শরিয়তের দৃষ্টিতে দালালি পেশা

‘দালালি’ বা ‘দালালি করা’ শব্দটি আমাদের সমাজে বেশ প্রচলিত ও পরিচিত। তবে শব্দটির মূল ব্যুৎপত্তিগত ও আরবি ভাষার ব্যবহারিক বাস্তবতা প্রাথমিক পর্যায়ে ভালো কিছুর প্রতি ইঙ্গিত করলেও বাংলাভাষী লোকজন ও শব্দটি ব্যবহারকারী সাধারণ জনতা শব্দটিকে ব্যঙ্গ/কটূক্তি অর্থেই বেশি ব্যবহার করে থাকে। 
যেমন প্রাসঙ্গিকভাবে অনেকে বলে থাকে, ‘আপনাকে দালালি করতে বলা হয়নি’ বা ‘বেটা বদের হাড্ডি, দালালি করার আর জায়গা পাচ্ছে না’ ইত্যাদি। বাস্তব অনুসন্ধানের দৃষ্টিতে ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ শ্রেণির দালালি কিংবা জ্ঞান-বিদ্যা ও পথ-প্রদর্শনের স্বার্থে দালালি কিংবা ব্যবসায়-বাণিজ্যে, ক্রয়-বিক্রয়ে দালালি এবং এসব ক্ষেত্রে নিঃস্বার্থভাবে দালালি বা টাকা-পয়সার স্বার্থে ও লোভে দালালিÑ যত প্রকারই হোক না কেন, তা ইনশাআল্লাহ নিম্নের অনুসন্ধানে উঠে আসবে। কিন্তু ইদানীং সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে কিছু সংখ্যক ধার্মিক লোক ও ইমাম হিসেবে পরিচিত লোকজনও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জাগা-জমির ক্রয়-বিক্রয়ের দালালি কর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন এবং তা বৈধ বলে প্রচারও করছেন। আর এ সুযোগে একশ্রেণির প্রতারক, চোর-ডাকাত, সমাজে সন্ত্রাসী হিসেবে দশজনের কাছে পরিচিত লোকজন সাধারণ ও নিরীহ-নিরুপায় লোকজনকে, যারা বিশেষ কোনো প্রয়োজনে জীবনের শেষ সম্বল ভিটে-মাটি বিক্রি করে একটা কিছু করতে চায় কিংবা যারা সারা জীবন মেহনত-মজদুরি করে জীবন-সায়াহ্নে এসে মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই করতে চায়Ñ সেসব লোকজনকেও এমনভাবে গ্রাস করে বসে, হেস্তনেস্ত করে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে। দালালচক্রকে বায়না পর্যায়ে, ক্রয়-বিক্রয় পর্যায়ে, রেজেস্ট্রি পর্যায়ে, মাপ-জরিপ ও দখল পর্যায়ে, বাউন্ডারি নির্মাণ বা বাড়িঘর নির্মাণ পর্যায়ে এত পরিমাণ চাঁদা বা উৎকোচ বা ভাগ দিতে বাধ্য করা হয়, যা অনেকক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের মূল ভূমি বা মূল নির্মিত বাড়ির মূল্যের সমপরিমাণে বা তার চেয়ে বেশি অঙ্কে পৌঁছে যায়। একই অবস্থা ব্যবসায়িক অপরাপর পণ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রেও হচ্ছে। উদাহরণত আলু, বেগুন, টমেটো, খিরাই ইত্যাদি যে পণ্যটি তার উৎপাদন স্থলে ৫/১০ টাকা কেজি হারে একজন চাষি বিক্রি করতে বাধ্য হয় কিংবা পরিস্থিতির শিকার হয়ে তা ফেলে দিতে বা গরু-ছাগলকে খাওয়াতে বাধ্য হয়, সে পণ্যটিই আড়তে বা বাজারে ২/৩/৪ গুণ বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। অথচ বাস্তবে প্রথম বিক্রেতার অনুরূপ প্রান্তিক বিক্রেতাও তেমন বেশি লাভবান না হয়ে মধ্যবর্তী দালালচক্র ও মধ্যস্বত্ব ভোগীরাই মূল ও লাভের সিংহভাগ হজম করে বসে। আবার তেমন দালালি হালাল বা বৈধ মর্মে তাদের কেউ কেউ শরিয়ত বা মাসআলার দোহাই দিয়ে থাকে। এ অবস্থায় বিষয়টির সার্বিক দিক ও সংশ্লিষ্ট শরিয়া বিধান কী, তা বিস্তারিত আলোকপাতের দাবি রাখে। 
‘দালাল’ বা ‘দালালি’ শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা 
‘দাল্লা’ ‘দালালাতান’-এর ‘সিলা’ যখন ‘ইলা’ হয়, তখন অর্থ হয়Ñ নির্দেশ করা, বোঝানো, দেখানো, জ্ঞাত করা। শব্দটির সিলা যখন ‘আলা’ হয়, তখন অর্থ হয়Ñ ‘নিয়ে যাওয়া’, ‘পরিচালিত করা’, ‘পথ দেখানো’, ‘প্রমাণ করা’, ‘প্রতিপন্ন করা’। এ থেকেই কর্তা পদে ‘দাল্লুন’ অর্থ প্রদর্শক, নির্দেশক। (আধুনিক আরবি-বাংলা অভিধান, ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান)।
যে হাদিসটিতে ‘কল্যাণ কাজের পথ প্রদর্শনকারী কাজটি সম্পাদনকারীর অনুরূপ (সওয়ার প্রাপ্তি প্রশ্নে) বলে পরিগণিত।’ বলা হয়েছে, তা ভালো বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করে। তবে প্রচলিত ‘দালালি’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত মৌল হচ্ছে ‘দাল্লালা’, যার অর্থ প্রণয়লিলার ভান, পুরুষের মন ভোলানো আচরণ, ছিনালি, ঢং। এ থেকেই ব্যবহৃত হয় ‘দাল্লাল’, নিলামদার ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যবর্তী ব্যক্তি। আর আরবি ‘দাল্লাল’ শব্দটিই বহুল ব্যবহারজানিত বাস্তবতায় ‘দালাল’ রূপে আমজনতা উচ্চারণ করে থাকে। শব্দটির এ দ্বিতীয় মৌলের প্রতি লক্ষ করলে বোঝা যায়, ওপরে আলোচিত হাদিসাংশের ভাবার্থ দ্বারা যে ভালো কিছু মনে করার ধারণা হতে পারে, তা যথার্থ নয়। অর্থাৎ সাধারণ বিবেচনাতেই দালালি কর্ম পেশাটি ছলচাতুরি ও প্রতারণার প্রতি ইঙ্গিত করে। 
উল্লেখ্য, আমাদের আলোচ্য ‘দালালি’ বিষয়টি বোঝানোর উদ্দেশ্যে সহিহ হাদিসগুলো ও ফিকহ-ফতোয়ার গ্রন্থগুলোতে সাধারণত ওই ‘ছিমছার’ ও ‘নাজাশ’ শব্দদ্বয় অধিক হারে ব্যবহৃত হয়েছে। আর ‘দাল্লাল’ বা ‘দালালি’ শব্দটি কমই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 
দালালির প্রকারভেদ : বাস্তব সমীক্ষার প্রতি লক্ষ করলে দেখা যায়, দালালি কর্মটি অনেকভাবে হয়ে থাকে। যথা : ১. ক্রেতার পক্ষে দালালি, ২. বিক্রেতার পক্ষে দালালি, ৩. উভয়পক্ষের হয়ে দালালি, ৪. পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দালালি, ৫. পারিশ্রমিক বা কোনো প্রকার বিনিময়বিহীন দালালি, ৬. ব্যক্তি ইমেজ বা ব্যক্তির সামাজিক সম্মান-সুনামের বিনিময়ে ২/১টি কথা বলে বা একটু সুপারিশ করে ক্রয়-বিক্রয় করিয়ে দেওয়া, ৭. পেশা হিসেবে দালালি করা, ৮. ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র বা আড়তের নির্দিষ্ট রীতি মোতাবেক প্রতি পণ্য বা চালান বা বিলের বিপরীতে শতকরা বা একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে ধার্যকৃত হারে দালালি করা, ৯. নির্দিষ্ট না করে ক্রেতা বা বিক্রেতা সন্তুষ্টচিত্তে দালালকে কিছু সম্মানী বা হাদিয়া বা বকশিশ নামে প্রদান করা এবং বিনা বিবাদ ও বাক্যে দালালের তা গ্রহণ করে নেওয়া, ১০. ক্রেতা-বিক্রেতার ধার্যকৃত অঙ্কের বা অবগতির বাইরে অতিরিক্ত বা কম মূল্যে বিক্রি করে বা ক্রয় করে তা নিজে গ্রহণের মাধ্যমে দালালি করা, ১১. বিয়ের দালালি। 
প্রাসঙ্গিক ভাবনা
‘ওকালত’/‘শাফাআত’/‘দালালি’ শব্দত্রয় যথাক্রমে ‘প্রতিনিধিত্ব করা’ বা ‘সুপারিশ করা’ বা ‘কারও পক্ষ হয়ে কাজ করা’Ñ এগুলো পরস্পর ভাবার্থ বিবেচনায় অনেকটা কাছাকাছি মনে হলেও পারিভাষিক বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ও পৃথক বিধিবিধান সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে। উদাহরণত কারও প্রতিনিধি হয়ে কাজ করার জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে তাকে নিযুক্ত হতে হয় কিংবা অনুমতিপ্রাপ্ত হতে হয়। কিন্তু দালালি করার ক্ষেত্রে তেমনটি জরুরি নয়, যদিও তেমনটি বাঞ্ছনীয় ছিল। তার কারণ সংশ্লিষ্ট দালালরা অনেক ক্ষেত্রেই তেমন নিয়োগ বা চুক্তি ছাড়াই উপযাচক হয়ে কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে থাকে। 
একইভাবে সুপারিশ কর্ম ও দালালি কর্মে বিধানগত বিভিন্ন পার্থক্যের পাশাপাশি অন্যতম পার্থক্য হচ্ছেÑ সুপারিশ কর্ম অন্যায় বা মন্দ কাজে হয়ে থাকলে তার ইহকালীন দায়দায়িত্বের পাশাপাশি পরকালীন মারাত্মক পরিণতি আছেই, আর তা যদি ভালো ও কল্যাণ কাজে হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে কোনো পারিশ্রমিক/সম্মানী গ্রহণ করা নাজায়েজ এবং তা দালালির বিধি মোতাবেক ঘুষ-উৎকোচরূপে পরিগণিত। (তাফসির মা’আরিফুল কুরআন, সৌদি ছাপা, পৃ. ২৭০-২৭১)। 
পক্ষান্তরে মিথ্যা ও প্রতারণা ইত্যাদি মুক্ত বিধি মোতাবেক দালালির পারিশ্রমিক/বিনিময় হালাল ও বৈধ হয়ে থাকে। সুতরাং এসব পার্থক্য বিচেনায় রেখে সংশ্লিষ্ট বিধান কী হবে? তা চয়ন-নির্ধারণ ও প্রয়োগে সচেতন থাকতে হবে। 
দালালি পেশা বা দালালি কর্মটি যখন শরিয়তের ব্যাখ্যা ও বৈধতার মাপকাঠি মোতাবেক হবে, অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা মৌখিক বক্তব্য অনুযায়ী দালালের দুপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনে কাগজপত্র ইত্যাদির ফটোকপি সংগ্রহ ও সরবরাহ কাজে সময়দান এবং যথাসাধ্য সংশ্লিষ্ট ক্রয়-বিক্রয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা ইত্যাদি কাজ নির্ধারণ করার পাশাপাশি তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক নির্দিষ্টভাবে জানা থাকতে হবে। তাহলেই তার পক্ষে দালালি কর্মটি আইনত বৈধ বলা যাবে। তার কারণ সে যদি সংশ্লিষ্ট কর্মের ভালো-মন্দ না বোঝে কিংবা তাতে ত্রুটি বা প্রতারণা থাকা সত্ত্বেও মধ্যস্বত্ব ভোগের লোভে অন্যায়ভাবে ক্রেতা/বিক্রেতাকে সহায়তা করতে প্রস্তুত হয়, তাহলে সে-ও সংশ্লিষ্ট কর্মে অযোগ্য ও প্রতারক বলে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই দালালি কর্মকে বৈধ বলা যাবে না। তেমন কিছু ঘটলে ক্রেতা বা বিক্রেতার প্রতারণা ও জালিয়াতির অপরাধের শাস্তির মধ্যে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দালালও অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। 


মানব কল্যাণে জ্ঞানার্জন
জ্ঞানের সুবাদেই মানুষের মর্যাদা নিষ্পাপ ফেরেশতাদের চেয়েও বেশি। আমাদের চিন্তাকে
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী ‘হে মোমিনরা, তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ করো (আকিদা ও
বিস্তারিত
তরুণদের জাগতে হবে
পশ্চিমা চিন্তা ও দর্শন এবং বস্তুবাদী ব্যবস্থার প্রভাব আমাদের বর্তমানকালকে
বিস্তারিত
অভিবাদনের নিয়ম-পদ্ধতি
সালাম মুসলমানদের মাঝে ভালোবাসা এবং হৃদ্যতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধির কারণ,
বিস্তারিত
একটি ভাতের দানা বানাতে সত্তরজন
খাদ্য পড়ে গেলে তুলে খেতে হয়- এটা সকলেরই জানা। রাসূল
বিস্তারিত
ইসলামে যে তিন সময়ে নামাজ
নামাজ বেহেস্তের চাবিকাঠি। মুসলমানদের জন্য দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া
বিস্তারিত