logo
প্রকাশ: ০১:০৭:৫২ AM, সোমবার, ফেব্রুয়ারী ১১, ২০১৯
মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভাষার অবদান
মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা। আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সূচনাতেই বৈচিত্র্যময় ভাষা সৃষ্টি করে এবং মানব জাতিকে ভাষা শিক্ষা দিয়ে অন্যান্য জাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ প্রতিকূলতাকে জয় করে মানবতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। ভাষা প্রবাহিত হয়ে চলে মানুষের মুখে মুখেÑ মানুষেরই প্রয়োজনে। আবার কোনো কারণে ভাষা যখন মানুষের প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, তখনই তার ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে। এভাবে সংস্কৃত, গ্রিক, ল্যাটিন ভাষা আজ ইতিহাসের জাদুঘরে স্থান করে নিয়েছে। তবে বর্তমান পৃথিবীতে ছয় হাজারের বেশি ভাষা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা হলো চীনা, ইংরেজি, হিন্দি, স্পেনীয়, আরবি, পর্তুগিজ, রুশ, বাংলা, জাপানি, জার্মানি ও ফরাসি। 
বিভিন্ন জাতি ভাষা শিক্ষা ও তার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানবাজাতির কল্যাণে এগিয়ে যাচ্ছে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আসমান-জমিন, দিন-রাত, মানুষ ও জীব-জন্তুর মতো ‘ভাষা’ সৃষ্টিরও উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘দয়াময় আল্লাহ, শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন। সৃষ্টি করেছেন মানুষ। শিক্ষা দিয়েছেন ভাষা।’ (সূরা আর-রহমান : ১-৪)। আল্লাহ তায়ালা অন্য স্থানে এরশাদ করেন, ‘তার আরও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোম-ল ও ভূম-ল সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (সূরা রুম : ২২)। আল্লাহ তায়ালা আদি পিতা হজরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করার পরপরই তাকে ভাষাসহ বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান শিক্ষাদানের মাধ্যমে ফেরেশতা ও জিন জাতির ওপর সম্মান ও মহত্ত্ব দান করেন। কোরআনে এরশাদ হচ্ছে, ‘আর আল্লাহ তায়ালা শেখালেন আদমকে সব বস্তুসামগ্রীর নাম। তারপর সে সব বস্তুসামগ্রীকে ফেরেশেতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে এগুলোর নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।’ (সূরা বাকারা : ৩১)।
আল্লাহ তায়ালা তার প্রত্যেক সৃষ্টিজীবের জন্য ভাষা নির্ধারণ করেছেন এবং তার শুদ্ধ চর্চার মাধ্যমে মর্যাদা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছেন। কেননা প্রত্যেক ভাষাই মহান রাব্বুল আলামিনের অন্যতম নির্দশন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে প্রত্যেক ভাষাভাষীর কাছে তাদের নিজ নিজ ভাষায় প্রতিনিধি প্রেরণ করেছেন। যেন তারা স্বজাতিকে ডাকতে পারেন তাদের সৃষ্টিকর্তার দিকে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে, ‘আমি সব রাসুলকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষীর কাছে প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের (আমার বাণী) স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারে।’ (সূরা ইবরাহিম : ৪)। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক জাতির স্বীয় মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করে নিজ নিজ জাতির নিজস্ব ভাষায় আসমানি কিতাবগুলো নাজিল করেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, প্রধান চারটি আসমানি কিতাবের মধ্যে হজরত মুসা (আ.) এর প্রতি ‘তাওরাত’ হিব্রু ভাষায়, হজরত ঈসা (আ.) এর প্রতি ‘ইঞ্জিল’ সুরিয়ানি ভাষায়, হজরত দাউদ (আ.) এর ‘যাবুর’ ইউনানি ভাষায় এবং শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি ‘কোরআন’ আরবি ভাষায় নাজিল করা হয়। 
আল্লাহ তায়ালা হজরত সুলায়মান (আ.) কে অন্যান্য প্রাণীর ভাষা শিক্ষাদানের মাধ্যমে মানবজাতির মর্যাদা বৃদ্ধি ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সব প্রাণীর ভাষা বুঝতে পারতেন। এটা ছিল তার প্রতি মহান আল্লাহর প্রকাশ্য অনুগ্রহ। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘সুলাইমান দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। বলেছিলেন, হে লোকসকল, আমাকে উড়ন্ত পক্ষীকুলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং আমাকে সবকিছু দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব।’ (সূরা নমল : ১৬)। কেননা আল্লাহ তায়ালা মানব জাতির পাশাপাশি অন্যান্য সৃষ্ট জীবকেও ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষের মতো আকাশের ফেরেশতা, জিন ও অন্যান্য সৃষ্টি এবং উড়ন্ত বিহঙ্গপাল সবাই তাদের নিজ নিজ ভাষা ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে নিরন্তরভাবে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা প্রকাশ করে মর্যাদা বৃদ্ধি করছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ এরশাদ করেনÑ ‘তুমি কি দেখ না যে, নভোম-ল ও ভূম-লে যারা আছে, তারা এবং উড়ন্ত পক্ষীকুল তাদের পাখা বিস্তর করত আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই তার যোগ্য ইবাদত এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা ও পদ্ধতি জানে।’ (সূরা নুর : ৪১)। 
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছুই তারই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এবং এমন কিছু নেই যা তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না। কিন্তু তাদের পবিত্রতা, মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পার না। নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।’ (বনি ইসরাইল : ৪৪)। 
আল্লাহ তায়ালা একেকটি জাতি-গোষ্ঠীকে তাদের ভৌগোলিক ভিন্নতার কারণে বিশেষ বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী করেছেন, সে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে হলে তাদের ভাষা জানা প্রয়োজন। আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন ‘বায়তুল হিকমা’ নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরআন ও হাদিসের জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর গবেষণাগুলোও আরবি ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা করেন, আর এর দ্বারা মুসলিম মনীষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদান রেখে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 
আল্লাহ তায়ালার অন্যতম সৃষ্টি ও নিদর্শন হচ্ছে বাংলা ভাষা। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ও ভাষার মর্যাদা অক্ষুণœ রাখার জন্য বাঙালি জাতি ১৯৫২ সালে জীবন দিয়ে বিশে^র বুকে নজির স্থাপন করে। তাই আসুন বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চা করি। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করি। অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর লব্ধ জ্ঞান বাংলায় ভাষান্তর করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সব ভাষার ওপর মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা অক্ষুণœ রাখি।

লেখক : সিনিয়র লেকচারার, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]