তাবলিগ জামাত ও বিশ্ব ইজতেমা

বিশ্ব ইজতেমার মাঠ প্রস্তুতে ব্যস্ত মুসল্লিরা

তাবলিগ শব্দটি আরবি। এর আভিধানিক অর্থ প্রচার করা বা পৌঁছানো। পরিভাষায় ব্যক্তির অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানো বা অপরকে শিক্ষা দেওয়াকে তাবলিগ বলা হয়। তাবলিগ এক নিরলস সংগ্রাম ও সাধনার নাম। তাবলিগের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় ও সম্পর্র্ক হওয়া, যাতে তার কাছ থেকে সব সমস্যার সমাধান লাভ করে ইহকাল ও পরকালে শান্তি এবং সফলতা পাওয়া যায়। 

আর ইজতেমা শব্দের অর্থ সমবেত করা, সমাবেশ বা সম্মেলন। ধর্মীয় কোনো কাজের জন্য বহু মানুষকে একত্রিত করা। কাজের গুরুত্ব বোঝানো। কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ব্যাপকভাবে এর প্রচার-প্রসারের জন্য বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করাকে ইসলামের পরিভাষায় ইজতেমা বলা হয়। 
১৯২০ সালে দিল্লির মেওয়াত থেকে তাবলিগ জামাতের কাজ শুরু করেন মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস (রহ.)। তিনিই বিশ্ব তাবলিগ জামাতের প্রবর্তক। ১৯৪১ সালের ২৮, ২৯ ও ৩০ নভেম্বর গোরগাঁও জেলার ‘নুহ’ নামক স্থানে সর্বপ্রথম বৃহত্তম ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। এর সূত্র ধরে ঢাকার অদূরে টঙ্গীর তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব ইজতেমা।
১৩৪৪ হিজরি সনে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) দ্বিতীয়বার পবিত্র হজ পালন শেষে মদিনায় গমন করলেন। প্রত্যাবর্তনের সময় হওয়ার পরও তিনি কিছুতেই মদিনা ত্যাগ করতে চাচ্ছিলেন না। তার এ অবস্থা দেখে সঙ্গীরাও তাকে ছেড়ে এলেন না। মদিনা থেকে তার মাধ্যমে দ্বীনি খেদমত নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। তিনি এ অবস্থার সমাধানের জন্য একজন আবেদের কাছে গেলেন। তিনি মাওলানা ইলিয়াসকে বললেন, আপনি অস্থির হবেন না, যিনি কাজ নেওয়ার তিনিই এর ব্যবস্থা করবেন। হজ থেকে দেশে ফেরার পর মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ শুরু করেন। এমন সময় ‘নুহ’ নামক স্থানে এক ইসলামি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মানুষের মাঝে ইসলামের বিধিবিধান প্রচার করার দাওয়াত প্রদান করেন। তার এ আহ্বানে একটি জামাত তৈরি হয়ে গেল। এ জামাত আট দিনে পূর্বনির্ধারিত একটি গ্রামে দাওয়াতি কাজ করল। অতঃপর সিদ্ধান্ত হলো পরবর্তী এক সপ্তাহ কাজ করে জামাত গোরগাঁও জেলার সোহিনী নামক স্থানে জুমার নামাজ আদায় করবে। পরবর্তী কর্মসূচি সেখানেই ঘোষণা করা হবে। তাবলিগ জামাতের প্রথম জুমা সোহিনীতে আদায় করা হলো। পরবর্তী সপ্তাহেও যথারীতি কাজ করার পর ‘তাউর’ নামক স্থানে জুমার নামাজ আদায় করা হলো। প্রতিটি জুমায় মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) উপস্থিত হয়ে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করে দিতেন। মেওয়াত এলাকায় এভাবে অনেক দিন পর্যন্ত এ দ্বীনি কাজ অব্যাহত থাকে। এসব জামাতে ওলামাদের ডেকে ওয়াজ নসিহতের ব্যবস্থা করা হতো। কয়েক বছর দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ এভাবে চলতে থাকে।
১৩৫১ হিজরি সনে তৃতীয়বার হজ পালন শেষে স্বীয় দ্বীনি দাওয়াতি কাজ সম্পর্কে সুদৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মাওলানা ইলিয়াস স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। ফলে দ্বীনি কাজের গতি বৃদ্ধি পায়। ইলিয়াস (রহ.) এর পদক্ষেপ ছিল পথভোলা মানুষকে পথের দিকে আহ্বান করা। মানুষকে ইসলামি আদর্শে আদর্শবান করা। 
১৩৫৬ হিজরিতে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) ভারতে দ্বীনি দাওয়াতের কাজ সম্পন্ন করে কয়েকজন সঙ্গীসহ ইসলামের প্রাণকেন্দ্র মক্কায় গমন করেন। তিনি মক্কা, জেদ্দা, মিনা ও মদিনার কুরাসহ বিভিন্ন স্থানে জামাতে বন্দি হয়ে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ করতে থাকেন। এভাবে কিছুদিন দাওয়াতের কাজ করার পর ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন। 
এবার মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) দিল্লির মেওয়াতে দাওয়াতের কাজ বৃদ্ধি করলেন। বৃদ্ধি করলেন সফর ও গাসত। তাবলিগ জামাতের ছোট ছোট দল বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। দ্বীনের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছতে থাকল। এভাবে অল্প সময়ে দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর অন্তরে স্থান করে নেয় তাবলিগ জামাত। তাবলিগ জামাতের কর্মীরা নিজেদের কর্মতৎপরতা পর্যালোচনার জন্য জুমার রাতে নিজামুদ্দীনে উপস্থিত হয়ে নিজেদের কর্মতৎপরতা পর্যালোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করতেন। এ সমাবেশে উপস্থিত থাকতেন মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)। এভাবে প্রায় প্রতি মাসে মেওয়াতের কোনো স্থানে এবং বছরে একবার নুহের মাদ্রাসায় ইজতেমা অনুষ্ঠিত হতো। আজ এ ইজতেমা বিশ্ব ইজতেমা হিসেবে রূপধারণ করেছে। বাংলাদেশের টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরের এ বিশ্ব ইজতেমায় প্রতি বছর প্রায় ১০০ রাষ্ট্রের মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। সেখান থেকে মুবাল্লিগরা দলে দলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্বীনি দাওয়াত নিয়ে ছড়িয়ে পড়েন। 
বিশ্ব ইজতেমার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ-বিদেশের ঈমানদার ত্যাগী আলেম-ওলামাদের কাছ থেকে কোরআন ও হাদিসের আলোকে দ্বীনের বয়ান শুনে ঈমান-আমলের দাওয়াত সারা বিশ্বে পৌঁছে দেওয়া। শুধু ধর্মীয় বয়ান শোনা বা বিশ্ববাসীর শান্তি ও হেদায়েতের জন্য আখেরি মোনাজাতে প্রচুর লোক অংশগ্রহণ করা ইজতেমার উদ্দেশ্য নয়, বরং যাতে বেশি থেকে বেশি জামাত বের হয় এর দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। যেন প্রতিটি জামাত নির্ধারিত এলাকার প্রতি মসজিদে তিন দিন করে থেকে তাওহিদ, রেসালাত, আখেরাত, ঈমান ও আমলের দাওয়াত দেয়। তাবলিগের চিল্লায় বের হয়ে অনেক খারাপ লোকও ভালো হচ্ছে। 
দাওয়াতে তাবলিগ ছয় উছুলের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাপী ইসলামি দাওয়াতি কাজ পরিচালনা করে যাচ্ছে। 
ছয় উছুল হলোÑ ১. কালেমা, ২. নামাজ, ৩. ইলম ও জিকির, ৪. ইকরামুল মুসলিমিন, ৫. ইখলাসে নিয়ত এবং ৬. দাওয়াত ও তাবলিগ। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ধর্মের দাওয়াত নিয়ে গ্রাম-গঞ্জে, শহর-বন্দরে সারা বছর ঘুরে বেড়ান।
হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও পৌঁছে দাও। এ হাদিসের ওপর আমল করে তাবলিগাররা বিশ্বের মধ্যে ইসলামের এক মহান দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ফলে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামি আদর্শে আদর্শবান হচ্ছে। সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে ইসলামি বিধান মতো জীবন গড়ার সুুযোগ হয়েছে।


পরিবেশের হুমকি : উত্তরণের উপায়
আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যাতে ভূমি সজীব ও উর্বর
বিস্তারিত
অহংকারের পরিণাম ধ্বংস
হজরত লোকমান (আ.) তার ছেলেকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তার বর্ণনা দিয়ে
বিস্তারিত
লাইসেন্স করা পিস্তল ব্যবহার
প্রশ্ন : আমার মামা একজন বড় ব্যবসায়ী। তার ব্যবসা দেশের
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : মুসলিম মহীয়সী মূল : মাওলানা ইসহাক মুলতানি অনুবাদ : মাওলানা
বিস্তারিত
‘হালাল সনদ প্রদানের জন্য ইসলামিক
২০০৭ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্যসামগ্রী, ভোগ্যপণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস
বিস্তারিত
চরম নির্যাতিত চীনের উইঘুর মুসলমান
চীনের মুসলমানদের ওপর নতুন করে নিপীড়নের খ—গ নেমে এসেছে। পশ্চিমাঞ্চলীয়
বিস্তারিত