিয়েছে তার তীব্রতা, যা উদ্বুদ্ধ করছে শিক্ষা নিতে, কারণ হচ্ছে উপদেশ গ্রহণের এবং স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে শীতলতা জাহান্নামের। বোখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আগুন তার প্রতিপালকের কাছে অভিযোগ করে বলেছিল, হে প্রতিপালক, আমার এক অংশ আরেক অংশকে খেয়ে ফেলেছে। তখন তিনি আগুনকে দুটি নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি দিলেন। একটি শীতকালে, আরেকটি গ্রীষ্মকালে। আর এর ফলেই তোমরা এমন তীব্রতর গরম দেখতে পাও এবং এমন প্রচ- শীত প্রত্যক্ষ করো।’

ইমাম হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘প্রতিটি ঠান্ডা যা কিছু ধ্বংস করে, সেটা জাহান্নামের নিঃশ্বাসের অংশ। তেমনি প্রতিটি গরম যা কিছু ধ্বংস করে তা জাহান্নামের নিঃশ্বাসের অংশ।’ ইমাম ইবনে রজব (রহ.) বলেন, ‘দুনিয়ায় যা কিছু আছে সবই আখেরাতের স্মারক ও তার প্রমাণ। সুতরাং গ্রীষ্মকালের তীব্র গরম স্মরণ করিয়ে দেয় জাহান্নামের গরম এবং তা জাহান্নামের গরমের অংশ। তেমনি শীতকালের তীব্র শীতও স্মরণ করিয়ে দেয় জাহান্নামের শীতলতা আর তা জাহান্নামের অংশ।’ 

অতএব শীত ঋতুর অন্যতম প্রধান বিধান হলো, তা জাহান্নামের শীতলতা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর্তব্য বানায়। আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের এবং আমাদের বাবা-মাকে নিজ দয়া ও অনুগ্রহে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় দিন। ইমাম আহমদ তার মুসনাদে এবং বাইহাকি তার শুয়াবুল ঈমান গ্রন্থে মারফু ও মাওকুফ সূত্রে বর্ণনা করেন, আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘শীতকাল মোমিনের বসন্ত। এর দিন ছোট হওয়ায় রোজা রাখতে পারে এবং রাত দীর্ঘ হওয়ায় (তাহাজ্জুদ) নামাজ পড়তে পারে।’ 

ইমাম ইবনে রজব (রহ.) বলেন, ‘শীত মোমিনের বসন্ত। কারণ এতে একজন মোমিন আনুগত্যের বাগানে চরে বেড়ায়, ইবাদতের ময়দানে চষে বেড়ায় এবং সহজ আমলের বাগানে আপন আত্মাকে পবিত্র করে নেয়।’ 

জাবের ও আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘শীতল গনিমত হচ্ছে শীতকালে রোজা রাখা।’ শরিয়তবিদরা বলেন, ‘একে শীতল গনিমত আখ্যা দেওয়া হয়েছে, কারণÑ গনিমত লাভ হয় মূলত শত্রুদেশ থেকে। আর এটি কেবল যুদ্ধ ও এর তাপ সয়েই অর্জন করা যায়। আর শীতকালের রোজা হলো এমন গনিমত যা অর্জনে যুদ্ধ বা লড়াইয়ের প্রয়োজন হয় না।’ 

সাহাবায়ে কেরাম শীতকালের আগমনে পুলকিত হতেন। ইবাদতের স্বাদ ও আনুগত্যের আস্বাদে বিভোর হতেন। শীতকাল এলে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, ‘স্বাগত হে শীতকাল! শীতকালে বরকত নাজিল হয়; এর রাত দীর্ঘ হওয়ায় নামাজ আদায় করা যায় এবং দিন ছোট হওয়ায় রোজা রাখা যায়।’ মুআজ বিন জাবাল (রা.) মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে কাঁদতে শুরু করেন। কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি না; বরং (রোজা হেতু) গ্রীষ্মের দুপুরের তৃষ্ণা, শীতের রাতের নফল নামাজ এবং ইলমের আসরগুলোতে হাজির হয়ে আলেমদের সোহবত হারানোর আফসোসে আমি কাঁদছি।’ 

ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.) বলেন, ‘মানুষের উচিত তার কালের মর্যাদা এবং সময়ের মূল্য জানা। অতএব সে যেন এর একটি মুহূর্তও নেকিতে ছাড়া ব্যয় না করে।’ ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘যুগ পুরোটা যদি একটি ঋতু হতো, তাহলে অবশিষ্ট ঋতুগুলোর কল্যাণগুলো হাতছাড়া হতো। যদি পুরোটা হতো গ্রীষ্মকাল, তাহলে শীতকালের কল্যাণগুলো ছুটে যেত। যদি পুরোটা হতো শীতকাল, তাহলে গ্রীষ্মকালের কল্যাণগুলো ছুটে যেত।’

শীতকালে কিছু বিশেষ ফিকহি বিধান রয়েছে কোনো মুসলিমই যা জানার প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে নয়। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত সেসব জানা। যাতে তিনি জেনে-বুঝে নিজ রবের ইবাদত করতে পারেন। এসবের মধ্যে রয়েছেÑ 

- অজুতে মোজার ওপর মাসেহ করার অনুমতি। আবাসে থাকলে একদিন একরাত আর সফরে থাকলে তিন দিন তিন রাত। মুগিরা বিন শুবা (রা.) (অজুর সময়) নবীজির মোজাজোড়া খুলতে গেলে নবী (সা.) বললেন, ‘ও দুটি ছেড়ে দাও। আমি এ দুটি পবিত্র অবস্থায় পরেছি।’ তারপর তিনি মোজাদ্বয়ের ওপর মাসেহ করলেন। (বোখারি ও মুসলিম)। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ৭০ জন সাহাবি জানিয়েছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মোজার ওপর মাসেহ করতেন।’ এটা ইসলামের উদারতা ও সহজপ্রবণতার একটি উপমা।

- শীতকালে ইসলামের সহজপ্রবণতার আরেকটি চিত্র তীব্র বৃষ্টি ও প্রচ- ঝড়ে দুই নামাজ একসঙ্গে পড়ার অবকাশ রাখা। আলেমরা (রহ.) অবশ্য দুই নামাজ একসঙ্গে পড়ার বেশ কিছু শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যার প্রধান কথা, প্রচ- বৃষ্টি, ঢল বা ঝড়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উপনীত হলেই কেবল তার অবকাশ রয়েছে। 

- শীতের আরেকটি বিধানÑ অনেকে শীতে নাক-মুখ ঢেকে নামাজ পড়েন। অথচ নবী (সা.) পুরুষকে তার মুখ ঢেকে নামাজে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। (আবু দাউদ ও ইবনে হিব্বান)। 

- শীতের আরেকটি বিধানÑ এ তীব্র শীতে সিরিয়া, আরাকান ও ফিলিস্তিনসহ আমাদের সব শরণার্থী ও শীতার্ত মানুষের কথা স্মরণ করা। তাদের জন্য দোয়া করা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো। 

 

৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত 

ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব


নারী শিক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে বারবার মানুষকে পড়াশোনা করতে, জ্ঞানার্জনে ব্রতী হয়ে আল্লাহর
বিস্তারিত
কোরআন-হাদিসে একতার গুরুত্ব
কোরআন এবং হােিদস সংঘবদ্ধতার গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম জাতি এক প্রাণ
বিস্তারিত
সালাম সম্প্রীতির বিকাশ ঘটায়
দেখা-সাক্ষাতে আমরা একে অপরকে শুভেচ্ছা-অভিবাদন জানাই। এটি আমাদের সহজাত একটি
বিস্তারিত
নীলসাগর
ভ্রমণ একটি আনন্দময় ইবাদত। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উৎস। ভ্রমণের অন্যতম
বিস্তারিত
লোক-দেখানো দান সদকা নয়
ইসলামি পরিভাষায় দান করাকেই সদকা বলা হয়। সদকা শব্দটি এসেছে
বিস্তারিত
সদকার ব্যাপকতা
পৃথিবীতে চলমান অধিকাংশ পেশাই এমন, যেগুলো আল্লাহপাকের ইবাদতের মাধ্যম হতে
বিস্তারিত