ভ্রমণ

পাহাড়ের কান্না নাকি প্রকৃতির সৌন্দর্য

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মোহাম্মদ আবদুল্লাহ্‌

অলিখিত একটি প্রবাদ আছে, ভ্রমণপ্রেমী মানুষ কখনও খারাপ হয় না। আক্ষরিক অর্থে, প্রকৃতির বিশালতা যারা দেখতে থাকেন, তারা সংকীর্ণ চিন্তা করতে পারেন না বলেই উদার এবং বিনয়ী মানসিকতার হন। ছুটির দিন কার না মন চায় বেড়াতে? নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা ফেলে ঝরনাজলে ভিজতে কার না ভালো লাগে। রূপ-লাবণ্যের বাংলাদেশে পাহাড়-নদী সবুজ-শ্যামল সৌন্দর্য হাতছানি দেয় ভ্রমণপিপাসুদের। বিপজ্জনক ঝিরিপথ দিয়ে কারুকার্যমণ্ডিত দুর্গম পাহাড়ের অন্দরমহলে গুপ্ত এক অমূল্য ঐশ্বর্য হলো পাহাড়ি ঝর্ণা। হাজার বছরের প্রাকৃতিক ঘাত-অপঘাতের চিহ্নগুলো আড়াল করে অভিকর্ষের কাছে নিজেকে সঁপে দেয় প্রস্রবণগুলো। মুক্ত বিসর্জনের এ শব্দে সেই অপঘাতে সৃষ্ট খাদগুলোতে শোনা যায় মহাকালের ফিসফিসানি। যেন প্রকাণ্ড সফেদ পর্দার অন্তরালে লুকানো পাহাড়ের কান্না। কখনও বা স্বচ্ছ স্নিগ্ধ ধারায় অনাবৃত হয়ে পড়ে অমসৃণ কলেবর। ঠিক এমনি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সন্ধান দিতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম সুউচ্চ প্রাকৃতিক ঝর্ণা বাকলাই।

বাংলাদেশের পাহাড়প্রেমীদের কাছে বান্দরবানের থানচি উপজেলাটি সর্বাধিক পরিচিত। এই অঞ্চলেরই নাইটিং মৌজার বাকলাই গ্রামের মধ্যমণি প্রায় ৩৮০ ফুট উঁচু বাকলাই জলপ্রপাত। এই বাকলাই আর লিলুক বা লাংলোক নামে থানচিরই আরেকটি ঝর্ণার সঠিক উচ্চতা নিয়ে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ ঝর্ণার খেতাব নিয়ে মত পার্থক্য থাকলেও সৌন্দর্যের দিক থেকে বাকলাই ঝরনা এগিয়ে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পাহাড় কেওক্রাডং ও তাজিংডং-এর মাঝেই এই ঝরনার অবস্থান। রুমা থেকে ১১০ কিলোমিটার এবং থানচি থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূর থেকে স্পষ্ট চোখে পড়ে এই ঝর্ণা। স্থানীয়দের অনেকে একে বাক্তালাই ঝর্ণা নামেও অভিহিত করেন। মাত্রাতিরিক্ত ভয়াবহ পাহাড়ি রাস্তা থাকায় এবং যথেষ্ট উদ্যোগের অভাবে খুব কম পর্যটকই এই ঝরনার একদম পাদদেশ পর্যন্ত যেতে পারেন। এই ঝরনা দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল কিছুদিন আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটা পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবছর সরকারি ছুটির দিনে হাজার হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে এখানে। এখানকার প্রতিটি পরতে আছে প্রকৃতির অনাবিল প্রশান্তি। চারদিক পাহাড় আর সবুজ মুগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছে। ঝরনাধারায় গা ভিজিয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ থেকে মুক্ত করতে পারবে। আলীকদম থেকে চাঁদের গাড়িতে করে থানচি বাজারে যাওয়া লাগবে ঐখান থেকে লোকাল গাইড নিয়ে বাকলাই গ্রামের পাশ দিয়ে ঝরনার পথ। এখানে যাওয়ার পথে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় কয়েকটি ভিউ পয়েন্ট পাবেন, যেখানে কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন অদৃশ্য মায়ায়। সাধারণত সারা বছর এখানে মানুষের আনাগোনা থাকে। প্রতিবছর বিভিন্ন ছুটির দিনে পাহাড়প্রেমী অসংখ্য পর্যটকের আগমন ঘটে এখানে। এখানকার প্রতিটি পরতে আছে প্রকৃতির অনাবিল প্রশান্তি। চারদিকে পাহাড় আর সবুজ মুগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছে। ঝরনাধারায় গা ভিজিয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ থেকে নিজেকে খানিকটা মুক্ত করতে পারবে।

নিজেদের একটু উজ্জীবিত করতে আমরা ৯ জনের টিম (আবদুল্লাহ্‌, মারুফ,শফিক, আকাশ, কাফি, তাওহিদ, আবু তালেব, রুমেল, কাউসার ভাই) বেরিয়ে পড়লাম সেই গন্তব্যে। এ যাত্রায় আমাদের কয়েকজন বন্ধুদের অনেক মিস করেছি বিশেষ করে রাশেদ, সাখাওয়াত, মিশু, রাফি, ফাহাদ, ফারুক, হারুন প্রতিবার তারা আমাদের টিমের সদস্য হয়। ভোরে উঠে হোটেল থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে চাঁদের গাড়িতে করে রওনা দিলাম মূল গন্তব্যের দিকে। যাত্রা পথে আলীকদম বাজার থেকে সকালের নাস্তা সংগ্রহ করে নিলাম। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ি চলছে, আমাদের মনে হচ্ছে যেন মেঘের মধ্য দিয়ে আমাদের গাড়ি ভেদ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে, আপনি যখন ডিম পাহাড় পাড়ি দেবেন তখন এই অনুভবটা আরও বেশি হবে।

এর আগেও ডিম পাহাড়ে গিয়েছিলাম কিন্ত এবার আমরা মেঘের দেখা বেশি পেয়েছি কারণ আমরা তাড়াতাড়ি ঐখানে পৌঁছাতে পেরেছি। এবারের যাত্রার একটি স্মরণীয় ঘটনা হচ্ছে যাওয়ার পথে রাস্তায় পাহাড় ধস্‌ হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিল। আমাদের ড্রাইভার সালাউদ্দিন বিষয়টি সেনাবাহিনীকে জানিয়ে রেখেছেন দেখলাম ওনারা আসতে আসতে অনেক সময় লাগবে সেই জন্য হাল্কা কিছু পাথর নিজেরা সরিয়ে আবারও যাত্রা শুরু করলাম। মূল ঝরনায় যাওয়ার আগে কয়েকটি ভিউ পয়েন্টে গাড়ি থামিয়ে নিজেরা কিছু সময় উপভোগ করলাম।

আমরা ভোরেই রওনা দিয়েছিলাম, তাই তেমন কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি। অবশ্যই ওদিকে যাওয়ার সময় সেনাবাহিনীর খাতায় এন্ট্রি করে যেতে হবে। তাই আপনার ভ্রমণে জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি সঙ্গে রাখতে ভুলবেন না। গাড়িতে গান আর আড্ডা দিতে দিতে কখন যে আমরা পৌঁছেছি, টেরই পাইনি। আমরা চেষ্টা করেছিলাম একেবারে বাংলাদেশের সর্ব্বোচ্চ পাহাড় তাজিংডং যাওয়ার কিন্তু প্রশাসনের অনুমতি ছিল না তাই যাওয়া সম্ভব হয় নাই।

মূল ঝরনায় পৌঁছাতে হলে ২/৩ ঘন্টা হেঁটে অন্তত ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার যেতে হবে। সবাই নেমে লোকাল গাইডের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী সেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। কারও হাতে ছোট ছোট বাঁশ, আবার কারও হাতে ছোট লাঠি। এটা নেওয়ার একমাত্র কারণ, যাতে হাঁটার সময় একটু শক্তি সঞ্চার হয়। পাহাড়ের পর পাহাড়, একটি পাড়ি দিয়ে আবার পাহাড়! প্রতিবারে মতো আমাদের এই পাহাড়যাত্রার আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেয় সঙ্গে থাকা ছোট সাউন্ডবক্স। ক্লান্তি অনুভব করলে সবাই মিলে গান গেয়ে নাচানাচি করে চাঙা হয়েছি।

পাহাড়ি ঝিরিপথ দিয়ে হাঁটার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ পা পিছলে পড়েও গিয়েছিল, তবে এবারের যাত্রা ছিল অনেক ভয়ঙ্কর কারণ আমাদের টিমে ২জন ছিল একদম নতুন বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন রুমেল আর কাফি। এ যাত্রায় পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনেক ধারণা হয়েছে। উঁচু পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট দোচালা স্কুলে পড়াশোনা করছে পাহাড়ি ছেলেমেয়ে। অসাধারণ এ পাহাড়যাত্রার সবকিছু ছিল আমাদের জন্য নতুন এবং আনন্দদায়ক। কৌতূহলোদ্দীপকও। সেখানকার পাহাড়িদের জুমচাষ, তাদের জীবনযাপন— সবকিছু মিলিয়ে পাহাড়ের যাত্রাটি ছিল অসাধারণ ও ভয়ঙ্কর।

মূল যাওয়ার পথে ছোট একটি ঝরনা দেখতে পাবেন।

তবে মূল ঝরনায় যাওয়ার জন্য একটি পাহাড় পাড়ি দিয়ে একটু ঝিরিপথ, আবার সেই পাহাড়। যাওয়ার পথ এত কঠিন ছিল যে আমাদের মধ্য থেকে রুমেল মাঝ পথে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। তবে এটি করার প্রয়োজন হয় নাই লোকাল গাইড আর সকলের সহযোগিতায় পৌঁছাতে পেরেছি। এ পথে দেখা যাবে পাহাড়িদের জুমচাষ, বাঁশের বাগান, পাহাড়ি বিভিন্ন ফল, আর পাহাড়ি কলা গাছ। অবশ্যই যাওয়ার সময় সঙ্গে শুকনা খাবার নিয়ে যেতে হবে। এখানে খাবার পাওয়া যায় না কারণ যাওয়ার পথে কোন ধরণের দোকান নেই।

ঝর্ণার কাছাকাছি পৌঁছার পর এর অপরিমেয় উচ্চতা দেখে অভিযাত্রীদের রীতিমতো ভিরমি খাওয়ার দশা হয়। অত উচ্চতা থেকে নিচের পাথরে পানির তীব্র বেগে আঁছড়ে পড়ার শব্দ মনে সঞ্চার করে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। এ প্রাকৃতিক বিষয়ের কাছে নিজেকে এবং জাগতিক জীবনের সমস্যাগুলোকে মনে হয় ক্ষুদ্র। প্রায় তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে প্রধান ঝরনার দৃশ্য দেখে সবার ক্লান্তি নিমেষে দূর হয়ে যায়। আমরা এতটা মজার সময় কাটিয়েছি যে ভুলেই গিয়েছিলাম আমাদের আবার ফিরতে হবে।