বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলা

ইসলামি শরিয়ত-বিশেষজ্ঞ ও আধুনিক শিক্ষিতদের মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে, তা দূর করে তাদের মধ্যে জ্ঞানগত সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে বিশ্বাসী ও দরদি বিচক্ষণ আলেম ও বুদ্ধিজীবীদের সংঘবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে বিশ্বায়নের কুফলের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে

গত শতাব্দীতে বার্লিন প্রাচীরের ধ্বংস ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বের সবয়েচে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে এই যে, আমরা যে বিশ্বে বসবাস করছি তার গতিপথ কোন দিকে? এ প্রসঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিশ্বায়নের বাস্তবতা আসলে কী? তার উদ্দেশ্য ও গন্তব্য কী? লক্ষ্য অর্জন ও গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য তার তৎপরতাগুলো কী? তার প্রভাব ও প্রতিফলই বা কী হবে?

গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বায়ন নিয়ে পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বইও প্রকাশিত হয়েছে এবং লেখালেখির এ ধারা অব্যাহত আছে। উপর্যুক্ত প্রশ্নগুলো সম্পর্কে নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরা হলো।

বিশ্বায়ন আসলে কী? এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, এটি হলো ঔপনিবেশিকতাবাদ ও প্রাচ্য নীতিবাদের সমন্বিত নাম; বিশ্বায়নের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা ও জায়নিস্ট শক্তিগুলো তাদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে তাদের বিশ্বাস, মতাদর্শ, সামাজিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বায়নের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নিম্নরূপ : 

১. বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক আধিপত্য ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন।

২. বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক আধিপত্য ও বলিষ্ঠতা অর্জন।

৩. বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা সভ্যতা ও সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ইত্যাদি ছড়িয়ে দেওয়া।

৪. বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা ভাষা ও সাহিত্যের প্রচার-প্রসার।

৫. বিশ্বে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কথা বলে পশ্চিমাদের কর্তৃত্ব বিস্তার।

 

বিশ্বায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কার্যকরী তৎপরতাগুলো নিম্নরূপ :

১. অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব ও বলিষ্ঠতা অর্জনের জন্য স্থানীয় সরকারগুলোকে নৈতিক মূল্যবোধশূন্য করে ফেলা এবং বহুজাতিক করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে তাদের দুর্বল করে দেওয়া।

২. আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া বা তাদের বিলুপ্ত করে ফেলা।

৩. স্বার্থ ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিশ্বের যে কোনো স্থানে নিজেদের সেনা মোতায়েন করা।

৪. নির্দিষ্ট মতাদর্শ, গোষ্ঠী বা দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার যে মনোভাব ও অনুভূতি, তা ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য মানবতার সেøাগান দিয়ে সবকিছুতে ঐক্য সৃষ্টি করা।

৫. বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা ছড়িয়ে দিয়ে মুসলমানদের মন থেকে এ অনুভূতি দূর করে দেওয়া যে, তারা একই উম্মাহ, একই মিল্লাত।

 

বিশ্বায়নের কতিপয় দৃশ্যমান ফলাফল

১. গোটা বিশ্বের পুরো সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য বহুজাতিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ৫০০ বহুজাতির কোম্পানির মধ্যে ২২৭টি (অর্থাৎ ৪৫ শতাংশ) আমেরিকান এবং ১৪১টি ইউরোপিয়ান। মধ্যপ্রাচ্যে এমন কোম্পানি আছে মাত্র ছয়টি, যার চারটি সৌদি আরবের। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ১০টি কোম্পানির মধ্যে আটটি আমেরিকান ও দুইটি ইউরোপীয় এবং সবচেয়ে বড় ২০টি কোম্পানির মধ্যে ১৫টি আমেরিকান, চারটি ইউরোপীয় ও একটি জাপানি। যেগুলোর ক্ষেত্রে আমেরিকার আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত, সেগুলো হতে পারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান (জেনারেল ইলেকট্রিক), তেল ও গ্যাস (এক্সন মবিল), সফটওয়্যার (মাইক্রোসফট), ওষুধ (ফাইজার), ব্যাংক (সিটি কর্প), সুপারমার্কেট (ওয়ালমার্ট), বিমা (আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ) এবং আইটি (ইনটেল)। 

এসব কোম্পানির মধ্য দিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপ বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এবিবি নামের সুইস-সুইডিশ মাল্টিন্যাশনাল করপোরেশনের আওতাধীন বড় ৬০টি কোম্পানি রয়েছে এবং আফ্রিকায় তাদের কোম্পানির সংখ্যা ১৩০। খাদ্য ও কোমল পানীয় প্রস্তুতকারক সুইস কোম্পানি নেসলে ৮ হাজার ৫০০ আইটেমের পণ্য তৈরি করে এবং বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। দুবাইয়ে তাদের যে কোম্পানি রয়েছে তার আয়তন ১০০ বর্গকিলোমিটার। মার্কিন কোম্পানি জিলেটের ২০০টিরও বেশি দেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম রয়েছে এবং তারা বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিক্রি করে। মার্কিন কোম্পানি কোকাকোলা ৪০০-এর বেশি পণ্য নিয়ে ২০০টিরও বেশি দেশে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা দৈনিক ১২৩ কোটি ডলারের বোতলজাত পানীয় বিক্রি করে থাকে। জাপানি কোম্পানি টয়োটা মটরস ২০টিরও বেশি দেশে ৫০০’রও বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে এবং তাদের কর্মী সংখ্যা ৩ লাখ ১৬ হাজারের বেশি। টয়োটা ২০০০ সালে ৯০ লাখ গাড়ি তৈরি করেছে এবং ২০০৭ সালের তাদের বিক্রির পরিমাণ ছিল ২০২ বিলিয়ন ডলার। 

২. আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পাঁচটি মিডিয়া ফার্মÑ ওয়াল্ট ডিজনি, টাইম ওয়ার্নার ক্যাবল, ভায়াকম, নিউজ করপোরেশন ও সনি অমুসলিমদের বিশেষ করে ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিশ্বের শতকরা ৯৯ ভাগ রেডিও, টেলিভিশন ও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং প্রতিদিনই তারা পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের মগজ ধোলাই করছে। 

৩. এনজিওর মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী বিশাল বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ও তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করা। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের কথা বলা যায়। বাংলাদেশের এনজিওর মোট সংখ্যা কত? সরকারের একটি হিসাব অনুযায়ী, এ সংখ্যা আড়াই লাখ। এর মধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ৫৬ হাজার, সমবায় অধিদপ্তরের অধীনে দেড় লাখ, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে ১৬ হাজার এবং এনজিও ব্যুরোতে আড়াই হাজার এনজিও দেখানো হয়েছে। (প্রথম আলো, ১৫-০১-২০১০)। বাংলাদেশে বিদেশি এনজিওর সংখ্যা কত? বর্তমানে বাংলাদেশে কাজ করছে, এমন বিদেশি এনজিওর সংখ্যা ২৩৩টি। ২৩৩টি বিদেশি এনজিওতে ৩৪২ বিদেশি এবং ১৫ হাজার ৮১৫ বাংলাদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। এনজিওগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক। এর মধ্যে ৭০টি যুক্তরাষ্ট্রের ও ৩৬টি যুক্তরাজ্যের, জাপানের ১৯টি ও অস্ট্রেলিয়ার ১০টি। দেশীয় এনজিওগুলোর অধিকাংশই বিদেশি দাতাদের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া বিদেশি এনজিওগুলো স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা সংকোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৪. মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণ। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মূলে রয়েছে মার্কিন আধিপত্যাধীন বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা।

৫. বহিঃশক্তি দ্বারা মুসলিম দেশের সেক্যুলার দলগুলোকে মদদ জোগানো এবং তাদের উদ্দেশ্য সাধনে তৎপরতা অব্যাহত রাখা। 

৬. মুসলিম দেশগুলোতে পশ্চিমাদের পছন্দসই বা তাদের প্রিয় নেতাদের ক্ষমতায়ন ও তাদের সুরক্ষাদান। 

৭. দরিদ্রতা, অজ্ঞতা, রোগব্যাধি ইত্যাদির দোহাই দিয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এনজিওগুলোর নেটওয়ার্ক ও প্রভাব বিস্তার করা। 

৮. জাতিসংঘের ছত্রছায়ায় পশ্চিমাদের, বিশেষ করে আমেরিকার প্রতিটি অবৈধ তৎপরতাকে বৈধতাদান। বিশ্বের ১৪০ দেশে আমেরিকান সেনাবাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। তুচ্ছ অজুহাত দেখিয়ে আফগানিস্তানে ও ইরাকে আক্রমণ করেছে। লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছে। আফগানিস্তানে ক্লাস্টার বোমা এবং ইরাকে কারপেট বোমা নিক্ষেপ করেছে। জাতিসংঘ এসব সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বৈধতা দিয়েছে। এটাও বিশ্বায়নের একটি মাত্রা। 

 

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়

১. বিনা বাক্যব্যয়ে বিশ্বায়নের সবকিছুকে মেনে নেওয়া কিছুতেই সংগত নয়। কারণ সামগ্রিকভাবে বিশ্বায়নকে মেনে নিলে দেশীয় ও ধর্মীয় একাত্মতা ও ঐক্য বলে কিছু থাকবে না। 

২. বিশ্বায়ন ও তার উপাদানগুলোকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করাও সম্ভব নয়। কারণ বাস্তবিকতা তার পক্ষে নয়। 

৩. বিশ্বায়নের প্রেক্ষিতে সঠিক কর্মপন্থা এটাই হতে পারে যে, আমরা তার ভালো দিকগুলোকে গ্রহণ করব ও উপকৃত হব এবং নেতিবাচক দিকগুলোকে এড়িয়ে যাব। যদিও তা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। এর জন্য মুসলমানদের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে যে পার্থক্য ও অনৈক্য রয়েছে, তা দূর করতে হবে। বিশেষ করে ইসলামি শরিয়ত-বিশেষজ্ঞ ও আধুনিক শিক্ষিতদের মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে, তা দূর করে তাদের মধ্যে জ্ঞানগত সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে বিশ্বাসী ও দরদি বিচক্ষণ আলেম ও বুদ্ধিজীবীদের সংঘবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে বিশ্বায়নের কুফলের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। তারা বিশ্বায়নের কুপ্রভাব থেকে কীভাবে জাতিকে রক্ষা যায়, সে ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রস্তুত করবেন এবং দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে তুলে ধরবেন। তথ্য ও সংবাদ সংস্থাগুলোকেও এ ব্যাপারে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ রেডিও, টেলিভিশন, ছায়াছবি ইত্যাদি প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে বিশ্বায়নের কুফল প্রায় সবাইকে গ্রাস করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় দেশপ্রেমমূলক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগরূক রাখতে হবে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

তথ্যসূত্র : ১. বিশ্বায়ন : ইতিহাস ও গতিধারা, বদরুল আলম খান, প্রথমা, ২০১৮, পৃ. ১৬৩।

২. সাপ্তাহিক শরিয়া অ্যান্ড বিজনেস এবং অন্যান্য


কর্ডোভা : সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া
স্থাপত্যশিল্পে কর্ডোভা সমকালীন পৃথিবীকেই শুধু ছাড়িয়ে যায়নি, বরং পতনের শত
বিস্তারিত
মদিনা মুনাওয়ারার মর্যাদা
মদিনার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব মুসলিম উম্মাহর কাছে দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট।
বিস্তারিত
ধর্ষণ রোধে চাই ইসলামের অনুশাসন
  ধর্ষণ বর্তমান পৃথিবীর অতি পরিচিত এক ভয়ঙ্কর শব্দের নাম। যে
বিস্তারিত
পারস্পরিক সহযোগিতা
অসংখ্য হাদিসে নববি মুসলিম সমাজের তাকাফুল বা পারস্পরিক সহযোগিতার মাহাত্ম্য
বিস্তারিত
বিপদে পাশে থাকুন
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেনÑ
বিস্তারিত
কোরআন-সুন্নাহর আলোকে লেনদেন
ইসলামি অর্থনীতি হলো কোরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যবস্থা।
বিস্তারিত