ইসলামে খাদ্য গ্রহণে পরিমিতিবোধ

একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, অধিক আহারের কারণে শারীরিক সুস্থতা দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়। নানা রোগব্যাধির জন্ম নেয়। ইবাদত-বন্দেগিতে অলসতা আসে। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, ‘তোমরা অবশ্যই পানাহারে স্থূলতা থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা তা দেহকে

প্রয়োজনের অতিরিক্ত সামান্য বেশি খাদ্য গ্রহণও ইসলামে কাম্য নয়। এতে  মোমিনের দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের হুকুম সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল আরাবি (রহ.) ফকিহদের দুই ধরনের মতামত উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ বলেন, নিষিদ্ধ। আর কারও কারও মতে মাকরুহ। তবে সহিহ কথা হচ্ছে, পরিতৃপ্ত হওয়ার বিষয়টি স্থান-কাল, ব্যক্তি, সময় ও পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে হুকুম যাই হোক, এর ক্ষতির দিকটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের ক্ষতি ও অকল্যাণ সর্বজনবিদিত। মোটাদাগে এর তিনটি বিশেষ ক্ষতিকর দিক রয়েছে। যথা
ধর্মীয় ক্ষতি : এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসুলের অপছন্দের কাজে লিপ্ত হওয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ওইসব ফকিহর কথা অনুযায়ী, যাদের মতে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ নিষিদ্ধ। কোরআনে পানাহারের অনুমতি দেওয়া হলেও অপচয় করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এমনিভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকেও পানাহারের ক্ষেত্রে অপচয় থেকে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এক হাদিসে এরশাদ করা হয়েছে ‘খাও, পান করো। দান-সদকা করো। কিন্তু এগুলোর কোনোটাতেই অহঙ্কার ও অপচয় করো না।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৬৭০৮)। 
রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিক পানাহারকে অপছন্দ করতেন। বর্ণিত হয়েছে ‘এক ব্যক্তি একবার তাঁর উপস্থিতিতে ঢেঁকুর দিলে তিনি বললেন, তুমি ঢেঁকুর নিবৃত করার চেষ্টা করো। কেননা দুনিয়ায় অধিক তৃপ্ত ব্যক্তিরা আখেরাতে অধিক হারে অনাহারে থাকবে।’ (তিরমিজি : ২৪৭৮)। আরেক হাদিসে এরশাদ হয়েছে ‘অপচয়ের একটি হচ্ছে, তুমি তাই খাবে, যা তোমার মনে চায়।’ (ইবনে মাজাহ : ৩৩৫২)। অর্থাৎ পরিমিতিবোধ রক্ষা না করে মনে যা চায় তাই ভক্ষণ করাও অপচয়ের একটি অংশ, যা নিষিদ্ধ।
শারীরিক ক্ষতি : বদহজম হওয়া, অধিক আহারের কারণে কোনো অঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাব পড়া ইত্যাদি। একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, অধিক আহারের কারণে শারীরিক সুস্থতা দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়। নানা রোগব্যাধির জন্ম নেয়। ইবাদত-বন্দেগিতে অলসতা আসে। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘তোমরা অবশ্যই পানাহারে স্থূলতা থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা তা দেহকে ধ্বংস করে, অসুস্থতা আবশ্যক করে, নামাজে অলসতা আনয়ন করে। আর তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, পানাহারে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। কেননা এটাই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, অপচয় থেকে রক্ষাকারী। আর আল্লাহ তায়ালা স্থূলাকায় বান্দাদের অপছন্দ করেন।’ (কানজুল উম্মাল : ৪১৭১৩)।  
ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, কম খাদ্য গ্রহণে রয়েছে শারীরিক সুস্থতা এবং রোগমুক্তি। কেননা অধিকাংশ রোগ সৃষ্টি হয় অধিক ভক্ষণ করার কারণে। (ইয়াহইয়া উলুমিদ দীন : ৪/১৩৪)। সুফিয়ান ছাওরি (রহ.) বলতেন, ‘তুমি যদি চাও তোমার শরীর সুস্থ থাকুক এবং ঘুম কম হোক তবে অবশ্যই কম আহার গ্রহণ করতে হবে।’ (জামিউল উলুম ওয়াল-হিকাম : ৪/৪৭)। 
মানসিক ক্ষতি : খাবারে পরিমিতিবোধ রক্ষা না করার ফলে বহু জরুরি কাজ বাধাগ্রস্ত হয় কিংবা যথাযথভাবে আদায় করা সম্ভব হয় না। মনে রাখতে হবে, মানুষের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে কলব ও তার দেহ। বিশেষ করে কলব দ্বারাই ভালোমন্দের পার্থক্য নির্ণয়, হক-বাতিলের পরিচয় লাভ, ন্যায়-অন্যায় চেনা ও জানা যায়। অধিক আহার গ্রহণ করার দ্বারা মানুষের দেহ-মন উভয়টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আহলে ইলম এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে লোকদের খুবই গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করেছেন। যেমন লুকমান (আ.) তার পুত্রকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, ‘হে বৎস! যদি তুমি পাকস্থলী পূর্ণ করে আহার গ্রহণ কর, তবে তোমার চিন্তাশক্তি ঘুমিয়ে পড়বে, হেকমত ও প্রজ্ঞা স্তিমিত হবে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ইবাদত-বন্দেগি ছেড়ে বসে যাবে।’ (সুবুলুস সালাম : ৭/১২১, আদাবুল আকলি : ১/৮)। 
ইমাম গাজালি (রহ.) ক্ষুধার উপকারিতা এবং পরিতৃপ্ত হয়ে খাবার গ্রহণের নিন্দা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে কম আহার ও ক্ষুধার ১০টি উপকারিতা বর্ণনা করেছেন। এর প্রথম উপকারিতা হচ্ছে পরিতৃপ্তি মানুষের মধ্যে নির্বুদ্ধিতা তৈরি করে, অন্তরকে অন্ধ বানিয়ে দেয়, নিম্ন অভিরুচি এবং মানসিক বিকলাঙ্গ সৃষ্টি হয়। ফলে চিন্তাশক্তি হ্রাস পায় ও উপলব্ধি ক্ষমতা কমে যায়। দ্বিতীয় ক্ষতির দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অধিক খাদ্য গ্রহণ অন্তরের কোমলতা ও পরিচ্ছন্নতা নষ্ট করে দেয়; যা মূলত জিকির দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার মাধ্যম। এর ফলে জিকিরের স্বাদ নষ্ট হয়। তিনি আবুু সুলায়মান দারানি (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘অন্তর ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত হলে তা পরিচ্ছন্ন ও কোমল হয়। পরিতৃপ্ত হলে অন্ধ ও কঠোর হয়।’ 
গাজালি (রহ.) অধিক খাবার গ্রহণের আরেকটি অপকারিতা উল্লেখ করে বলেন, ‘অধিক পরিমাণ তৃপ্ত হলে প্রবৃত্তি বৃদ্ধি করে। আর এটাই হচ্ছে সব পাপের উৎস।’ তিনি যুন নুন মিসরি (রহ.) এর একটি মূল্যবান বাণী উল্লেখ করেন, ‘আমি পরিতৃপ্ত হয়ে খাবার গ্রহণ করলে হয়তো পাপে লিপ্ত হয়েছি কিংবা ন্যূনতম পাপের ইচ্ছা করেছি।’ (সুবুলুস সালাম : ৭/১২২)। 
সুলায়মান দারানি (রহ.) থেকে তিনি আরও বর্ণনা করেন, ‘পরিতৃপ্ত হয়ে খাবার গ্রহণ করলে মানবদেহে ছয়টি বিপদ প্রবেশ করে। মোনাজাতের মিষ্টতা উঠে যায়, হিকমত ও প্রজ্ঞা অর্জন করা অসম্ভব হয়, ইবাদত কঠিন হয় এবং প্রবৃত্তির বৃদ্ধি ঘটে।’
ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) বলেন, পরিমিত খাদ্য গ্রহণের ফলে অন্তর নরম হয়, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়, অন্তর বিনয়ী হয় এবং কামনা ও ক্রোধ দুর্বল হয়। পক্ষান্তরে অধিক খাদ্যগ্রহণের ফলে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। (জামিউল উলুমে ওয়াল হিকাম  : ৪৪/৪৭)।
হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, ‘হেকমত কখনও খাদ্যে পরিপূর্ণ পেটে বসবাস করতে পারে না।’ (গিজাউল আলবাব : ২/৪৭০)। আবুু ইমরান আল-জাওনি (রহ.) বলতেন, ‘যে ব্যক্তি তার অন্তর আলোকিত হওয়া কামনা করে সে যেন কম খাদ্য গ্রহণ করে।’ (জামিউল উলুমে ওয়াল হিকাম  : ৪৪/৪৭)।
ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) বলতেন, যে ব্যক্তি নিজের পেটকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে দ্বীনের বিধানকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যে ব্যক্তি তার ক্ষুধার মালিক হয় সে যাবতীয় নেক আখলাক অর্জন করতে সক্ষম হয়। ক্ষুধার্ত ব্যক্তি থেকে পাপ অনেক দূরে থাকে। পাপ পরিতৃপ্ত ব্যক্তির কাছে অবস্থান করে। পরিতৃপ্তি অন্তরকে মৃত বানিয়ে দেয়। এর ফলে মানুষের মধ্যে আনন্দ, কৌতুক ও রং-তামাশা সৃষ্টি হয়।
ইমাম কুরতুবি (রহ.) স্বীয় তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘পরিমিত খাদ্যগ্রহণে রয়েছে একাধিক উপকারিতা। এর দ্বারা মানুষ সুস্থ দেহের অধিকারী হয়, স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর হয়, বোধশক্তি পরিচ্ছন্ন হয়, ঘুম কম হয়। পক্ষান্তরে অধিক খাদ্য গ্রহণের ফলে পাকস্থলী ভারি হয় এবং নানা রকমের রোগ-ব্যাধি দেখা দেয়।’


আল্লাহর ভয় এবং এর প্রভাব
এ জন্য দরকার হৃদয়কে আল্লাহর ভালোবাসায় গড়ে তোলা। আল্লাহর উলুহিয়্যাহ
বিস্তারিত
বৈষম্যহীনতা ইসলামের সৌন্দর্য
বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান মোটিভেশনার বক্তার একটি ছবি সম্প্রতি ফেইসবুকে ভাইরাল
বিস্তারিত
ভালোবাসা আছে দিবস নেই
প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। এসব মানবিক গুণ
বিস্তারিত
আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা ও
শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করা আলোকপ্রাপ্ত বিবেক ও বুদ্ধির কাজ।
বিস্তারিত
কবি সাহাবি আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা
আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.) এর উপনাম আবু মুহাম্মদ, আবু রাওয়াহা।
বিস্তারিত
সম্পর্ক আবেগ নয় বিবেক দিয়ে
সৃষ্টিলগ্ন থেকেই পুরুষ নারীর প্রতি আকর্ষিত। এ আকর্ষণের অন্যতম অনুঘটক
বিস্তারিত