টিকাদানের ঘাটতিতে বাড়ছে ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর শঙ্কা

প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ১৭:১২ | অনলাইন সংস্করণ

ঢাকায় প্রকাশিত এক নতুন নীতিপত্রে সতর্ক করা হয়েছে, দেশে টিকাদানের ঘাটতি বাড়তে থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। সংক্রমণ কমানো, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হ্রাস এবং ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার ঠেকাতে টিকাদানকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এতে।

ওয়ান হেলথ ট্রাস্ট এবং আইসিডিডিআর,বি’র নেতৃত্বে পরিচালিত গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপের প্রকাশিত এই নীতিপত্রে বলা হয়েছে, টিকাকে শুধু সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের উপায় হিসেবে নয়, বরং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দীর্ঘমেয়াদি হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

‘বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবেলায় টিকার গুরুত্ব’ শীর্ষক নীতিপত্রটি সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং প্রাণিসম্পদ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতামত ও দেশি-বিদেশি তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।

নীতিপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত দেশে ৫৪ হাজার ৯১১ জনের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত বা সন্দেহজনক হামজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন এবং টিকা সম্পর্কে আস্থাহীনতার কারণেই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

আইসিডিডিআর,বি’র বিজ্ঞানী ও গার্প-বাংলাদেশের সভাপতি ডা. ওয়াসিফ আলী খান বলেন, সংক্রমণ কমানো ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হ্রাসে টিকা সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায়গুলোর একটি। টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা প্রতিটি সংক্রমণ ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার কমাতে সহায়তা করে। চলমান হামের প্রাদুর্ভাব দেখিয়ে দিয়েছে, টিকাদানে ঘাটতি হলে বহু বছরের অর্জন দ্রুত হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বর্তমানে অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে এ কারণে ৩ কোটি ৯০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। শুধু বাংলাদেশেই ২০২১ সালে এ ধরনের সংক্রমণ-সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৯৬ হাজার ৮৭৮। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৪৫৪ জনের মৃত্যু সরাসরি ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর কারণে হয়েছে।

নীতিপত্রে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে নবজাতকের ধনুষ্টংকার নির্মূল, পোলিও দূরীকরণ এবং জন্মগত রুবেলা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। তবে এসব অর্জন স্থায়ী ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকার আওতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। ওয়ান হেলথ ট্রাস্টের ফেলো ও অংশীদারত্ব পরিচালক ডা. আর্টা কালানক্সি বলেন, এএমআর মোকাবেলায় বৈশ্বিক উদ্যোগে এখন নজরদারির ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে, তবে রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

নীতিপত্রে সার্বজনীন শিশু টিকাদান নিশ্চিত করা, কার্যকর টিকার প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধ কৌশলে টিকাদান কর্মসূচিকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিউমোকক্কাল টিকার কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন, টাইফয়েড টিকাকে নিয়মিত কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং রোটাভাইরাস টিকা দ্রুত চালুর আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা গেলে সংক্রমণ ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমবে, একই সঙ্গে ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।