ভ্রমণ
দক্ষিণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

বরিশালগামী জাহাজে উঠলাম রাত আটটায়। বেশ কয়েকদিন ছুটির ফাঁদে দেশ। তাই টার্মিনালে যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড়। কেবিন পাবতো দূরে থাক, ডেকে বসার মতো জায়গাও নেই। বাধ্য হয়ে দ্বিগুণ ভাড়ায় স্টাফ কেবিনে আশ্রয় নিলাম। হুইসেল ছেড়ে রাত নয়টায় ছাড়ল জাহাজ। সঙ্গী রফিক, সৌরভ ও বশির। ভ্রমণকালীন স্বভাবসূলভ অভ্যাস অনুযায়ী জাহাজের উপর, নীচ, ছাদ সব জায়গা ঘুরেঘুরে দেখি। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি মানুষের জীবনমান। এ দেখার মাঝেও ভ্রমণের অন্যতম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়ে থাকে। ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়। জ্ঞানপ্রসারেরও মাধ্যম। ঘন্টা দুই পরে কেবিনে চলে আসি। ভোর প্রায় ৫টায় জাহাজ ভিড়ল বরিশাল ঘাটে। এরপর নানান কিসিমের যানবাহন বদলি করতে করতে তালতলী।
দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুদের জন্য আগেই অপেক্ষমাণ ছিলেন বরগুনার আরিফুর রহমান। প্রথমেই তিনি নিয়ে গেলেন ছাতন পাড়া রাখাইন পল্লী। খুবই সুন্দর পরিপাটি বাড়িঘর। পাড়াতে রয়েছে ধর্মীয় উপাসনালয়। এর নাম- জেয়ারামা শ্রীমঙ্গল শনি প্যাগোডা। পুরো উপাসনালয়টি চকচকে গোল্ডেন কালারে আচ্ছাদিত। যথাযথ সম্মান প্রদর্শন পূর্বক কিছুক্ষণ চলল ফটোসেশন। এরপর মটর বাইকে ছুটলাম নিদ্রা সমুদ্র সৈকত। সল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাই। গিয়েইতো চোখ ছানাবড়া। মাথা পুরোই নষ্ট। এত সুন্দর সমুদ্র সৈকত নিদ্রা। অথচ এ দেশের মানুষ আমরা চোখ মেলেই নিদ্রায় [ঘুমে] আছি। অসম্ভব সুন্দর সৈকতে নগ্ন পায়ে হেঁটে বেড়াই। দূর্বা ঘাসগুলো যেন সবুজ কার্পেটের মত বিছিয়ে রয়েছে। সৈকতের পাড়টা প্রাকৃতিকভাবেই খাঁজ কাটা। ছবিতে কেউ দেখলে প্রথমেই ভেবে নিবে জায়গাটা সীতাকুন্ডের গুলিয়াখালী। তবে ওর চাইতেও অনেক বেশি নয়নাভিরাম নৈসর্গীক। কেওড়া ও ছৈলা গাছের সারি বাড়তি সৌন্দর্যের পসরা মেলেছে। সেই পসরার ঝাপিতে আমরা হ্যামোক ঝুলিয়ে দোল খাই। পায়রা, বিঁষখালী ও বলেশ্বর- এ তিন নদীর মোহনায় নিদ্রা সমুদ্র সৈকত । প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের মুগ্ধতার রেশ গিয়ে পড়ল, ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের মাঝে নিজেদেরকে সমর্পণের মাধ্যমে। একচোট হলো জলকেলি। এরপর উঠেই ছুটলাম ফকিরের হাট। যেতেযেতে আবহমান বাংলার রূপ দেখি। হাত বাড়ালেই গাছে গাছে ঝুলে থাকা টসটসে পাকা খেজুর। তাল বৃক্ষের সমারোহ। সোদা মাটির গন্ধ। সারিসারি জেলে নৌকার বহর। এককথায় অসাধারণ এক গ্রামীণ পরিবেশ। শহুরে মানুষদের জন্য অনন্য। ফকিরের হাট বাজারে দুপুরের আহার সেরে ছুটলাম এবার শুভ সন্ধ্যা সৈকতের পথে।
ডিসি পয়েন্ট পৌঁছে ছোট্ট একটা খাল পাড় হয়ে শুভ সন্ধ্যা সৈকতে গিয়ে উঠি। ওয়াও! ঝাউগাছ আর ঝাউ গাছ। বালুকাময় সৈকত। একপাশে বিশাল জলরাশি, আরেক পাশে সতেজ সবুজ ঝাউবন। বিশেষ করে কক্স, সেন্টমার্টিন সৈকতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সাগর লতা এখানে প্রচুর। এরকম মনোরম দৃশ্য দেহমনে বেশ প্রশান্তি এনে দেয়। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের চেয়েও অনেক বেশি প্রাপ্তির আনন্দে আমরা দক্ষিণের দিকে আরো আগাতে থাকি। হাঁটতে হাঁটতে ঝাউবন ছাড়িয়ে অদ্ভুদ আকৃতির গাছপালা ঘেরা এক জঙ্গলের দেখা পাই। বিস্ময়ে চোখ চকচকে। সৈকত ছেড়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ি। যতোই এগিয়ে যাই ততোই যেনো একটা ভৌতিক পরিবেশ ঘিরে ধরে। সত্যিই রোমাঞ্চকর অনুভূতি। স্থানীয়দের সুত্রে জানা যায় এ জঙ্গলটার কেতাবি কোন নাম নেই। এখানে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে বন্য গাছ। এরমধ্যে শৈলা, কেওড়া, জিলাপি, বাইন, সুন্দরী ও শিশু গাছ। গাছগুলোর ডালপালা এতোটাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যে, দিনের আলো সেখানে প্রায় মলিন। শুভ সন্ধ্যা সৈকত প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ। এরমধ্যে প্রায় দুই কিলো হেঁটে নিদ্রার পথ ধরি। সূর্যাস্ত ও সূর্যদোয় দেখার পর, রাতে সেখানেই তাঁবু গাড়ব।
