logo
প্রকাশ: ০৭:৪২:০১ AM, শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ২৮, ২০২০
সালাত মোমিনের আশ্রয় ও অবলম্বন
শায়খ ড. ফয়সাল বিন জামিল গাজ্জাবি

কতই না মহান এর মর্যাদা। কি সমুচ্চ এর অবস্থান। এটি রিজিক আনয়ন করে। সুস্থতা রক্ষা করে। কষ্ট নিবারণ করে। রোগ দূর করে। মনে শক্তি জোগায়। চেহারায় উজ্জ্বলতা আনে। হৃদয় প্রফুল্ল করে। অলসতা বিতাড়ন করে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চাঙা করে। শক্তি বৃদ্ধি করে। চিত্ত প্রশস্ত করে। আত্মার খোরাক জোগায়। মননকে আলোকিত করে। নেয়ামত রক্ষা করে। আজাব প্রতিরোধ করে। বরকত টেনে আনে। শয়তান থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। দয়াময়ের কাছে নিয়ে আসে। এর সম্মান ও মর্যাদা বর্ণনায় শরিয়তের কত বক্তব্যই না বিবৃত হয়েছে। সমূহ আমলের মধ্যে একে কতভাবেই না বিশিষ্টতা দেওয়া হয়েছে। এর মর্যাদা ও তাৎপর্য বিষয়ে, এর মাসালা-মাসায়েল এবং এতে পাঠ ও করণীয় বিষয় সংবলিত কত গ্রন্থই না রচনা করেছেন আলেম ও শরিয়তবিদরা। ওয়ায়েজ ও উপদেশদাতারা এর গুরুত্ব এবং সর্বাবস্থায় একে রক্ষার অপরিহার্যতা বিষয়ে কত বক্তব্যই না দিয়েছেন। কেন নয়? এ যে আল্লাহর তাওহিদের পর দ্বীনের মূলস্তম্ভ। সুদৃঢ় ভীত ও মজবুত খুঁটি। এ হলো সালাত। এটি হলো নামাজ। আপনি কি জানেন সালাত কী? অতঃপর আপনি কি জানেন নামাজ কী?   
আল্লাহ ও তাঁর রাসুলে ঈমানের পর এটি প্রধান ফরজ। যে ঠিকমতো একে আদায় করে, সে তার মাওলার কাছে আসে। সৌভাগ্য ও তাঁর নৈকট্য লাভে কামিয়াব হয়। যে সালাত ত্যাগ করে, সে নিজ রবের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে হতভাগা হয় এবং তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যায়। সালাত হলো বান্দা ও তার রবের মাঝে সম্পর্কের সেতু। সালাত ছেড়ে দিলে এই সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। 
আল্লাহর বান্দা, আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার অর্থ কি জানেন? এর অর্থ বান্দার ধ্বংস, সব বিনাশ। ক্ষয়ক্ষতি, বিনাশ ও নিঃস্ব হয়ে যাওয়া। ধ্বংস, লয় ও পতনের শিকার হওয়া। বান্দার কী আর অবশিষ্ট থাকে যখন সে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়? প্রভুর সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়? তার দোয়া নিষ্ফল হয়? তার মুনিব তার থেকে বিমুখ হন এবং তার ও আল্লাহর রহমতের মাঝে পর্দা পড়ে যায়?
মুসলিম ভাইয়েরা, সালাত হলো কায়িক ইবাদতগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও শির। এটি দুর্বল মাখলুকের জন্য শক্তি, কৃপা ও পূর্ণতার উৎসের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম। সালাতের মূল্য শুধু সেই বোঝে যে তা কায়েম করে, এর স্বাদ গ্রহণ করে এবং নিজ প্রভুর সন্তুষ্টির কাছে চলে যায়। হ্যাঁ, সালাতের আছে এক স্বাদ! কী অনির্বচনীয় স্বাদ! নবী (সা.) এর চোখের শীতলতা ছিল এই সালাত। তিনি বলতেন : ‘সালাতের মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি জোগাও হে বেলাল!’ যখনই কোনো কঠিন মুহূর্ত আসত, তিনি ভীতবিহ্বল হয়ে সালাতে দ-ায়মান হতেন। কেন নয়? এ যে প্রত্যেক আল্লাহমুখী ব্যক্তির বিপদে আশ্রয়। বিপন্ন ব্যক্তি যখন সালাত আদায় করে, তার উদ্বেগ দূর হয়ে যায়। উদ্বিগ্ন ব্যক্তি যখন নামাজ আদায় করে, তার উৎকণ্ঠা উবে যায়। পলায়নপর দূরে সরে যাওয়া ব্যক্তি যখন নামাজে দাঁড়ায়, তার হৃদয়ে প্রশান্তি ফিরে আসে। ফলত সালাত হলো মানসিক স্থিরতার সবচেয়ে বড় নিয়ামক। 
বিপরীতে যে ব্যক্তি সালাত আদায় করে না, সে বিক্ষিপ্ততা, অন্তহীন পেরেশানি ও ধ্বংসে নিপতিত। যে নামাজ কায়েম করে না, তার নেই বিজয়, সফলতা, মুক্তি, লাভ, প্রাপ্তি ও সাহায্য। বরং তার জন্য বরাদ্দ লাঞ্ছনা, ধ্বংস, লয়, বিনাশ ও দুর্ভোগ। যে কেউ দ্বীনের মেরুদ- সালাত বরবাদ করে, তার জীবন ও আচরণে এর প্রভাব পড়ে। সংকটকালে, বিপদের সময় সে কোথায় যাবে? তার কোন আশ্রয় থাকবে তখন? কার সাহায্য সে চাইবে? যে বান্দা তার প্রভু থেকে দূরে, সে আল্লাহর জন্য সালাত কায়েম করে না এবং সিজদাবনত হয় না, সে কোন শান্তি আর কোন প্রশান্তি পাবে? কোন সৌভাগ্য সে লাভ করবে? আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘আর যে আমার স্মরণ (নামাজ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জীবন হয় সংকটাপন্ন।’ (সূরা ত্বহা : ১২৪)। 
যে নামাজ পড়ে না, সে নিন্দিত ও হতভাগ্য। সে সর্বদা থাকে টেনশন ও দুশ্চিন্তায়। যে ব্যক্তি নামাজ কায়েম করে না, সে স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালার বাণীটি একটু ভেবে দেখুন : ‘আল্লাহ বলে দিলেন : আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। যদি তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠিত কর...।’ (সূরা মায়িদা : ১২)। আয়াতটি পরিষ্কার প্রমাণÑ বেনামাজি ব্যক্তি আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় থেকে বঞ্চিত। 
আল্লাহর বান্দারা, নিশ্চয় নামাজ সম্পর্কিত প্রতিটি আয়াত, হাদিস ও সাহাবিদের উক্তি ইসলামে নামাজের গুরুত্ব প্রমাণ করে। নামাজ ত্যাগ, বরবাদ ও আদায়ে গাফিলতি থেকে হুঁশিয়ার করে। সেসবের একটি হলো আল্লাহর বাণী : ‘অবশ্য তারা যদি তওবা করে, নামাজ কায়েম করে আর জাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই।’ (সূরা তাওবা : ১১)। এটা প্রমাণ করেÑ মুসলিম ও অমুসলিমদের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়ক হলো সালাত। আল্লাহ আরও বলেন : ‘অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাজির, যারা তাদের নামাজ সম্বন্ধে বেখবর।’ (সূরা মাউন : ৪-৫)। ভেবে দেখুন, যেখানে আল্লাহ তায়ালা হুমকি দিচ্ছেন বেখবর নামাজিদেরÑ যারা নামাজ পড়ে তবে উদাসীনতার সঙ্গে ওয়াক্ত পার করে এবং তাড়াহুড়ো করে, তাহলে যারা নামাজ পড়েই না তাদের ব্যাপারে আপনাদের কী ধারণা? 
নামাজ ত্যাগকারীর কঠোর পরিণতি সম্পর্কে নবী (সা.) এর যেসব বাণী বিবৃত হয়েছে, তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য দীর্ঘ সেই হাদিস : ‘গত রাতে আমার কাছে দু’জন আগন্তুক এলো। তারা আমাকে উঠাল। আর আমাকে বলল, চলুন। আমি তাদের সঙ্গে চলতে লাগলাম। আমরা কাত হয়ে শায়িত এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছলাম। দেখলাম, অপর এক ব্যক্তি তার নিকট পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে ফলে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আর পাথর নিচে গিয়ে পতিত হচ্ছে। এরপর আবার সে পাথরটি অনুসরণ করে তা পুনরায় নিয়ে আসছে। তিনি আসতে না আসতেই লোকটির মাথা পূর্বের মতো ভালো হয়ে যায়। ফিরে এসে আবার অনুরূপ আচরণ করে, যা পূর্বে প্রথমবার করেছিল। তিনি বলেন : আমি তাদের (সাথীদ্বয়কে) বললাম, সুবহান্নাল্লাহ! এরা কারা? তিনি বললেন : তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। ... তিনি বলেন : আমি এ রাতে অনেক বিস্ময়কর ব্যাপার দেখতে পেলামÑ এগুলোর তাৎপর্য কী? তারা আমাকে বলল : আচ্ছা! আমরা আপনাকে বলে দিচ্ছি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তিকে যার কাছে আপনি পৌঁছেছিলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে হলো ওই ব্যক্তি যে কোরআন গ্রহণ করে তা ছেড়ে দিয়েছে। আর ফরজ সালাত ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকে।’ (বর্ণনায় বোখারি)।  

২০ জমাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত 
ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]