দেশে চালু হচ্ছে লিভার ট্রান্সপ্লান্টসহ বিশ্বমানের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সেবা

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৮ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির ৩১তম বার্ষিক সম্মেলন, বৈজ্ঞানিক সেমিনার ও প্রি-কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এই সম্মেলনে লিভার ট্রান্সপ্লানটেশন, প্যানক্রিয়াটিক স্টোনের আধুনিক চিকিৎসাসহ দেশে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি চিকিৎসায় যুগান্তকারী অগ্রগতি ও অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

আয়োজকেরা জানান, দেশে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি চিকিৎসায় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং অচিরেই লিভার ট্রান্সপ্লান্টসহ একাধিক বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা চালু হতে যাচ্ছে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সম্মানিত জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ. কে. আজাদ খান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) অধ্যাপক ডা. মোঃ সায়েদুর রহমান, বিএমইউর মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মোঃ শাহিনুল আলম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (মেডিক্যাল এডুকেশন) অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফজিলা-তুন-নেছা মালিক।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম মোহছেন। সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ডা. দেওয়ান সাইফুদ্দিন আহমেদসহ সোসাইটির সদস্যবৃন্দ এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এতে অংশ নেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. এ. কে. আজাদ খান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিজনিত রোগসমূহকে বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক একটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়সহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নত গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং এ খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মোঃ শাহিনুল আলম তাঁর বক্তব্যে বলেন, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও লিভার রোগের চিকিৎসকরা সম্মিলিতভাবে আধুনিক চিকিৎসা, নির্ভুল রোগ নির্ণয়, প্রশিক্ষণ, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা ও ক্লিনিক্যাল অডিটের মাধ্যমে রোগ নিরাময়ে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।

এদিকে, সম্মেলন উপলক্ষে শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর বিজয় স্মরণীর মিলিটারি মিউজিয়াম এম্ফিথিয়েটারের একটি রেস্টুরেন্টে প্রি-কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।

এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেন, বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রম অবশ্যই সফল করতে হবে এবং দেশের মানুষের জন্য এই সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের রোগীদের যেন প্রতিবেশী দেশ বা বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে না হয়, সে লক্ষ্যে চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভারত বছরে পাঁচ হাজার এবং পাকিস্তান পাঁচ শতাধিক লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করে, এমনকি পাকিস্তানের একজন চিকিৎসক নিজে বারোশোর বেশি লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করেছেন। তারা পারলে বাংলাদেশও পারবে, উদ্যোগ নিতে হবে এবং চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। অনুষ্ঠানের শেষে কাওয়ালি সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা উপভোগ করেন অতিথিরা।

সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে জানানো হয়, বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটি দেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে। দেশের রোগীদের জন্য বিশ্বমানের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সেবা নিশ্চিত করতে লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনসহ একাধিক অত্যাধুনিক চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লিভার সিরোসিসসহ লিভারের বিভিন্ন ইন্ড স্টেজ রোগে আক্রান্ত রোগীদের এতদিন বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হতো, তবে সেই বাস্তবতা বদলাতে যাচ্ছে।

সোসাইটির প্রচেষ্টা ও সরকারের আন্তরিকতায় অচিরেই দেশে বড় পরিসরে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সেবা চালু হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকার লিভার প্রতিস্থাপনের অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

এছাড়া প্যানক্রিয়াটিক স্টোনের আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার ফলে জটিল অস্ত্রোপচার ছাড়াই বহু রোগী দেশে চিকিৎসা নিতে পারবেন। এন্ডোস্কপিক আল্ট্রাসাউন্ড বিষয়ে দেশের তরুণ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং আন্তর্জাতিক মানের এই সেবা ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে চালু রয়েছে।

ক্যান্সার চিকিৎসায় অঙ্গসংরক্ষণকারী আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রের ভেতরে অবস্থিত বড় আকারের প্রিক্যানসারাস পলিপ বা প্রাথমিক ক্যান্সার পেট না কেটেই চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে। ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজিস্টদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ভাসকুলার ইন্টারভেনশন চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ইআরসিপি একটি জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি এবং এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। রোগীর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিমুলেটরের মাধ্যমে ইআরসিপি প্রশিক্ষণ চালু করার লক্ষ্যে সোসাইটির উদ্যোগে ইআরসিপি সিমুলেটর সংগ্রহ করা হয়েছে।

বক্তারা বলেন, দেশে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে দেশে ও বিদেশে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন আদর্শ চিকিৎসা সেটআপ গড়ে তুলতে পারলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করলে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও লিভার রোগের চিকিৎসার জন্য আর কোনো বাংলাদেশিকে বিদেশে যেতে হবে না।