কোরআনের আলোকে পরস্পরের প্রতি শিষ্টাচার

আমরা কথা বলার সময় অহেতুক, অনর্থক কথাই বেশি বলে থাকি। মনে হয় যেন এ অনর্থকতাবিহীন আমার কথার মাধুর্য ফুটে উঠবে না। কিন্তু বাস্তবতা পুরোটাই তার বিরুদ্ধে। কারণ অধিক কথনে মানুষের ব্যক্তিত্ব লোপ পায়। আর দীর্ঘ কথায় ভুলের মাত্রাটা একটু লম্বাই হয়ে থাকে, আর শ্রোতাও

আমরা মানুষ, পৃথিবীতে আমাদের বসবাস। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, কথা বলা, উপকার করা কিংবা নেওয়াÑ এটি আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত। ফুরসত হলেই বন্ধু-বান্ধব, পরিবারের সদস্যরা গল্প-গুজব, হাসি-আনন্দে মেতে যাই। আর হ্যাঁ, এতে মানুষের মননশীলতা ও রুচিশীলতারও বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এটি সমাজ ও ধর্ম কোনোটিই বাধা দেয় না। তবে ইসলাম ধর্মে এ কথা বলা এবং সৌহার্দ্য বিনিময়কালে কিছু শিষ্টাচারের বিধান রয়েছে। এ বিধানের কোনোটিই আপনার-আমার জন্য অপ্রত্যাশিত নয়, বরং আমরাই মনে-প্রাণে প্রত্যাশা করি যে, প্রত্যেক ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে এভাবেই মিলিত হোক। অথচ আমরা জানি না, আমরা যা পছন্দ করি সেটিই ইসলাম। আমার প্রত্যাশাটিই রাসুল (সা.) এর শেখানো পদ্ধতি। এ কারণেই বলা হয়, ‘ইসলাম ইজ দ্য কম্পিলিট কোড অব লাইফ’, তথা ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। পবিত্র কোরআন আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথন, এমনকি ঝগড়াবিবাদের নিয়মাবলিও বর্ণনা করেছে। এ পদ্ধতি বর্ণনায় কী বলা হয়েছে আমরা তা একটু দেখে নিই। 
কোরআনের আলোকে পরস্পরের প্রতি শিষ্টাচার
মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে কোনো কিছু সংযোজন করতে ছেড়ে দেননি। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কেই কোরআনে রয়েছে সাম্যক ধারণা, যা আহরণ করে মানুষ ব্যক্তিত্বের উচ্চ শিখরে আরোহণ করতে পারে। মানুষের শিষ্টাচার ও আচরণবিধি নিয়েও কোরআনে বহু আলোচনা স্থান করে নিয়েছে। ধারাবাহিকভাবে আমরা কয়েকটি আয়াত নিয়ে বিশ্লেষণ করব। 
কথা বলা চাই হিকমত তথা প্রজ্ঞার সঙ্গে : আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেনÑ ‘আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন হিকমতের সঙ্গে এবং উত্তমরূপে উপদেশ শুনিয়ে।’ (সূরা নাহল : ১২৫)। আয়াতে কথা বলার জন্য দুটি শব্দে দুটি শর্ত ব্যবহার করা হয়েছে। একটি ‘আল-হিকমত’ ও অন্যটি ‘আল-মাওইজাতুল হাসানাহ’। আয়াতের মধ্যে হিকমত শব্দের ব্যাখ্যায় তাফসিরে বলা হয়েছেÑ ‘এমন বিশুদ্ধ বাক্যকে হিকমত বলা হয়, যা মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়।’ তাফসিরে রুহুল বয়ানেও প্রায় অভিন্ন সুরেই বলা হয়েছেÑ ‘হিকমত বলতে সে অন্তর্দৃষ্টিকেই বোঝানো হয়েছে, যার সাহায্যে মানুষ অবস্থার তাগিদ জেনে নিয়ে তদানুযায়ী কথা বলে।’ অর্থাৎ এমন সময় ও সুযোগ খুঁজে নেয়, যা শ্রোতার জন্য বোঝা না হয়। সুতরাং নম্রতার স্থলে নম্রতা, কঠোরতার স্থলে কঠোরতা অবলম্বন করাই এ হিকমত শব্দের উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় শর্তটি দুটি শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে গঠিত, তথা ‘আল-মাওইজাতুল হাসানাহ’। মাওইজা অর্থ : শুভেচ্ছামূলক কথা, আর হাসানাহ অর্থ উত্তম। শব্দগুচ্ছের অর্থ দাঁড়ায় : উত্তম শুভেচ্ছামূলক কথামালা। তাহলে মোদ্দাকথা হলো, শুভেচ্ছামূলক কথা এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে শ্রোতার হৃদয় তা গ্রহণের জন্য উদগ্রীব হয়। আর হাসানাহ তথা উত্তম এ কারণে যুক্ত করা হয়েছে যেন, আমাদের কথা এমন হয়, যা শ্রোতার হৃদয়কে নিশ্চিত করে এবং তার মনের সংশয় দূর করে। আর আমাদের কথার মর্ম উপলব্ধি করতে সচেষ্ট হয়। তাই শুভেচ্ছামূলক কথা থেকে মর্মবিদারক কথা প্রত্যাহার করতে হবে।
পছন্দযুক্ত পন্থায় বিতর্ক কর : কালামে পাকে বর্ণিত হয়েছেÑ ‘তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়।’ (সূরা নাহল : ১১৫)। প্রতিটি মানুষের চিন্তা-ভাবনার ভিন্ন ভিন্ন জগৎ থাকে। প্রত্যেক জগতেই সে একাকী স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে। কিন্তু তার চিন্তা যখন কোনো বিতর্কের মঞ্চে উপস্থাপিত হবে, তখন তাকে হতে হবে সহনশীল। নিজেকে রাখতে হবে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। যুক্তির কষ্টিপাথরে যদি আপনার চিন্তা বা গবেষণার বিষয়টি যৌক্তিকতার দাবি রাখে; তবে সেটি নিয়ে বিতর্কে জড়ানোর অনুমতি আছে; তবে তা উত্তমভাবে। তাফসিরে রুহুল মাআনিতে উত্তমভাবে বলতে বোঝানো হয়েছেÑ ‘কথাবার্তায় নম্রতা ও স্বল্পতা অবলম্বন করতে হবে। এমন যুক্তি পেশ করতে হবে, যা প্রতিপক্ষ বুঝতে ও হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়। মনে রাখতে হবে, বিতর্ক কিংবা বিবাদে জড়ানোর এ রীতি শুধু মুসলিমদের সঙ্গেই প্রযোজ্য এমনটি নয়। বরং এটি অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহ যখন মুসা ও হারুন (আ.) কে ফেরাউনের কাছে দাওয়াত নিয়ে প্রেরণ করলেন, তখনও তাদের দুই ভাইকে নম্র আচরণ করে বিতর্ক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেমন বলেছিলেনÑ ‘অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথা বল, হয়তো সে চিন্তা করবে অথবা ভীত হবে।’ (সূরা তোহা : ৪৪)। আয়াতে কারিমার মাধ্যমে বোঝা যায়, কর্কশ ভাষার চেয়ে মৃদু ভাষাই মানুষের শাসনের জন্য বেশি কার্যকর; তবে সেটি যদি হয় উত্তম পন্থায়। 
ঘৃণিত কথা ও কাজ পরিহার করা চাই : পবিত্র কোরআনে মানুষের প্রয়োজনীয় সব বিষয়েরই আলোচনা স্থান পেয়েছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ইস্যুগুলো নিয়েও মাধুর্যপূর্ণ বিধানাবলি স্থান করে নিয়েছে কোরআনজুড়ে। তারই উদাহরণস্বরূপ নিম্নোক্ত আয়াতটি বলা যায়Ñ ‘হে মোমিনরা! তোমরা অনেক (খারাপ) ধারণা থেকে বেঁচে থাক, নিশ্চয়ই কতক ধারণা গোনাহ। গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে?’ (সূরা হুজুরাত : ১২)। আলোচ্য আয়াতে তিনটি বিষয় সম্পর্কে নিষেধ করা হয়েছে, যা ব্যক্তিগত ও সামজিক ত্রুটিও বটে। নিষিদ্ধ বিষয়গুলো হলোÑ ক. কোনো মানুষের সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে না জেনে তাকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য বা ধারণা পোষণ করা। খ. কোনো মানুষের দোষত্রুটি তালাশ করা। গ. কোনো মানুষের পশ্চাতে এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, যা শ্রুতিতে তার হৃদয়ে অসহনীয় যন্ত্রণা অনুভূত হয়। আলোচ্য অপরাধগুলো ব্যক্তি ও সমাজের মাঝে অপরাধপ্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
কথা সংকোচন করা : আমার বলা কথা যদি কারও প্রশ্নের উত্তর হয়, নসিহত বা উপদেশ হয় কিংবা কোনো বিষয়ের বিশ্লেষণ হয়; তবে তা দীর্ঘ হতে পারে। নচেৎ কথার ঝুড়ি লম্বা করে তিক্ততা না বাড়িয়ে কথার আকর্ষণ ও মাধুর্যতা থাকতেই শেষ করা উত্তম। বোখারির বর্ণনায় আছেÑ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) প্রতি বৃহস্পতিবার (লোকদের) উপদেশ দিতেন। এক ব্যক্তি তাকে বললেনÑ আপনি প্রতিদিন আমাদের উপদেশ দেবেন বলে আমি আশা করি। ইবনে মাসউদ (রা.) উত্তরে বললেনÑ আমি তোমাদের ক্লান্তি পছন্দ করি না। নবী (সা.) যেমন তোমাদের ক্লান্তির আশায় বিরতি দিতেন, আমিও তোমাদের উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরতি দিয়ে থাকি। পবিত্র কোরআনের সূরা নিসায় বিধৃত হয়েছেÑ ‘তাদের অধিকাংশ সলাপরামর্শ ভালো নয়; কিন্তু যে সলাপরামর্শ দানখয়রাত করতে কিংবা সৎকাজ করতে অথবা মানুষের মধ্যে সন্ধি স্থাপন কল্পে করত তা স্বতন্ত্র।’ (১১৪)।
অনর্থক কথন পরিহার বাঞ্ছনীয় : আমরা কথা বলার সময় অহেতুক, অনর্থক কথাই বেশি বলে থাকি। মনে হয় যেন এ অনর্থকতাবিহীন আমার কথার মাধুর্য ফুটে উঠবে না। কিন্তু বাস্তবতা পুরোটাই তার বিরুদ্ধে। কারণ অধিক কথনে মানুষের ব্যক্তিত্ব লোপ পায়। আর দীর্ঘ কথায় ভুলের মাত্রাটা একটু লম্বাই হয়ে থাকে, আর শ্রোতাও বিরক্তি প্রকাশ করে। ঐশী গ্রন্থ আল কোরআনে বলা হয়েছেÑ ‘মোমিনরা সফলকাম হয়েছে... যারা অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হয় না।’ (সূরা মোমিনুন : ১-৩)।
নিম্নস্বরে কথা বলা : আমরা ধারণা করে থাকি, নিম্নস্বরে কথা বলাটা হয়তো মেয়েদের স্বভাব। কিন্তু আসলে মোটেই তা নয়, বরং এটি মোমিনের সিফাত (গুণ)। নরী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এ নমনীয়তা কাম্য। পবিত্র কালামেপাকে নিম্নস্বরে কথা বলার বিধান-সংবলিত একাধিক আয়াত রয়েছে। হাদিসেও আছে অনুরূপ। সূরা লোকমানের ১৯নং আয়াতে আল্লাহ বলেনÑ ‘পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কণ্ঠস্বর নিচু কর। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’
মিথ্যা পরিহার করে চলা : হাদিসে এসেছেÑ তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাক, কেননা মিথ্যা মানুষকে অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে, আর অন্যায় মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আলোচ্য হাদিসে মিথ্যার পরিণামের বর্ণনা পেশ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনেও মোমিনের গুণাবলি বর্ণনায় মিথ্যা বর্জন করা ও অন্যায় থেকে ফিরে আসার কথা আলোকপাত করা হয়েছে। ‘এবং যারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না এবং যখন অসার ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন মান রক্ষার্থে ভদ্রভাবে চলে যায়।’ (সূরা ফুরকান : ৭২)।
ইসলাম আমাদের কথা বলার আদব বা শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছে। সুতরাং বোঝা যায়, যে কথায় কোনো উপকারিতা নেই তাতে কোনো কল্যাণও নেই। আর মানুষের মুখ থেকে যা কিছু বলা হয় সবই ফেরেশতারা লিপিবদ্ধ করেন। আর মানুষের সব কথা সেটি চাই তার পক্ষে হোক নয়তো বিপক্ষে তার হিসাব নেওয়া হবে। সর্বোপরি আমরা কথা বলার ক্ষেত্রে কিংবা কাউকে উপদেশ দিতে পবিত্র কোরআনের এ বিধানাবলির প্রতি অবশ্যই জ্ঞাত থাকব। কারণ প্রতিটি কর্মের হিসাব বিচার দিবসের দিন আল্লাহর সামনে পেশ করতে হবে। সুতরাং কথায় বা গল্পে, ওয়াজ বা নসিহতে রসাত্মক, আক্রমণাত্মক, ব্যঙ্গাত্মক কোনো বাক্য উচ্চারণ না করাই কাম্য। এরশাদ হচ্ছেÑ ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৬)। 

লেখক : এমফিল গবেষক, আরবি বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


গিবত ও পরনিন্দার ভয়াবহতা
মোমিনের জন্য তার কাছে কেউ গিবত করুক এমন অনুমতি দেওয়াও
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
নবীজির এক স্ত্রীর কাহিনী যখন ভাবছিলাম তখন পেয়ে গেলাম নবীজির
বিস্তারিত
নবীজীবনে জালেমদের জন্য শিক্ষা
উসাইদ বিন হুজাইর (রা.)। রাসুলের সাহাবি। ছিলেন রসিক ও লাবণ্যময়।
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী মোহাম্মদ তোমাদের কোনো ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর
বিস্তারিত
পাথেয়
ইমাম হাতিম আল আসাম রহিমাহুল্লাহ বলেন পাঁচটি বিষয় ব্যতীত কোনো
বিস্তারিত
বাড়ছে পরিবেশ বিপর্যয় : সচেতনতা
পরিবেশ রক্ষার জন্য সর্বপ্রথম জোরালো ও একাডেমিক নির্দেশনা ইসলামই দিয়েছে।
বিস্তারিত