কফি এখন আরবান লাইফস্টাইলের প্রতীক

আন্তর্জাতিক কফি দিবস আগামী ১ অক্টোবর। এ উপলক্ষে বারিস্তা ট্রেনিং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, নেসলে প্রফেশনালের ট্রেইনার এবং রন্ধনশিল্পী শেফ আজম আলী একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে ঝিনাইদহ থেকে উঠে আসা এবং তার দীর্ঘ ২৩ বছরের ক্যারিয়ার সংগ্রাম, অসংখ্য তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বারিস্তাদের সম্ভাবনার গল্প। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন— খালেদ সাইফুল্লাহ মাহমুদ

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আলোকিত বাংলাদেশ : আন্তর্জাতিক কফি দিবসের শুভেচ্ছা, শেফ। বর্তমানে বাংলাদেশে কফি নিয়ে যে তুমুল উন্মাদনা, এটিতো এক দশক আগেও ভাবা যেত না। এ বিবর্তনকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

শেফ আজম আলী : আপনার কথা একদম ঠিক। ২০০১ সালে আমি যখন এসএসসি শেষ করে ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় এসে ওয়েস্টার্ন গ্রিল রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করি, তখন কফি মানে ছিল শুধু ইনস্ট্যান্ট কফি পাউডার, গরম পানি আর দুধের মিশ্রণ। পরবর্তীতে ফাইভস্টার হোটেল সোনারগাঁও এবং দেশের বিভিন্ন বড় চেইনে কাজ করার সুবাদে আন্তর্জাতিক কফি সংস্কৃতির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। গত ১০ থেকে ১২ বছরে বাংলাদেশে সত্যিকারের একটি 'কফি বিপ্লব' বা 'কফি কালচার' তৈরি হয়েছে। আগে মানুষ রেস্টুরেন্টে যেত ভারী খাবার খেতে। তবে এখন তরুণরা শুধু এককাপ ভালো কফি, নিখুঁত এসপ্রেসো বা ক্রিস্পিল্যাটে আর্টের টানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্যাফেতে কাটাচ্ছেন। কফি এখন আর সাধারণ কোনো পানীয় নয়, এটি এখন এ দেশের আরবান লাইফস্টাইলের অন্যতম প্রতীক।

আলোকিত বাংলাদেশ : আপনার প্রতিষ্ঠান 'বারিস্তা ট্রেনিং বাংলাদেশ'- এর মাধ্যমে ২ থেকে ৩ হাজার তরুণ-তরুণীকে আপনি দক্ষ বারিস্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এ বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবদানের পেছনের মূল অনুপ্রেরণা কী ছিল?

শেফ : একজন প্রফেশনাল শেফ এবং ট্রেইনার হিসেবে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি যে, আমাদের দেশে প্রতিভাবান তরুণদের অভাব নেই, অভাব শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক মানের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের। আমি নিজে অনেক কষ্ট করে কাজ শিখেছি, তাই সবসময় চাইতাম তরুণদের জন্য এমন একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে যেখানে তারা খুব সহজে বিশ্বমানের প্রফেশনাল বারিস্তা ও মকটেল কোর্স করতে পারবে। সেই স্বপ্ন থেকেই বারিস্তা ট্রেনিং বাংলাদেশের যাত্রা। আমাদের এখানে সম্পূর্ণ প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করানো হয়। আজ যখন আমাদেও প্রায় ৩ হাজার প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন নামী ক্যাফে চেইন, যেমন— চিলক্স বা বিভিন্ন ফাইভস্টার হোটেল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা করছে, তখন মনে হয় সমাজ ও দেশের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা কিছুটা হলেও পূরণ করতে পেরেছি।

আলোকিত বাংলাদেশ : প্রশিক্ষণের পর চাকরি বা কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াটি আপনারা কীভাবে পরিচালনা করেন?

শেফ : আমরা শুধু কফি বানানো শিখিয়ে সার্টিফিকেট দিয়ে দায়িত্ব শেষ করি না। আমাদের মূল লক্ষ্যই হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বারিস্তা ট্রেনিং বাংলাদেশের সঙ্গে দেশের বহু নামী চেইন শপ, রেস্তোরাঁ ও হোটেল ইন্ডাস্ট্রির সরাসরি সংযোগ রয়েছে। কোর্স চলাকালীন বা শেষ হওয়ার পর আমরা মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও সরাসরি জব প্লেসমেন্টের ব্যবস্থা করে দিই। এমনকি যারা নিজেরা উদ্যোক্তা হতে চায় বা নিজস্ব ক্যাফে খুলতে চায়, তাদেরকে আমরা প্রফেশনাল ক্যাফে কনসালটেন্সি ও সেটআপ গাইডলাইনও বিনামূল্যে প্রদান করি।

আলোকিত বাংলাদেশ : বর্তমান সময়ে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা বা কাজের জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। তাদের জন্য বারিস্তা স্কিলটা কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে?

শেফ : এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট। বর্তমান বিশ্বে বারিস্তাকে বলা হয় একটি 'গ্লোবাল পাসপোর্ট'। আমাদের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ হচ্ছে মিডল ইস্ট (বিশেষ করে সৌদি আরব, দুবাই), ইউরোপ, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়াগামী ছাত্র-ছাত্রী। বিদেশে গিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ কোনো পার্ট-টাইম কাজ খোঁজার চেয়ে একজন 'সার্টিফাইড বারিস্তা' হিসেবে কাজ করা অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ এবং এতে ঘণ্টাপ্রতি পারিশ্রমিকও অনেক বেশি পাওয়া যায়। ইউরোপ-আমেরিকার কফি শপগুলো সবসময় দক্ষ হাত খোঁজে। আমাদের ৮ দিনের বা ১০ দিনের প্রফেশনাল কোর্সটি এমনভাবে সাজানো যাতে তারা কফি বিনের সোর্সিং, রোস্টিং, এসপ্রেসো এক্সট্রাকশন এবং ল্যাটে আর্টের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড আয়ত্ত করতে পারে। ফলে এয়ারপোর্টে নামার কয়েকদিনের মধ্যেই তারা খুব সহজে ভালো মানের কফি শপগুলোতে চাকরি পেয়ে যাচ্ছে।

আলোকিত বাংলাদেশ :আপনার দৃষ্টিতে এককাপ সাধারণ কফি আর এক কাপ 'মাস্টারপিস' কফির মধ্যে পার্থক্য কোথায়? একজন বারিস্তাকে কোন কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি নিখুঁত হতে হয়?

শেফ : পার্থক্যটা লুকিয়ে থাকে সূক্ষ্ম বিজ্ঞান আর ভালোবাসার মধ্যে। কফি বানানো স্রেফ বোতাম টিপে লিকুইড বের করা নয়। কফি বিনের গ্রাইন্ডিং সাইজ কতটা নিখুঁত, পোর্টালিফটারে ট্যাম্পিং প্রেসার ঠিক আছে কি না, এসপ্রেসো শটটি ২৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের পারফেক্ট টাইমিংয়ে এক্সট্রাক্ট হলো কি না— এ সবকিছুর ওপর কফির স্বাদ নির্ভর করে। এরপর আসে মিল্ক টেক্সচারিং বা দুধের ফোম তৈরি করা। দুধের তাপমাত্রা যেন ৬৫ ডিগ্রির বেশি না হয়, যাতে কফির নিজস্ব মিষ্টি ভাবটা বজায় থাকে। সবশেষে যখন একজন বারিস্তা সেই ফোম দিয়ে কাপের ওপর সুন্দর একটি 'রোজলটা' বা 'হার্ট' আর্ট ফুটিয়ে তোলেন, তখন সেটি আর পানীয় থাকে না, একটি আর্ট পিস হয়ে ওঠে। এ জন্য প্রয়োজন সীমাহীন ধৈর্য এবং প্র্যাকটিস।

আলোকিত বাংলাদেশ :পরিশেষে কফি দিবসের এ বিশেষ ক্ষণে যারা নতুন করে এ ইন্ডাস্ট্রিতে আসতে চায়, সেই তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশ্যে আপনার বিশেষ বার্তা কী?

শেফ : নতুনদের প্রতি আমার একটাই কথা— হসপিটালিটি ও কফি সেক্টর এখন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং সম্মানজনক একটি পেশা। বিশেষ করে নারীদের জন্য আমাদের একাডেমিতে আমরা বিশেষ মনোযোগ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করি, যাতে তারাও এ শিল্পে এগিয়ে আসতে পারে। কফিকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চাইলে শর্টকাট খুঁজবেন না। সঠিক মেন্টরের অধীনে প্রফেশনাল ট্রেনিং নিন, কফি বিনকে ভালোবাসতে শিখুন এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মিক্সোলজি ও বারিস্তা টেকনিক প্র্যাকটিস করুন। বারিস্তা ট্রেনিং বাংলাদেশ সবসময় আপনাদের পাশে আছে। স্বপ্ন দেখুন, নিজেকে দক্ষ করে তুলুন; কর্মসংস্থান আপনার পেছনে দৌড়াবে।