ঈদযাত্রা হোক নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ১৬:৩৯ | অনলাইন সংস্করণ

  রেজাউল করিম সিদ্দিকী

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাত্রা করবে। একই সঙ্গে প্রায় এক কোটি কোরবানির পশুও ঢাকায় প্রবেশ করবে। এই বিশাল যাত্রী ও পণ্য পরিবহনকে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক করতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ঈদযাত্রাকে ঘিরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অধিকাংশই ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। যদিও যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রধান চাপ সড়কপথে পড়ে, তবুও নৌ ও রেলপথেও যাত্রীর সংখ্যা কম নয়। ঈদযাত্রা নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও আরামদায়ক করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হলেও আজকের এই নিবন্ধে মূলত রেলযাত্রা ও রেলওয়ের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে বাংলাদেশ রেলওয়ে পাঁচ জোড়া বিশেষ যাত্রীবাহী ট্রেন এবং তিনটি পশুবাহী বিশেষ ট্রেন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে ১৩ মে থেকে এবং ঈদ-পরবর্তী ফেরত যাত্রার টিকিট ২১ মে থেকে শতভাগ অনলাইনে বিক্রি করা হবে। ১৩ মে বিক্রি করা হয়েছে ২৩ মে তারিখের যাত্রার টিকিট। একইভাবে পর্যায়ক্রমে ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭ মে বিক্রি করা হবে যথাক্রমে ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ মে তারিখের যাত্রার টিকিট। অন্যদিকে, ঈদ-পরবর্তী ফিরতি যাত্রার টিকিট ২১, ২২, ২৩, ২৪ ও ২৫ মে বিক্রি করা হবে যথাক্রমে ৩১ মে এবং ১, ২, ৩ ও ৪ জুনের যাত্রার জন্য। এছাড়া ঈদের চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে ২৮, ২৯ ও ৩০ মে ২০২৬ তারিখের যাত্রার টিকিট বিক্রি করা হবে।

ঈদযাত্রাকে আরও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে রেলপথের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করতে রেলওয়ের পূর্বানুমোদন ছাড়া সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন রেলওয়ের খোলা জায়গা, রেললাইন সংলগ্ন এলাকা এবং রেলস্টেশনের প্রবেশপথে কোরবানির পশুর হাট স্থাপন করা যাবে না। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির অভ্যন্তরে পশুর হাট স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তা মৈত্রী সংঘ মাঠ সংলগ্ন নির্ধারিত এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। রেললাইনের নিকটবর্তী স্থানে পশুর হাট স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ইজারাদারকে রেললাইনের পাশ ঘেঁষে নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য ও দূরত্ব বজায় রেখে বাঁশ বা উপযুক্ত উপকরণ দিয়ে শক্ত ঘেরাবেষ্টনী নির্মাণ করতে হবে, যাতে ট্রেন চলাচলে কোনো বিঘ্ন না ঘটে এবং হাটে আগত সাধারণ মানুষের চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এছাড়া জেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে স্থানীয় পুলিশ ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ট্রেন চলাচল ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করবে। একইভাবে ঢাকা মহানগরের অভ্যন্তরে বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক, ঢাকার সার্বিক তত্ত্বাবধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে নির্বিঘ্ন ট্রেন চলাচল ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও বিশেষ পশুবাহী সেবা পরিচালনা অব্যাহত রাখা হবে।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ও এর আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঢাকা মহানগর পুলিশ ও র‌্যাবের উদ্যোগে নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করা হবে। টিকিটধারী যাত্রীদের নির্বিঘ্নে স্টেশনে প্রবেশ নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং বিনা টিকিটের যাত্রীদের প্রবেশ রোধে স্টেশনের প্রবেশমুখে আঁকাবাঁকা বেষ্টনী নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ঢাকা ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের প্রবেশপথে বাস বা অন্য কোনো যানবাহন দাঁড়িয়ে যাতে যানজট সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। স্টেশন দুটির মূল প্রবেশদ্বার ছাড়াও আশপাশের অরক্ষিত প্রবেশপথগুলো দিয়ে যাতে কেউ অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হবে এবং প্রয়োজনে অস্থায়ী বেষ্টনী নির্মাণ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পালাভিত্তিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পরবর্তী দল দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে কর্মরত দল যেন দায়িত্বস্থল ত্যাগ না করে, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সতর্কতামূলক বিষয়গুলো মোকাবিলায় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সার্বিক সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত সহায়তাও গ্রহণ করা হবে।

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ১৩ মে ২০২৬ থেকে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আন্তঃনগর ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হবে। যাত্রীদের সুবিধার্থে পশ্চিমাঞ্চলের আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট সকাল ৮টা থেকে এবং পূর্বাঞ্চলের ট্রেনের টিকিট দুপুর ২টা থেকে দেওয়া হবে। একজন যাত্রী ঈদের অগ্রিম ও ফেরত যাত্রার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ একবার করে টিকিট ক্রয় করতে পারবেন এবং প্রতি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চারটি টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে ঈদ উপলক্ষে ক্রয়কৃত অগ্রিম ও ফেরত যাত্রার টিকিট ফেরতযোগ্য হবে না। যাত্রীদের সুবিধার্থে যাত্রার দিন উচ্চ শ্রেণি ছাড়া মোট আসনের ২৫ শতাংশ দাঁড়িয়ে যাত্রার টিকিট স্টেশন কাউন্টার থেকে বিক্রি করা হবে। এছাড়া ২৩ মে ২০২৬ থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত সব আন্তঃনগর ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধ প্রত্যাহার করা হবে, যদিও ঈদের পর পুনরায় স্বাভাবিক বন্ধ কার্যকর থাকবে।

ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করতে ঈদের আগে জয়দেবপুর ও বিমানবন্দর স্টেশন থেকে ঢাকাগামী এবং ঢাকা থেকে ওই স্টেশনমুখী আন্তঃনগর ট্রেনে কোনো টিকিট দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ২৫ মে ২০২৬ থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ঢাকাগামী একতা, দ্রুতযান, পঞ্চগড়, নীলসাগর, কুড়িগ্রাম, লালমনি, রংপুর, চিলাহাটি ও বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনসমূহের বিমানবন্দর স্টেশনে যাত্রাবিরতি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঈদের তিন দিন আগে থেকে ঈদের পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত জ্বালানি তেলবাহী ট্রেন ছাড়া সব ধরনের পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হবে। যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে কয়েকটি বিশেষ ট্রেন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুর ঈদ বিশেষ-১ ও ২ এবং তিস্তা ঈদ বিশেষ-৩ ও ৪ ট্রেন ২৫ মে ২০২৬ থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত এবং ঈদের পর দ্বিতীয় দিন থেকে পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত চলাচল করবে। এছাড়া পার্বতীপুর ঈদ বিশেষ-৯ ও ১০ ট্রেন ঈদের আগে ২৪ মে থেকে ২৬ মে পর্যন্ত এবং ঈদের পরের দিন থেকে পরবর্তী তিন দিন পরিচালিত হবে। ঈদ-পরবর্তী সময়ে পার্বতীপুর বিশেষ-৯ জয়দেবপুর থেকে সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে পার্বতীপুর পৌঁছাবে। অন্যদিকে পার্বতীপুর বিশেষ-১০ রাত ১০টা ২০ মিনিটে পার্বতীপুর থেকে ছেড়ে ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে জয়দেবপুর পৌঁছাবে।

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রকৃত টিকিটধারী যাত্রীরা যাতে সহজে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ ও ট্রেনে উঠতে পারেন, সে জন্য স্টেশনের প্রবেশমুখে টিকিট যাচাই করা হবে। বিনা টিকিটে ভ্রমণ, ট্রেনের ছাদে যাত্রী পরিবহন এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন সম্পূর্ণরূপে বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি টুল বা মই নিয়ে কাউকে স্টেশনে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। ট্রেনের যাত্রা বিলম্ব হলে যাত্রীদের মুঠোফোন বার্তা ও স্টেশন ঘোষণার মাধ্যমে দ্রুত অবহিত করা হবে। এছাড়া ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’— এ ধরনের সচেতনতামূলক প্রচারণা পত্রিকায় প্রকাশ করা হবে এবং টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য মাধ্যমে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও কাউন্টার ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে টিকিট না কেনার বিষয়ে প্রচারণা চালানো হবে এবং কালোবাজারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে সহায়তা কেন্দ্র ‘১৩১’ আরও সক্রিয় রাখা, ট্রেনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং যাত্রীদের সঙ্গে দায়িত্বশীল ও সৌজন্যমূলক আচরণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় আসন্ন ঈদে রেলপথে যাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হবে।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, রেলপথ মন্ত্রণালয়
পিআইডি ফিচার