
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, নীতিগত অস্পষ্টতা ও প্রশাসনিক বৈষম্যের ভার বহন করে চলেছে। এই বাস্তবতায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদকে ৯ম গ্রেডে বিসিএস ক্যাডারভুক্ত করার দাবি কেবল একটি পেশাগত আন্দোলন নয়, বরং এটি একটি যৌক্তিক, কাঠামোগত ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রস্তাব।
বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শাখায় ক্যাডারভুক্ত একাধিক পদ বিদ্যমান—সহকারী প্রধান শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিদর্শক, সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার থেকে শুরু করে উপপরিচালক (মাধ্যমিক) পর্যন্ত। অথচ এই ক্যাডার কাঠামোর মূল প্রবেশদ্বার, অর্থাৎ সহকারী শিক্ষক পদটি এখনো নন-ক্যাডার অবস্থায় রয়ে গেছে।
প্রশাসনিক যুক্তির দিক থেকে এটি একটি স্পষ্ট অসংগতি। কারণ যেই যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতামূলক মানদণ্ডে বিসিএস ক্যাডার নিয়োগ হয়, সেই একই যোগ্যতায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই শিক্ষকরা যোগদানের পর বাধ্যতামূলকভাবে পেশাগত ডিগ্রি (বিএড) অর্জন করেন এবং দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে পাঠদান ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। অথচ পরবর্তীতে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনে নতুন পদ সৃষ্টি হলে, সেই পদগুলোতে প্রকল্পভিত্তিক বা অন্য ক্যাডার থেকে ধার করা জনবল বসানো হয়। এতে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের ঘাটতি থেকেই যায়। ফলাফল হিসেবে একটি বিশাল সেক্টরে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
উল্লেখযোগ্য যে, ৩৪, ৩৫, ৩৬ বিসিএসসহ একাধিক ব্যাচে কোটা জটিলতার কারণে অনেক মেধাবী প্রার্থী জেনারেল বা বোথ ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়েও ক্যাডার পদে প্রবেশের সুযোগ পাননি। অথচ একই সময়ে শিক্ষা প্রশাসনে শূন্য পদ রেখে দেওয়া হয়েছিল। এটি শুধু অবিচার নয়, রাষ্ট্রীয় মানবসম্পদের অপচয়ও বটে।
রাষ্ট্র যখন কৃষি, স্বাস্থ্য, তথ্যসহ বিভিন্ন খাতে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যাডার পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ করতে পারে, তখন বিসিএস শিক্ষা (স্কুল অ্যান্ড ইন্সপেকশন) ক্যাডারকে শক্তিশালী করতে আপত্তি থাকার কথা নয়। এখানে কলেজ ক্যাডারের সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক দাবি নেই। বরং মাধ্যমিক শিক্ষাকে স্বতন্ত্রভাবে কার্যকর করার একটি বাস্তব ও সময়োপযোগী পরিকল্পনার কথাই বলা হচ্ছে।
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে আলাদা কাঠামো দেওয়ার নীতিগত সম্মতির কথাও শোনা যাচ্ছে। এই অধিদপ্তর সফলভাবে পরিচালনার জন্য সবচেয়ে যৌক্তিক মানবসম্পদ হলো মাঠপর্যায়ে কাজ করা, প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মাধ্যমিক শিক্ষকরাই। কিন্তু যদি এন্ট্রি লেভেলেই ৯ম গ্রেড ধরে ক্যাডার পদসোপান নির্ধারণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারকে অযোগ্য ও অস্থায়ী জনবলের ওপর নির্ভর করতে হবে, যার পরিণতি হবে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সংকট।
অতএব, বিসিএস ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস–১৯৮০ অনুযায়ী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের প্রবেশ পদ ৯ম গ্রেডে উন্নীত করে চার স্তরবিশিষ্ট পদসোপান ও স্বতন্ত্র অধিদপ্তর গঠন করা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি। সরকার যত দ্রুত এই বাস্তবতা উপলব্ধি করবে, তত দ্রুতই মাধ্যমিক শিক্ষা খাত একটি টেকসই ও দক্ষ কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাবে।