ভ্রমণ
রোমাঞ্চকর নাপিত্তাছড়া ট্রেইল
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

প্রকৃতির রুপ-লাবন্য দেখার জন্য অন্তর দৃষ্টিও চাই। যে দৃষ্টি দিয়ে শুধুই প্রকৃতির অকৃত্তিম নির্জাস নেওয়া যাবে। দে-ছুট ভ্রমণ সংগঠনের বন্ধুরাও সেরকম অপার্থীব মায়াবি প্রকৃতির সন্ধানে একদিন রাতে হুট করেই বের হয়ে যাই সীতাকুন্ডের পথে। রাত ১২টায় আদি ঢাকা থেকে মাইক্রোবাস ছাড়ে। তা-ও আবার সব পুরোনো বন্ধু। চেংড়া বয়সের ড্রাইভার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ফাঁকা পেয়ে গতি দিলো প্রায় ১১৫ কিলোমিটার উঠিয়ে। গাড়ি চলছে দুর্বার গতিতে, সড়কে চলা অন্যসব গাড়ি পেছনে ফেলে। হিসাব ছিল ফজরের সময় পৌঁছাব। কিন্তু যখন টি-ব্রেক দিলাম, দোকানের সাইনবোর্ড দেখে চোখ কপালে। রাত তখন ২টা ৪০মিনিট। আর মাত্র ছয় কিলোমিটার পরেই সীতাকুন্ড, ভাবছি কি করি? দোকানি জানালেন এখানে মাঝেমধ্যে ডাকাতি হয়। আসলে ওসব ডাকাত ফাকাতের বেইল নাই আমাদের কাছে, যেহেতু নাদুসনুদুস দেহের আরাফাত বন জঙ্গলের পরম বন্ধু।
যাইহোক মনের ভেতর সাহস যুগিয়ে জম্পেশ আড্ডা জমিয়ে ফেললাম। সময় গড়াতেই ফজরের আজান পড়ল। নামাজ আদায় করেই গাড়ি টান দিলো নয়দুয়ারী হাটের পথে। গাইড নিজাম আগেই সেখানে অপেক্ষমান ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই নয়দুয়ারী পৌঁছাই। যাব নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে। তাই গাড়ি থামিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু শুকনো খাবার ক্রয় করলাম। রেল লাইন পর্যন্ত যাওয়ার পর গাড়ি রেখে শুরু হলো পায়ে হাঁটা। আমাদেরমতো অনেকেই হাঁটছেন। ক্ষেতের আইল ধরে, ঝিরির পানি কেটে এগিয়ে যাচ্ছি।
ঝোপঝাড়, জঙ্গল, পাহাড়, টিলার মাঝ দিয়ে ট্রেক করে প্রথমেই দেখা পাই টিপড়া খুমের। এরপর কুপিকাটা খুম পেরিয়ে উজিলা পাহাড়ের উপরে উঠি। ১০৫ কেজির দেহটা যখন উজিলা পাহাড়ের চূড়ায়, তখন চারপাশের নৈসর্গিক দৃশ্যে নয়ন জুড়ায়। আহ্! প্রকৃতির প্রতি কতটা জাগ্রত প্রেম। তাই যদি না হত, তাহলে কে যেত পাহাড় চূড়ায় এত কষ্ট করে। উজিলার বুকে নয়নাভিরাম প্রকৃতির পরশে, বুক ভরা নিঃশ্বাস নিয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠি। খুশিতে খুশিতে কিছুটা দূর হাইকিং-ট্র্যাকিং শেষে বান্দর খুমে পৌঁছাই। হুট করেই শুরু হলো টিপ টিপ বৃষ্টি। এতে করে ঝর্ণার পানি প্রবাহও বেড়ে গেল বেশ। ঝুম বৃষ্টিতে বান্দরখুমের রূপ ভয়ানক সৌন্দর্য ধারণ করে। তখন মনে হবে পুরো মিরসরাই-সীতাকুন্ড রেঞ্জে, এর চেয়ে সুন্দর ঝর্ণা আর দ্বিতীয়টি নেই। বান্দরখুম দেখে চলে যাই বাঘ বিয়ানী ঝর্ণায়। যাবার ট্রেইলটা বেশ রোমাঞ্চকর। মূলত পুরো ট্রেইলটার নামই নাপিত্তাছড়া।
প্রকৃতি একেক জায়গায় ভিন্নভিন্ন রূপে ধরা দেয়। তা আগেভাগে বুঝা বড় দায়। বাঘ বিয়ানী ঝর্ণায় যাবার পর যে স্ট্রাকচারে চোখ আটকায়, তা ভাষায় বা লেখায় বুঝানোর সক্ষমতা আমার নেই। যতটুকুন পারছি তা লিখছি। তিন পাশ থেকে পাহাড় প্রাচীর হয়ে ওপর দিকে উঠে গেছে। মাঝ বরাবর অবিরাম ঝর্ণা ধারা। কোথাও কোথাও পাহাড়ের নিচ থেকে সরে গেছে মাটি। কোনো কারণে প্রকৃতি হিংস্র্র হলে সবার এখানেই হবে সমাধি। বাঘবিয়নী'তেও পানির প্রবাহ বেশ। রিমঝিম ছন্দ তোলা শব্দ মনটাকে বেশ উৎফুল্ল করে দেয়। তপ্ত গরমে শিতল ঝর্ণার পনিতে শরীর সমর্পণ করে দিই।
যেভাবে যাবেন : বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে ঢাকা থেকে চট্টগাম। নামতে হবে মিরসরাই উপজেলার নয়দুয়রী হাটে/সীতাকুন্ড উপজেলার শুরুতেই। সেখান থেকে সিএনজি/অটোতে রেললাইন পর্যন্ত। ঢাকার কমলাপুর থেকে ট্রেনেও যাওয়া যাবে। যেখানে থাকবেন : চট্টগাম শহরে মান ভেদে অনেক হেটেল/কটেজ রয়েছে। আরও যা দেখবেন : সময় সুযোগ থাকলে মহামায়া কৃত্রিম লেক, খৈয়াছড়া ঝর্ণা, সহস্রধারা ও ইকোপার্কসহ আরও অনেক কিছুই আছে আশপাশে।
ছবি : ইসলাম সোহেল
