রূপচর্চায় চন্দনের ব্যবহার

রাজপ্রাসাদের সুগন্ধি কক্ষ থেকে আজকের প্রসাধনীর আয়না- চন্দনের যাত্রা যেন সৌন্দর্যেরই এক দীর্ঘ ইতিহাস। বিশ শতকের শুরুতে মাইসোরে চন্দন তেল ও সাবান শিল্পের বিকাশ তার আভিজাত্যকে পৌঁছে দেয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। আজ বিজ্ঞান তার সুবাসের রাসায়নিক রহস্য খুঁজছে, আর সৌন্দর্যশিল্প খুঁজে চলেছে সেই চিরন্তন মুগ্ধতার নতুন ভাষা। লিখেছেন- সোমা ঘোষ মণিকা

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রূপচর্চায় চন্দনের ফেসপ্যাক : চন্দনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঘরোয়া ব্যবহার হলো- মুখের প্রলেপ বা ফেসপ্যাক। তবে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও ত্বকের ধরন, অ্যালার্জির ইতিহাস এবং ব্যবহারের পরিমাণ বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

চন্দন ও গোলাপজলের ফেইসপ্যাক : এক চা-চামচ চন্দনগুঁড়ার সঙ্গে প্রয়োজনমতো গোলাপজল মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করা যায়। মুখ পরিষ্কার করে ১৫-২০ মিনিটের জন্য লাগিয়ে শুকিয়ে এলে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে পারেন। গরম আবহাওয়ায় এটি ত্বকে সতেজ ও শীতল অনুভূতি দিতে পারে।

চন্দন ও অ্যালোভেরা : চন্দনগুঁড়ার সঙ্গে বিশুদ্ধ অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে কোমল প্রলেপ তৈরি করা যায়। শুষ্ক বা রোদে থাকার পর অস্বস্তিকর অনুভূত ত্বকে এটি আরামদায়ক মনে হতে পারে। তবে অ্যালোভেরায় কারও অ্যালার্জি হতে পারে। তাই এই প্যাকটি ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।

চন্দন ও দই : অল্প চন্দনগুঁড়ার সঙ্গে সাধারণ দই মিশিয়ে প্রলেপ তৈরি করা যায়। দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিড ত্বকের ওপর মৃদু রাসায়নিক পরিশোধনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালা হলে সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে ফেলতে হবে।

 

চন্দন ও মধু : চন্দনগুঁড়ার সঙ্গে সামান্য মধু মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। মধু ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে নতুন উপাদান ব্যবহারের আগে ত্বকের ছোট অংশে পরীক্ষা করা ভালো।

চন্দন ও বেসন : চন্দনগুঁড়া, অল্প বেসন এবং পানি বা উপযুক্ত তরল দিয়ে পেস্ট তৈরি করা যায়। এটি ত্বক পরিষ্কার করার অনুভূতি দিতে পারে। কিন্তু মুখে শক্ত করে ঘষাঘষি করা উচিত নয়।

চন্দন ও হলুদ : অল্প চন্দনের সঙ্গে সামান্য হলুদ মিশিয়ে ঐতিহ্যবাহী মুখের প্রলেপন তৈরি করা যায়। হলুদের কিছু প্রদাহ নিয়ন্ত্রণকারী বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে অতিরিক্ত হলুদ ব্যবহার করলে ত্বকে সাময়িক হলুদাভ দাগ পড়তে পারে। মুখের প্যাক সাধারণত অল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করাই ভালো। চোখের চারপাশ, কাটা বা ক্ষতস্থান এবং সক্রিয় ত্বকের প্রদাহের ওপর ব্যবহার করা উচিত নয়। সপ্তাহে এক বা দুইবারের বেশি ব্যবহারের প্রয়োজনও সাধারণত নেই।

চন্দনের অতিরিক্ত ব্যবহার কুফল ও সতর্কতা : চন্দন সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশেষ করে চন্দন তেল একটি অপরিহার্য তেল হওয়ায় সংবেদনশীল ত্বকে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে। ডার্মাটাইটিস রোগীদের ওপর পরিচালিত একটি বড় বিশ্লেষণে পরীক্ষিত অপরিহার্য তেলগুলোর মধ্যে চন্দন তেলের ক্ষেত্রেও ত্বকের পরীক্ষায় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক হওয়া মানেই অ্যালার্জিমুক্ত নয়। চন্দন ব্যবহারের পর কারও কারও ত্বকে চুলকানি, লালভাব, জ্বালা বা শুষ্কতা দেখা দিতে পারে। তাই প্রথমবার ব্যবহার করার আগে গলায় বা হাতের ত্বকের ছোট অংশে পরীক্ষা করা নিরাপদ। খাঁটি অপরিহার্য চন্দন তেল সরাসরি মুখে ব্যবহার না করে উপযুক্ত প্রসাধনীতে ব্যবহার করাই ভালো। চোখের চারপাশ, কাটা জায়গা ও ক্ষতস্থানে ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিত।

 

চন্দনের সুফল, ঐতিহ্য বনাম বিজ্ঞান : চন্দনের সৌন্দর্যচর্চায় সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এর প্রধান আকর্ষণ হলো- সুবাস, শীতল অনুভূতি এবং প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহারের বহুমুখিতা। চন্দন তেলের কিছু সম্ভাব্য প্রদাহ নিয়ন্ত্রণকারী ও জীবাণুরোধী বৈশিষ্ট্য গবেষণায় দেখা গেছে। এ কারণে ত্বকের কিছু সমস্যায় এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে বৈজ্ঞানিক আগ্রহ রয়েছে তবে, এর পাশাপাশি চন্দনের সুবাস মানসিকভাবে আরামদায়ক অনুভূতি তৈরি করতে পারে। সুগন্ধি শিল্পে চন্দনের দীর্ঘস্থায়ী ঘ্রাণ তাই বিশেষ মূল্যবান। তবে সম্ভাব্য উপকার আর প্রমাণিত চিকিৎসা এক নয়। চন্দন ব্রণ, একজিমা, সোরিয়াসিস, দাগ বা অন্য কোনো ত্বকের রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা, এমন দাবি করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। তবে এটি অনেকাংশে সত্য যে চন্দন ব্যবহারে ত্বকের রক্ত চলাচল বাড়ে, মৃত কোষ দূর হয়।

আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় শ্বেতচন্দন ও রক্তচন্দনের ব্যবহার : আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় চন্দন শুধু সুগন্ধি কাঠ নয়, বরং বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উপাদান। বিশেষ করে শ্বেতচন্দন ও রক্তচন্দন বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ও ভেষজ প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে দুটি চন্দনের উদ্ভিদগত পরিচয় ও ব্যবহার এক নয়। শ্বেতচন্দনকে আয়ুর্বেদে শীতল প্রকৃতির ভেষজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চন্দন কাঠ ঘষে ঘষে তৈরি প্রলেপ ত্বকে লাগানোর প্রচলন রয়েছে।

শরীরের অতিরিক্ত উত্তাপ, ত্বকের জ্বালা, অস্বস্তি ও কিছু প্রদাহজনিত সমস্যায় এর বাহ্যিক ব্যবহার ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত। চন্দনের সুগন্ধ মনকে প্রশান্ত করতে সহায়ক বলেও আয়ুর্বেদিক ধারণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। চন্দনের কাঠ থেকে তৈরি তেল সুগন্ধি, ত্বকের পরিচর্যা এবং বিভিন্ন ভেষজ প্রস্তুতিতেও ব্যবহৃত হয়।

রক্তচন্দন, শ্বেতচন্দন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্ভিদ। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এর কাঠের গুঁড়া ও নির্যাস বিভিন্ন ভেষজ প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয়। ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা, ক্ষতস্থানের বাহ্যিক পরিচর্যা এবং শরীরের অতিরিক্ত উত্তাপ প্রশমনের উদ্দেশ্যে এর ব্যবহার প্রচলিত। অনেক সময় অন্যান্য ভেষজের সঙ্গে মিশিয়েও রক্তচন্দন ব্যবহার করা হয়। তবে চন্দনের ঔষধি গুণ সম্পর্কে প্রচলিত সব দাবি আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সমানভাবে প্রমাণিত নয়। বিশেষ করে মুখে খাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে চন্দন ব্যবহার করা নিরাপদ নয়। সঠিক প্রজাতি, পরিমাণ ও প্রস্তুতপ্রণালি নিশ্চিত করে যোগ্য আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ।