যেভাবে সন্তানকে নামাজি বানাবেন

বিভিন্ন সময়ে সন্তানদের নামাজের ব্যাপারে সতর্ক করা। ওয়াক্ত সম্পর্কে সজাগ থাকার তাগিদ দেওয়া। যেমন কোথাও বেড়াতে গেলে যথাসময়ে যেন নামাজ পড়ে নেয়, সে তাগিদ দেওয়া। রাতে আগেভাগে ঘুমানোর চেষ্টা করলে এশার নামাজ পর্যন্ত অপেক্ষা করার তাগিদ দেওয়া। নামাজ যথাযথভাবে আদায়

হাদিসে এরশাদ হয়েছে ‘তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আর প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ আর সন্তান হলো মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধীনস্তজন। তাই তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব অসীম। সন্তানের প্রতি এই দায়িত্বের মধ্যে সর্বপ্রথম পড়ে তাদের শিষ্টাচার দিয়ে গড়ে তোলা।  সন্তানকে আদব-শিষ্টাচারের মধ্যে সর্বোত্তম আদব-শিষ্টাচার হলো তাকে দ্বীন ও নামাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া। এ প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই নবীজি তাদের নামাজ শিক্ষা দেওয়ার আদেশ করেছেন। 
নামাজের প্রশিক্ষণ প্রদানের স্তর 
একটি শিশুকে ধাপে ধাপে গড়ে তুলতে হয়। কোনো বস্তু বা বিষয় পরিকল্পিতভাবে শিশুর মনে-মগজে ঢুকিয়ে দিলে চিরদিনের জন্য তা তাদের অন্তরে গ্রোথিত হয়। নামাজ যেহেতু একজন মুসলমানের অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল এবং জীবনের কোনো মুহূর্তেই তা পরিত্যাগ করার সুযোগ নেই, তাই পরিকল্পিতভাবে শিশুর অন্তরে নামাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত, যাতে চিরদিন সে নামাজের প্রতি যতœবান থাকে। আলেমরা এর কয়েকটি ধাপ ও স্তর উল্লেখ করেছেন। নিম্নে সংক্ষেপে তা পেশ করা হলো। 
শিক্ষার প্রথম ধাপ 
একেবারে শিশুকালে সন্তানের ওপর কোনো বিষয়েই চাপ প্রয়োগ করা উচিত নয়। বরং এ সময়গুলোতে তাকে পারিপার্শ্বিকতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। তবে কিছুটা বুঝ ও উপলব্ধি হওয়ার পর থেকে কোমলভাবে নামাজ সম্পর্কে পরিচিত করে তুলবে। হাদিসে এরশাদ হয়েছে ‘রাসুুল (সা.) এরশাদ করেন, শিশুরা যখন ডান থেকে বাম পৃথক করা জানবে, তখনই তাদের নামাজের কথা বলবে।’ (সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৭)।
এ সময় শিশুরা নামাজের মাসাআলা-মাসায়েল রপ্ত করতে পারবে না, চাপ দেওয়াও ঠিক নয়। তবে তাদের অভিভাবকরা নামাজ আদায় করার সময় নিজেদের পাশে দাঁড় করিয়ে দেবে। কখনও কখনও মসজিদেও নিয়ে যাবে, যাতে মসজিদের সঙ্গেও আত্মিক সম্পর্ক হয়। এরা কখনও মুসল্লিদের সামনে দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করবে, কখনও কথা বলবে, চিৎকার করবে। তবে অন্য মুসলমানরাও সহনশীল দৃষ্টিতে দেখবে। অবশ্য মসজিদে প্রস্রাব করবে না, এমন বয়সেই শুধু মসজিদে নেওয়া উচিত। আর হাদিসে ফরজ নামাজ মসজিদে এবং সুন্নত-নফল ঘরে আদায় করার উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। অনেক উদ্দেশ্যের মধ্যে এটাও একটি যে, এর দ্বারা শিশুরা নামাজ সম্পর্কে ধারণা পাবে। কেননা বাবা-মাকে নামাজ আদায় করতে দেখে সন্তান সৃষ্টিগতভাবে নামাজের প্রতি আগ্রহী হবে। কেননা, সন্তানকে বাবা-মায়ের ফিতরাত ও স্বভাবে বৈশিষ্ট্যম-িত করে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে হাদিসে ইঙ্গিত করা হয়েছে। 
শিক্ষার দ্বিতীয় ধাপ
সাত বছরে উপনীত হওয়ার আগে শিশুদের নামাজের টুকিটাকি মাসআলা শিক্ষা দেবে। অনুধাবন করতে পারে এমন কিছু কিছু ফজিলতও শিক্ষা দেবে। বিশেষভাবে নামাজের জন্য শরীর ও কাপড় পবিত্র থাকার গুরুত্বের মাসআলাগুলো শিক্ষা দেবে এবং শরীর ও কাপড় পাক রাখার গুরুত্ব ও পদ্ধতিগুলোও যতœসহকারে শিক্ষা দেবে। অজুর কয়েকটি মাসআলা এবং অজু করার নিয়ম হাতে-কলমে শিখিয়ে দেবে। আর সূরা ফাতিহাসহ কয়েকটি ছোট ছোট সূরা শিক্ষা দেবে।
শিক্ষার তৃতীয় ধাপ 
এ সময় তাদের রীতিমতো নামাজের আদেশ করতে বলা হয়েছে। এ কারণে আলেমরা বলেন, এ সময় শিশুদের এই হাদিস শিক্ষা দেওয়া এবং হাদিসের মর্ম তাদের সামনে স্পষ্ট করা উচিত, যাতে তারা এখন যে নামাজ পালন এবং এজন্য জবাবদিহিতার বয়সে উপনীত হয়েছে তা বুঝতে শেখে। এক পূর্বসূরির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি তার সন্তানের বয়স সাত বছরে উপনীত হওয়ার পর ঘটা করে একটি অনুষ্ঠান করেন এবং মাহফিলে সবার সামনে সন্তানকে অবহিত করেন, তার ওপর এখন থেকে নামাজের আদেশ আরোপিত হয়েছে। কেননা নবীজি এ বয়সে তোমাকে নামাজ আদায় করার আদেশ করেছেন। 
এ বয়সে শিশুদের অত্যন্ত কোমলতা, স্নেহ, অনুগ্রহ ও আদরের সঙ্গে নামাজের উৎসাহ দেবে। মারধর করবে না। কেননা এ সময় মারধর করার কথা অনুমতি দেওয়া হয়নি। আর এ বয়সে উপনীত হওয়ার পর শিশুকে শুধু নামাজের তাগিদই দেবে না, বরং এখন থেকে অজু ও পবিত্রতার তালিমও দেবে। নামাজের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্রও তার সামনে তুলে ধরবে। একাগ্রতার সঙ্গে নামাজ আদায়ের তালিম দেবে। নামাজের কিছু দোয়া-কালামও শিক্ষা দেবে। 
শিক্ষার চতুর্থ ধাপ 
চতুর্থ ধাপ হচ্ছে ১০ বছরে উপনীত হওয়া। হাদিসে এই চতুর্থ ধাপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছেÑ ‘তারা ১০ বছর বয়সে উপনীত হলে নামাজের জন্য প্রয়োজনে শাসন করবে।’ সুতরাং এই বয়সে নামাজের হিসাব নেবে, তরক করলে লঘু এবং প্রয়োজনে এর চেয়ে হালকা শাস্তি দেবে। তবে এই বয়সি সন্তানকে নামাজে অভ্যস্ত করার সবচেয়ে কার্যকরী দাওয়াই হচ্ছেÑ বাবা-মায়ের নিজেদের নামাজ আদায় করা। 
সুতরাং বাবা যদি নিয়মিত নামাজি হন এবং সন্তানকে প্রতি ওয়াক্ত নিজের সঙ্গে করে মসজিদে নিয়ে নামাজ পড়ান তবে অল্পদিনের মধ্যে সন্তান নামাজে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে এবং তখন আর তার নামাজ ছুটবে না। এ সময় মসজিদে যাওয়া-আসার পথে নামাজের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল শিখিয়ে দেবেন। তবে মাসআলা বুঝানোর সময় অবশ্যই তার বয়স ও ধারণ ক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।
শিক্ষার পঞ্চম ধাপ 
হাদিসে শাসনের কথা বলা হয়েছে ভেবে শুধু মারধরকেই একমাত্র অবলম্বন মনে করবে না। বরং এর সঙ্গে সঙ্গে কৌশল ও বুদ্ধিমত্তারও উপায় অবলম্বন করতে হবে। যেমন কোনো নামাজ ছুটে গেলে অন্য কোনো নেক আমলের মাধ্যমে তার ঘাটতি পূরণের দীক্ষা দেবে। কোনো মুরুব্বির খেদমত, নফল রোজা, সাদকা করানো, কিছু সামাজিক সৎকাজ করানো ইত্যাদি পন্থা অবলম্বন করবে। এর মধ্য দিয়ে তার নামাজের প্রতি ঝোঁক ও গুরুত্ব দুটিই সৃষ্টি হবে। এর দ্বারা শিশু যেমন নামাজ কাজা করতে ভয় পাবে, তেমনি শরিয়তের আরেকটি মূলনীতি সম্পর্কে ধারণা পাবে। হাদিসে এরশাদ হয়েছেÑ ‘কোনো পাপ কাজ করে ফেললে এর পশ্চাতে নেককাজ আনয়ন করে। নেককাজটি পাপ কাজটাকে মিটিয়ে দেবে।’ 
মানবজীবনে এই দীক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বাবা-মা সন্তানের জন্য সর্বদা নামাজি হওয়ার দোয়া করবে। এটা জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.) এর সুন্নত। তিনি সর্বদা দোয়া করতেনÑ হে আল্লাহ! আমাকে সালাত কায়েমকারী করো এবং আমার বংশধরদের মধ্য হতেও।’
শিক্ষার ষষ্ঠ ধাপ 
বিভিন্ন সময়ে সন্তানদের নামাজের ব্যাপারে সতর্ক করা। ওয়াক্ত সম্পর্কে সজাগ থাকার তাগিদ দেওয়া। যেমন কোথাও বেড়াতে গেলে যথাসময়ে যেন নামাজ পড়ে নেয়, সে তাগিদ দেওয়া। রাতে আগেভাগে ঘুমানোর চেষ্টা করলে এশার নামাজ পর্যন্ত অপেক্ষা করার তাগিদ দেওয়া। নামাজ যথাযথভাবে আদায় করার জন্য নামাজের সময়সূচির জ্ঞান থাকাও জরুরি। তাদের এ বয়সে নামাজের ওয়াক্ত সম্পর্কেও অবহিত করা। আর এ সময়ে ফরজ নামাজের পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় নফল নামাজ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। যেমন ইশরাক, চাশত, আওয়াবিন ইত্যাদি প্রসিদ্ধ নফল নামাজ। 
শিক্ষার সপ্তম ধাপ 
এই ধাপ অতিক্রম করার পর তাদের জামাত ও মসজিদে নামাজ আদায় করার গুরুত্ব সম্পর্কে তাগিদ দেওয়া। বিশেষ করে জুমার নামাজে আগে আগে মসজিদে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া। সন্তানের নামাজি হওয়ার জন্য মসজিদমুখী হওয়া জরুরি। মসজিদে যাতায়াতের অভ্যাস হলে তার পক্ষে আর নামাজ ত্যাগ করা সম্ভব হবে না।
শিক্ষার অষ্টম ধাপ 
সপ্তম ধাপ অতিক্রম করার পর শিশুদের কোরআন, দোয়া ও নামাজের ভেতরে ও বাইরের প্রয়োজনীয় দোয়া-কালাম শিক্ষা দেওয়া। বিশেষ করে নামাজে যেসব দোয়া পড়তে হয় এবং নামাজের পর নবীজি যেসব দোয়া পড়তেন সেগুলো পর্যায়ক্রমে শিক্ষা দেওয়া। নামাজের শিক্ষা ও তালিম-তারবিয়াত প্রদানের জন্য শিশুদের প্রতি এই ধাপগুলো অবলম্বন করলে একজন মুসলিম শিশু প্রকৃত নামাজি হিসেবে গড়ে উঠবে এবং এ শিক্ষায় শিক্ষিত ও দীক্ষিত শিশু প্রকৃত মুসলমান এবং ‘নামাজ কায়েমকারী’ হিসেবে গড়ে উঠতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।


সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি প্রকাশ
রমজান মাস আসন্ন। বছর ঘুরে আবারও আসছে মুসলিম জাতির জন্য
বিস্তারিত
শবে বরাতের নামাজ ঘরে পড়ার
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে সবাইকে ঘরে দোয়া ও
বিস্তারিত
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে করোনা ভাইরাসে
বিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে
বিস্তারিত
দুইশ বছর পর এবারের হজ
ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো পবিত্র হজ। বিশ্ব মুসলিমের
বিস্তারিত
তাবলিগ থেকে ৯০০০ মানুষ করোনার
ভারতের তাবলিগ জামাতের মার্কাজ হিসেবে ব্যবহৃত দিল্লির নিজামুদ্দিন মসজিদের একটি
বিস্তারিত
সালাত মোমিনের আশ্রয় ও অবলম্বন
কতই না মহান এর মর্যাদা। কি সমুচ্চ এর অবস্থান। এটি
বিস্তারিত