বাড়ছে বেকারত্ব, বাড়ছে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

  রাকিব হোসেন মিলন

দেশে বেকারত্বের সমস্যা দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এ সমস্যা এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু তাদের তুলনায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে অনেক কম। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরির আশায় দিনের পর দিন ঘুরছেন। কেউ কেউ হতাশ হয়ে চাকরি খোঁজাই ছেড়ে দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাস্তব চিত্র এর চেয়েও ভয়াবহ। কারণ, দীর্ঘদিন কাজ খুঁজে হতাশ হয়ে শ্রমবাজার থেকে সরে যাওয়া অনেক মানুষ বেকারের হিসাবের মধ্যে থাকেন না। আবার অনেকে নিজের যোগ্যতার তুলনায় অনেক কম মানের কাজে যুক্ত আছেন। ফলে কাগজে-কলমে বেকারত্বের যে চিত্র পাওয়া যায়, বাস্তবে সংকট তার চেয়ে অনেক বড়।

সবচেয়ে বেশি চিন্তার বিষয় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করেন। বিপরীতে নতুন চাকরি তৈরি হয় মাত্র তিন লাখের মতো। অর্থাৎ প্রতিবছর প্রায় চার লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েট কর্মসংস্থানের ঝুঁকিতে পড়ছেন। অনেক তরুণ বছরের পর বছর চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বয়স পার করে ফেলছেন। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত কম বেতনের এমন কাজে যুক্ত হচ্ছেন, যা তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দীর্ঘদিন বেকার থাকার প্রভাব শুধু একজন তরুণের জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে পরিবারে আর্থিক চাপ বাড়ে, হতাশা তৈরি হয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে। কর্মহীন তরুণদের একটি অংশ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়তে পারেন। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে তরুণদের সম্পৃক্ততার পেছনে অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাব ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বেকারত্বকে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের বড় প্রত্যাশা ছিল কর্মসংস্থান ও বৈষম্য কমানো। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় হতাশা আরও বেড়েছে। শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া, বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং নতুন ব্যবসা শুরুতে নানা বাধা কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত করছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে, বেসরকারি খাতের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগও বাড়াতে হবে।

বর্তমানে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতি নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক শান্তির জন্যও অত্যন্ত জরুরি। বেকারত্ব যত বাড়বে, হতাশাও তত বাড়বে। আর সেই হতাশা একসময় সমাজে অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই বেকারত্ব কমানোকে জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।