সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগের অনন্য পথ
মোহনীয় মেরিন ড্রাইভ
গাজী মুনছুর আজিজ
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমুদ্র দর্শনে কক্সবাজার গেছেন, অথচ মেরিন ড্রাইভে ঘোরেননি, এমন পর্যটকের সংখ্যা কমই মিলবে। সত্যি বলতে কী, মেরিন ড্রাইভে না ঘুরলে সমুদ্রের প্রকৃত গর্জন আর নীল ঢেউয়ের আসল সৌন্দর্য হয়তো উপভোগের বাইরেই রয়ে যায়। কারণ সৈকতঘেঁষা মেরিন ড্রাইভে দাঁড়িয়ে নিরিবিলি শোনা যায় সমুদ্রের গর্জন, সেই সঙ্গে নীল ঢেউয়ের হাতছানি। অন্যদিকে সৈকতের বিপরীতে অরণ্যঘেরা পাহাড়। সব মিলিয়ে প্রকৃতির দারুণ মেলবন্ধন। কলাতলীর ডলফিন মোড় পার হয়ে একটু এগোলেই মেরিন ড্রাইভের শুরু। এ ড্রাইভের শুরুর দিকে হ্যাচারি জোন। এর পরই দরিয়ানগর ইকোপার্ক বা দরিয়ানগর সৈকত। এ দরিয়ানগর থেকে শুরু রামু উপজেলা। আর এখান থেকেই মেরিন ড্রাইভের আসল সৌন্দর্য শুরু। কারণ এখান থেকে ড্রাইভের পূর্ব পাশে অরণ্যঘেরা পাহাড় ও পশ্চিমে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। এ দুইয়ের মাঝেই পিচঢালা পথ। মূলত এ পথের পোশাকি নাম মেরিন ড্রাইভ।
কলাতলী থেকে বাংলাদেশের শেষ প্রান্ত টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভের দৈর্ঘ্য ৮০ কিলোমিটার। ২০১৭ সালের ৬ মে এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সড়ক বাস্তবায়ন করেছে এসডব্লিউও, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতঘেঁষা এ পথ পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ হিসেবেও স্বীকৃত। ১৯৯৩ সালে এ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু। এরপর কয়েক ধাপে এর উন্নয়ন চলে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারের কলাতলী থেকে উখিয়ার ইনানী সৈকত পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ইনানী থেকে টেকনাফের শীলখালী পর্যন্ত ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে নির্মাণ করা হয় আরও ২৪ কিলোমিটার সড়ক। এরপর শীলখালী থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত তৈরি করা হয় আরও ৩২ কিলোমিটার পথ।
আগে কক্সবাজার-টেকনাফ আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে সময় লেগেছে আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা। এখন মেরিন ড্রাইভ দিয়ে লাগে ১ থেকে সোয়া ১ ঘণ্টা। এ সড়কের কল্যাণে আশপাশের মানুষের ভাগ্য বদলও হয়েছে। ড্রাইভ হওয়ায় এখানকার জমির দাম বেড়েছে বহুগুণ। সুগম হয়েছে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার পথও। এছাড়া সরকার টেকনাফের সাবরাং সৈকতকে ঘিরে গড়ে তুলছে বিশেষ পর্যটনপল্লি। অন্যদিকে টেকনাফের নাফ নদের মাঝখানে রয়েছে অনন্য সৌন্দর্যের ‘জালিয়ারদিয়া’ দ্বীপ। আর এ দ্বীপকে ঘিরে সরকার ‘ট্যুরিজম পার্ক’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভিড় জমাবে টেকনাফে। ফলে দেশের পর্যটন শিল্প যেমন ডানা মেলবে বিশ্ব দরবারে, তেমনি ঘুরবে অর্থনীতির মোড়।
জালিয়ারদিয়া দ্বীপে থাকবে ওয়াটার স্পোর্টস, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পাহাড় থেকে নদীতে নামার কেবল কার ও শপিং মল। দেশীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করেই সাজানো হবে এ পর্যটনপল্লি। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের শতভাগ নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হবে। আর এসব ক্ষেত্রে মেরিন ড্রাইভের ভূমিকা অগ্রণী।
দরিয়ানগর থেকে পথের পাশের বিদ্যুতের কিছু খুঁটিতে শিল্পকর্ম আঁকা হয়েছে। পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে এ উদ্যোগ নিয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এছাড়া হিমছড়ি যাওয়ার আগে পথের পাশের পাহাড়ে দুই-একটি ঝরনা আছে। অবশ্য বর্ষা ছাড়া অন্য সময় এতে পানি কম থাকে। অন্যদিকে হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান বরাবর পশ্চিমে গাছগাছালি না থাকায় এখান থেকে সমুদ্র পুরোপুরি দেখা যায়। বলা যায়, একেবারে পথঘেঁষা সমুদ্র।
কক্সবাজার থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে হিমছড়ি সৈকত। এ স্পটে আছে পাহাড়ি ঝরনা, পাহাড়ে উঠে পাখির চোখে সৈকত দেখার সুযোগ, নানা পণ্যের দোকান, রেস্টুরেন্ট ও টি-স্টল। এসব রেস্টুরেন্টে বসে চা-কফি বা দুপরের খাবার খেতে খেতে সৈকত উপভোগ করা যাবে ভিন্ন মাত্রায়।
হিমছড়ি পার হলে উত্তর হিমছড়ি, কাঁকড়া বিচ ও পেঁচার দ্বীপ। পেঁচার দ্বীপে পথের পাশে মারমেইড ক্যাফে। চমৎকার এ ক্যাফেতে বসে চা-কফি খেতে চোখ রাখা যাবে সৈকতের সৌন্দর্যে। এর পরে করাছিপাড়া। এখানে আছে মারমেইড বিচ রিসোর্ট। সৈকতঘেঁষা এ রিসোর্ট থাকার জন্য দারুণ। এরপর মংলাপাড়া। এ পথের দু’পাশে গাছগাছালির অনেক বাগান। এর মধ্যে সুপারির বাগান, পানের বরজ বেশি। এছাড়া শীত মৌসুমে এ পথের পাশে স্থানীয়রা তাদের খেতের তরমুজ নিয়ে বসেন। সমুদ্রের পাড়ে যে জমি আছে, সে জমিতে চাষ করা হয় ছোট আকৃতির এ তরমুজ। মেরিন ড্রাইভে ঘুরতে আসা পর্যটকরা এ তরমুজ খান। আবার অনেকে সৈকতপাড়ে চাষ করা শসা নিয়েও বসেন পর্যটকদের জন্য।
মংলাপাড়া হয়ে এগোলে রেজু খাল। খালপাড়ে আছে মারমেইড ইকো রিসোর্ট। খালের সেতু পার হয়ে এগোলে পশ্চিমে সমুদ্রঘেঁষা বিশাল ঝাউবাগান। বাগানঘেঁষে পথের পাশে বিক্রেতারা ডাব ঝুলিয়ে বসেন। পর্যটকরা এ পথে যাতায়াতের সময় এখানে থেমে ডাব খান। ঝাউবাগান পার হয়ে এগোলে দু’পাশে গাছগাছালিতে ঘেরা পথটি যেন সবুজময়। এ পথ ধরে কিছুটা এগোলে পশ্চিমে সমুদ্রের ঢেউয়ের খেলা, মাছধরার নৌকা, সঙ্গে ঢেউয়ের গর্জন। এ গর্জন শুনতে শুনতে সোনারপাড়া, চরপাড়া, নিদানিয়া হয়ে ইনানী বিচ। ইনানী এলাকায় আছে আবাসিক হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ নানা পণ্যের দোকান। সব মিলিয়ে সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য মেরিন ড্রাইভ সত্যিই অনন্য।
কলাতলী মোড় থেকে ভাড়ায়চালিত জিপ বা অটোরিকশায় মেরিন ড্রাইভে বেড়ানো যায়। ঘণ্টা বা দিন হিসেবে এসব বাহন ভাড়ায় মেলে। কেউ কেউ সাইকেলে বা বাইকেও এ পথে বেড়ান। তবে সম্প্রতি পর্যটকদের সুবিধায় মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ভাড়ায়চালিত বাইক চালু হয়েছে। বিবাইক নামের এ বাইক ভাড়া নিয়ে পর্যটকরা মেরিন ড্রাইভ বা কক্সবাজারের আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরতে পারবেন। মূলত বিবাইক থেকে ঘণ্টাভিত্তিক স্কুটার ভাড়া নেওয়া যাবে। ভাড়া প্রথম ঘণ্টা ১৫০ টাকা ও পরবর্তি ঘণ্টা ১০০ টাকা। বিবাইক সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে http://bbike.com.bd ওয়েবসাইটে। আর অ্যাপ ডাউনলোড করা যাবে গুগল প্লে স্টোর থেকে।
হছবি : লেখক
