ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের সম্ভাবনা বাড়ছে: ইউনিডেক্সের এম্বেসেডর
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১৯:১৪ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের জন্য ইউরোপের বাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক খাদ্য আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ডাচ এক্সপোর্টার্স (ইউনিডেক্স)-এর এম্বেসেডর ও এডভাইজার ফোরকান হায়দার চৌধুরী। তার মতে, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নিয়মিত বাজারসংযোগ বৃদ্ধি করা গেলে ইউরোপে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের চাহিদা আরও বাড়বে।
তিনি জানান, বর্তমানে এ বাজারের আর্থিক মূল্য বছরে শত কোটি টাকারও বেশি।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই বেলজিয়ান জানান, ১৯৮৯ সালে রোল্যান্ড ইয়ানসেন একটি ছোট উদ্যোগ হিসেবে ইউনিডেক্স প্রতিষ্ঠা করেন। শোবার ঘরে একটি ফ্যাক্স মেশিন নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ এথনিক ফুড ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, রোল্যান্ড ইয়ানসেনের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মসলা আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত ছিল। তার বাবা ভারত থেকে তেজপাতা, জিরা, হলুদ ও মরিচসহ বিভিন্ন মসলা আমদানি করে নেদারল্যান্ডস হয়ে সুরিনাম, কুরাসাওসহ বিভিন্ন ডাচ অঞ্চলে রপ্তানি করতেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইউরোপে বসবাসরত অভিবাসীদের নিজ দেশের খাদ্যপণ্যের চাহিদা পূরণে ইউনিডেক্সের কার্যক্রম শুরু হয়।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দুটি প্রধান খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। একটি হলো এথনিক বাজার, যেখানে বিভিন্ন দেশের গ্রোসারি ও বিশেষায়িত দোকানে পণ্য সরবরাহ করা হয়। অন্যটি মূলধারার খুচরা বাজার, যেখানে বড় সুপারমার্কেট ও রিটেইল চেইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খাদ্যপণ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ফোরকান হায়দার চৌধুরী জানান, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ইউনিডেক্সের প্রতিষ্ঠাতা রোল্যান্ড ইয়ানসেনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে ২০০৭ সালের অক্টোবরে তিনি ‘কি অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার (ইউরোপ)’ হিসেবে ইউনিডেক্সে যোগ দেন। এর আগে, তিনি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তীতে তিনি ‘ডিরেক্টর অব সেলস’ পদে দায়িত্ব পান।
তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির সিইও আমাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন, যা এখনও অব্যাহত আছে। পারস্পরিক বিশ্বাসের এই পরিবেশ নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”
ইউনিডেক্স বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ড্রাই ফুড, পানীয় এবং হিমায়িত খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করছে। হেলসিংকি থেকে মাল্টা পর্যন্ত বিস্তৃত বাজারে প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ নেটওয়ার্ক রয়েছে।
তিনি জানান, পশ্চিম আফ্রিকার ঘানা, নাইজেরিয়া, আইভরিকোস্ট ও সেনেগাল থেকে পাম অয়েল, পাম ক্রিম, কাসাভা ও বিভিন্ন ধরনের ফ্লাওয়ার আমদানি করা হয়। এছাড়া নরওয়ে থেকে সল্টেড ফিশ (বাকালাও) এবং চীন থেকে তেলাপিয়া মাছ আমদানি করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিপণন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশি পণ্য প্রসারে নিজের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ফোরকান হায়দার চৌধুরী বলেন, তার উদ্যোগে প্রাণ, বিডি ফুড, ইফাদ ও ড্যানিশসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য ইউনিডেক্সের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে পৌঁছাতে শুরু করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ফ্রোজেন মাছ, বিভিন্ন ধরনের স্ন্যাকস এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্যও নিয়মিত আমদানি করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ইউনিডেক্স বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে এই বাজার ক্রমাগত সম্প্রসারণ করছে। এসব পণ্য শুধু এশীয়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ইউরোপে বসবাসরত আরব, আফ্রিকান এবং ইউরোপীয়দের মাঝেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
নতুন সরবরাহকারী খুঁজে বের করতে তিনি নিয়মিত বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক খাদ্য প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। দুবাইয়ের গালফ ফুড, জার্মানির আনুগা, ফ্রান্সের সিয়াল এবং থাইল্যান্ডের থাইফেক্স প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন পরিদর্শনের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ইউনিডেক্স ইউরোপভিত্তিক এশিয়ান ফুড গ্রুপের সঙ্গে একীভূত হয়ে একটি বৃহত্তর ব্যবসায়িক গ্রুপ গঠন করেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির ক্রয়ক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা এবং ইউরোপজুড়ে বাজার সম্প্রসারণের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফোরকান হায়দার চৌধুরী বলেন, “এই সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের উৎপাদকদের জন্য ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
সম্প্রতি বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রীর সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বাজারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তার ভাষ্য, বাণিজ্য মন্ত্রীর বক্তব্যে বর্তমান সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে।
ব্যবসায়িক সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে মানবিক সম্পর্ককে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন ফোরকান হায়দার চৌধুরী। তিনি বলেন, “ব্যবসা শুধু চুক্তি বা আর্থিক লেনদেনের বিষয় নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সততা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।”
তার মতে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের জন্য ইউরোপের বাজারে আরও বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
