আজ খালেদা জিয়ার জন্মদিন

গৃহবধূ থেকে আপসহীন নেত্রী

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ও অবিস্মরণীয় নাম বেগম খালেদা জিয়া। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান তিনি। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের প্রশ্নে তিনি ‘আপসহীন’ নেত্রীর উপাধি পান। আজ ১৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গড়া মা, মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক দল হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে সুদৃঢ় সাংগঠনিক কাঠামো ও জনপ্রিয়তার শেকড়ে পৌঁছে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে নানা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও সংকটের মুখে বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্বে ফিনিক্স পাখির মতো ফের ঘুরে দাঁড়িয়ে দলটিতার গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা বার বার প্রমাণিত হয়েছে।

বিএনপি’র চেয়ারপার্সন এবং দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বছর ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিদায় জানায় দেশের মানুষ।

গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রাম, আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বেগম খালেদা জিয়া ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেন। বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, নিজ কর্মগুণে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। হয়ে উঠেছেন এক জীবন্ত ইতিহাস।

বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্বের পর দলের হাল ধরেছেন তার জেষ্ঠ্য পুত্র তারেক রহমান। তিনি দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই উৎরাই, নির্যাতন, দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন পার করেছেন তারেক রহমান। নির্বাসিত জীবন কাটিয়েও তিনি দলকে সুসংগঠিত রেখে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক দীর্ঘ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২০ বছর পর আবারও জনগণের বিপুল সমর্থন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আগামীকাল ১৫ আগস্ট তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রথম জন্মদিন শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী।

জন্ম : বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশব ও শিক্ষা জীবন : বেগম খালেদা জিয়ার জন্মের পর প্রথম দুইবছর কাটে জলপাইগুড়িতে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান একটি স্বাধীন দেশ হলে তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে চলে আসেন। সেখান স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষা জীবন কাটে দিনাজপুরে। পাঁচ বছর বয়সে খালেদা খানম পুতুলকে তার বাবা দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি করান। সেখানে বেগম খালেদা জিয়া প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে এ কলেজ থেকে বেগম খালেদা জিয়া ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

প্রাথমিক জীবন : বেগম খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ফেনী জেলার বর্তমান পরশুরাম উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার উন্নতি লাভের আশায় ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে এসেছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির পর তিনি দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

গ্রেড এইটের ছাত্র ইস্কান্দার মজুমদার ১৯১৯ সালে তার বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে জলপাইগুড়িতে থাকতে গিয়েছিলেন। বর্তমানে জলপাইগুড়ি ভারতের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন এবং একটি চা বাগানে চাকরি নেন। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে চায়ের ব্যবসা শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি জলপাইগুড়ির ‘চা বাগান সমিতি’র সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেখানে ১৯৩৭ সালের ১৯ মার্চ তার সঙ্গে তৈয়বার বিয়ে হয়। তৈয়বা বর্তমান পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ীর বাসিন্দা।

এই পরিবার ‘টি-ফ্যামিলি’ নামে পরিচিত। এই দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলে, যাদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া তৃতীয়। তার মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন সমাজকর্মী। তিনি তাঁর দিনাজপুরের বাড়িতে দুস্থ মহিলাদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করতেন। বেগম খালেদা জিয়ার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই।

বিবাহ : দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় পিত্রালয়ে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা খানম পুতুলের বিয়ে হয়।

রাজনৈতিক জীবন শুরু : ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, বেগম খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেতো না।

প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। বিচারপতি সাত্তারকে অপসারণ করেন।

একদিকে দলীয় কোন্দল, অন্যদিকে বিএনপির অনেক নেতার এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগদান- এই দুই পরিস্থিতিতে বিএনপি তখন অনেকটা ছত্রভঙ্গ, বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা।

এরশাদ বিএনপির অভ্যন্তরে ভাঙন ধরানোর জন্য একের পর এক প্রচেষ্টা চালান। তখন অনেকটা আকস্মিকভাবেই রাজনীতিতে এলেন বেগম খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে আসার তার কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। বিএনপিতে ভাঙন ধরানোর সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয় বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসায়। বিএনপির নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন।

আন্দোলন ও নেতৃত্ব : দলে দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ার কঠোর সিদ্ধান্ত এবং এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কয়েকবার আটক করে তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার। সে সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদ সরকারের হাতে কয়েকজন শহীন হন। আন্দোলন দিনে দিনে বেগবান হতে শুরু করে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের দূরদর্শিতায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ৩২১টির মধ্যে ২৭০টি ছাত্র সংসদে বিজয় লাভ করে, যা গণআন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্র প্রশ্নে লড়াই সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর খ্যাতি লাভ করেন। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার জোরালো অবস্থান ছিল অতুলনীয়।

বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম নির্বাচন : ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন বেগম খালেদা জিয়া। সে নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী : ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান হন বেগম খালেদা জিয়া। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বেও একজন পথিকৃৎ নারী সরকারপ্রধান হিসেবে বিরল মর্যাদা অর্জন করেন।

১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তাঁর সরকার দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা করে। তিনি ২ এপ্রিল সংসদে সরকারের পক্ষে এই বিল উত্থাপন করেন। একই দিন তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে স্বপদে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে একাদশ সংশোধনী বিল আনেন। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে দুটি বিল পাস হয়।

গ্রেফতার ও রাজনৈতিক সংকট : ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় আসে ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাদের নানা কর্মকাণ্ড বিশেষ করে রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার তৎপরতা তখন দৃশ্যমান হয়েছিল। এক-এগারোর সরকার বড় আঘাত হানে বিএনপির ওপর। বিএনপিকে ভাঙতে চেষ্টা চালায়।

বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াকে দিয়ে দলে ভাঙন ধরানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। এ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াকে দল থেকে বহিষ্কার করে দলের প্রবীণ নেতা খন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ বেগম খালেদা জিয়ার জেষ্ঠ্যপুত্র ও বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান গ্রেফতার হন। বেগম খালেদা জিয়াকে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেওয়া হয়। তারেক রহমানকে মুক্তি দেওয়া হয় ৩ সেপ্টেম্বর। গ্রেফতারের পর যৌথবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। কারামুক্তির পর তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন ও আরাফাত রহমান কোকোকে থাইল্যান্ড পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে আরাফাত রহমান কোকো মালয়েশিয়ায় থাকতেন। সেখানে অসুস্থ হয়ে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

এক-এগারোর জেল জীবন : বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার একটি বাড়িকে সাবজেল ঘোষণা করে সেখানে তাঁকে আটক রাখা হয়। এ সময়ে তার দুই সন্তানও কারাবরণ করেন। জিয়া পরিবারের ওপর এক এগারোর জরুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্যাতন নিপীড়ন ছিল বর্ণনাতীত। পাশাপাশি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ও সাবেক মন্ত্রী ও আমলাদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। বিএনপিকে বিভক্ত করতে নানামুখী তৎপরতা চালায় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তখনও কারাবন্দী খালেদা জিয়াই ছিলেন দলীয় ঐক্যের প্রতীক।

এক এগারো পরবর্তী সংকট : ২০০৭ সালের এক-এগারো ছিল একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। দেশকে রাজনীতিশূন্য এবং জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্মূল করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের নেতৃত্বে নতুন ধরনের সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। দেশে জারি হয় জরুরি অবস্থা।

মামলা ও সাজা : ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত করে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তাঁকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। পরবর্তীকালে দুদকের আপিলে এ মামলায় উচ্চ আদালত সাজা বাড়িয়ে রায় দেয়। জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলায়ও তাঁকে দণ্ডিত করে সাজা দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ফরমায়েশি রায়, হাসিনা সরকার তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে নানা উদ্যোগ নিলেও বেগম খালেদা জিয়া অবিচল ছিলেন। বিচার বিভাগের প্রতি বিরূপ না হয়ে বরং আস্থা রেখেছেন। ফলে এসব মামলায় তিনি আপিলে খালাস পেয়েছেন।

কারাবন্দীকালীন অসুস্থতা : ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দণ্ডিত হয়ে কারাবন্দী হওয়ার পর তিনি নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেগম খালেদা জিয়া কিডনি, লিভার জনিত, ডায়াবেটিস, আর্থাইটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হন। কারা হেফাজতে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনা ভাইরাস মহামারী সংক্রমণের মুখে তাঁকে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ মুক্তি দেওয়া হয়। বিএনপিসহ অনেকের অভিযোগ বেগম খালেদা জিয়াকে পরিকল্পিতভাবে অসুস্থতার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।

আন্দোলন ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন : তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। এরই মধ্যে সকল বিরোধী দলকে বাইরে রেখে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি শেখ হাসিনা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করেন। নির্বাচনটি আমি-ডামির নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

আওয়ামী লীগ মনোনীত ও আওয়ামী দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীরাই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এরূপ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে সমর্থন ছিল। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্বসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে কারাবন্দী করা হয়।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও খালেদা জিয়ার মুক্তি : চাকরিতে কোটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে উচ্চ আদালতের এক রায়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানায় দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলন কোটা সংস্কার আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ।

আন্দোলন দমন করতে গিয়ে ওইদিন আরও কয়েকজন হত্যার শিকার হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশের ছাত্র সমাজসহ বিএনপি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সাধারণ মানুষ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনে শুরু থেকেই বিএনপি সমর্থন জানায়। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে অংশ নেয়। এ আন্দোলন দমন ও নির্মূল করতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার গণহত্যাসহ নানা নির্যাতন নিপীড়ন চালায়।

আন্দোলন রূপ নেয় প্রবল গণঅভ্যুত্থানে। একপর্যায়ে চব্বিশের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। তার সাথে ছিলেন তার বোন শেখ রেহানাও। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়।

শেখ হাসিনার সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিতর্কিত অনেক কর্মকর্তা ৫ আগস্ট-এর আগে ও পরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে দেশেও অনেকে গ্রেফতার হন। শেখ হাসিনার দীর্ঘ এ শাসনকালে কখনো মাথানত করেননি বেগম খালেদা জিয়া। তিনি গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ছিলেন অবিচল ও আপসহীন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়া শর্তসাপেক্ষ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পান।