ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই বাড়তি সচেতনতা
ডেঙ্গু মানেই শুধু মশারি টাঙানো বা মশা মারার ওষুধ ছিটানো নয়। বরং ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার জন্মানোর সুযোগ বন্ধ করা এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা। বাড়ির ভেতর, ছাদ, বারান্দা কিংবা আশপাশে অল্প পরিমাণ স্বচ্ছ পানিও এডিস মশার প্রজননস্থল হতে পারে। তাই নিজের ঘরটাকেই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধক হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। লিখেছেন— নাদিয়া আফরিন
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সময়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, শুধু পূর্ণাঙ্গ মশা নিধন নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস বা উৎস নির্মূলই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সপ্তাহে এক দিন মশামুক্তি অভিযান : সপ্তাহে অন্তত এক দিন পরিবারের সবাই মিলে ১০-১৫ মিনিট বাড়ির ভেতর ও বাইরে খুঁজে দেখুন কোথাও পানি জমে আছে কি না। ফুলের টব ও টবের নিচের পাত্র, বালতি, ড্রাম, বোতল, কৌটা, পরিত্যক্ত টায়ার, নারকেলের খোসা, প্লাস্টিকের প্যাকেট, খেলনা কিংবা যেকোনো ছোট পাত্রে জমে থাকা পানি ফেলে দিন। মনে রাখতে হবে, 'সামান্য পানি' মানেই নিরাপদ— এমন নয়। এডিস মশা অল্প পরিমাণ স্বচ্ছ পানিতেও ডিম দিতে পারে।
পানি ফেলে দিয়ে কাজ শেষ নয় : কোনো পাত্রে পানি জমে থাকলে শুধু পানি ফেলে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। পাত্রের গায়ে মশার ডিম লেগে থাকতে পারে। তাই পানি ফেলার পর পাত্রটি ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করে শুকিয়ে রাখা ভালো। পানির ড্রাম, বালতি কিংবা ট্যাংক ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখুন। যেসব পাত্র নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না, সেগুলো উল্টে রাখুন, যাতে বৃষ্টির পানি জমতে না পারে।
ফ্রিজ ও এসির পানিও দেখুন : এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল শুধু বাইরে নয়, ঘরের ভেতরেও থাকতে পারে। ফ্রিজের নিচের ট্রে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের পানি জমার স্থান, ফুলের টবসহ এমন জায়গাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ফ্রিজ ও এসির জমা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত।
ছাদবাগানে বাড়তি সতর্কতা : ছাদবাগান থাকলে প্রতিটি টব ও টবের নিচের পাত্র নিয়মিত পরীক্ষা করুন। বৃষ্টির পর টবের নিচে পানি জমে থাকলে তা ফেলে দিন। ছাদে পড়ে থাকা বোতল, বালতি, ডাবের খোসা, ভাঙা টব বা অন্য কোনো পাত্রও সরিয়ে ফেলুন।
কমোড ও পানির পাত্রও নজরে রাখুন : বাড়ির এমন জায়গা, যেখানে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকতে পারে, সেগুলোও বাদ দেওয়া যাবে না। কম ব্যবহৃত কমোড, বাথরুমের পাত্র বা অন্য কোনো পানির আধার নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন। বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের জায়গাতেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
দিনে মশার কামড় থেকে বাঁচুন : এডিস মশা দিনের বেলাতেও কামড়ায়। তাই শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই হবে না। দিনের বেলায় ঘুমালে মশারি ব্যবহার করুন। শিশুদের বাইরে পাঠানোর সময় ফুলহাতা জামা ও প্যান্ট পরানো যেতে পারে। শরীরের অনাবৃত অংশে প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা যায়।
ঘরের দরজা-জানালায় মশা প্রতিরোধী জাল থাকলে সেটিও কার্যকর হতে পারে। তবে কোনো মশা তাড়ানোর উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা শ্বাসকষ্টের রোগীদের বিষয়ে সতর্ক থাকা ভালো।
শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার করলেই হবে না : আপনার বাড়ি পরিষ্কার, কিন্তু পাশের বাড়ির ছাদে পানি জমে আছে—তাহলে ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমন্বয় করে আশপাশের বাড়ি, খালি জায়গা, নির্মাণাধীন ভবন, গ্যারেজ ও ছাদও নজরে রাখতে হবে। বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবনের বালতি, ড্রাম, পাইপ, গর্ত কিংবা প্লাস্টিকের পাত্রে পানি জমে থাকতে পারে। এসব জায়গা নিয়মিত পরিদর্শন জরুরি।
বাড়িতে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে : পরিবারের কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাকে মশার কামড় থেকে বিশেষভাবে রক্ষা করতে হবে। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য ব্যক্তিকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই রোগীকে মশারির মধ্যে রাখা এবং ঘরে মশার উপস্থিতি কমানো জরুরি।
মশা মারার চেয়ে মশা জন্মাতে দেবেন না : কীটনাশক দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মশা মারা যেতে পারে, কিন্তু বাড়ির কোথাও লুকিয়ে থাকা প্রজননস্থল যদি থেকে যায়, তাহলে আবার নতুন মশা তৈরি হবে। এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা মশা নিয়ন্ত্রণে প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ডেঙ্গু হলে ঘরেও কিছু নিয়ম মানতে হবে : ডেঙ্গু সন্দেহ হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসক যদি বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেন, তাহলে রোগীকে পূর্ণ বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল এবং সহজপাচ্য খাবার দিতে হবে। জ্বরের তাপমাত্রা ও সময় লিখে রাখা এবং প্রস্রাবের পরিমাণের দিকেও নজর রাখা দরকার। তবে নিজের সিদ্ধান্তে আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেনজাতীয় ব্যথানাশক, স্টেরয়েড বা অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো ঠিক নয়। এসব বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো একদিনের অভিযান নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই পারে বড় ঝুঁকি কমাতে। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ, পাত্র পরিষ্কার রাখা, ছাদ ও বারান্দা নজরে রাখা এবং দিনের বেলাতেও মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা— এ অভ্যাসগুলো পরিবারে চালু করতে পারলেই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে ঘর থেকেই শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
