ভ্রমণ
আদিম পাথারিয়া পাহাড়ের আলিঙ্গণে
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

দে-ছুট ভ্রমণ সংগঠনের বন্ধুরা একদিন রাতের গাড়িতে চলে যাই মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার ডিমাই বাজার। তীব্র জ্যামে গাড়ি পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে। এতে করে ভ্রমণ পরিকল্পণার বারোটা বাজে। তাও যে রক্ষা গাইড সময় মতোই হাজির ছিল। কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পোশাক বদলিয়ে সিএনজিতে চেপে আহমদপুর গ্রামের পথে রওনা হই। সেখানে পৌঁছে সিএনজি ছেড়ে পায়ে হেঁটে ডিমাই গ্রাম পেরিয়ে মোকাম পুঞ্জী ধরে আগাতে থাকি। যেতে যেতে পাথারিয়া পাহাড়ের জঙ্গলে নিজেদেরকে আবিষ্কার করি। সুনসান নিরবতা চারপাশ গ্রাস করেছে। আহ, এমন নৈসর্গিক পরিবেশইতো আমরা চাই। আর একটু আগতেই ঝর্ণার গান কানে ভেসে আসে। পাথুরে ঝিরিতে ক্ষিপ্রগতি তুলে বয়ে যায় স্বচ্ছ পানি। চোখেমুখে ছিটাতেই উবে যায় ক্লান্তি। হালকা নাশতা সেরেই পুরোদমে আবারো হাইকিং। শুরতেই চোখে ধরা দেয় ঝেরঝেরী ঝর্ণা। ওয়াও! বুনো পরিবেশে বেশ উঁচু পাহাড় থেকে দুপাশ হতে ছড়িয়ে পড়ছে পানি। প্রথম দেখাতেই ঝেরঝেরী নজর কেড়ে নেয়। তাই তার জলে ভেজার লোভ সামলাতে না পেরে,নেমে পড়ি জলকেলিতে। শুরতেই এক ঝর্ণায় ইচ্ছেমত ভিজি। সামনে রয়েছে আরো কয়েকটা। শরীরের অবস্থা এবার কেমন হয় কে জানে। তা যাইহোক আবারো হাইকিং। অল্প কিছু দূর যেতেই চোখ আটকায় পানজুমাই ঝর্ণায়। ঝর্ণার কাছাকাছি পৌঁছতেই আমি হতবিহ্বল। প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ঘেরা ঝর্ণাটির আরো কাছাকাছি চলে যাই। লোভাতুর মন শ্বেতশুভ্র জলে নিজেদের সমর্পণ করি। বিলিয়ে দিই পানজুমাইর শীতল আলিঙ্গণে। পানজুমাই ঝর্ণার উপরটা সত্যিই অসাধারণ সৌন্দর্যে ঘেরা। জলাশয়ে বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে এবার সূড়ঙ্গর মতো পাহাড়ের চিপা দিয়ে, আরো উপরে উঠার প্রস্তুতি নিই। কিন্তু কিছু দূর যেতেই বাধা হয়ে দাড়াল শতশত টাইগার জোঁকের ঝাঁক। গাইডের পরামর্শে দুঃসাহস পরিহার করে, বরং আমরা চললাম পানবাগিছার ডর। বন্ধুর পথ পারি দিয়ে পৌঁছে যাই পানবাগিছার ডর ঝর্ণার প্রান্তরে। ঝর্ণার গায়ে নিজেদের দেহটা আলতো করে মিলিয়ে দিই। অবিশ্বাস্য। কিছুটা সময় পেরুতেই মায়া জালে আটকে গেলাম। অলস ভাবে বসে থাকতে থাকতে সন্ধ্যা নেমে এলো। এবার ছুটলাম আরেক পাহাড়ের উপর থাকা জুমঘরে। রাতটা সেখানেই কাটাব। জুমঘরে পৌঁছে মাথাটা পুরাই আওলাঝাউলা হয়ে গেল। ঘরের এ কি শ্রী। মনে হয় না গত একবছর কেউ এখানে রাত কাটিয়েছে। কিন্তু কি আর করার। লোকালয়ে ফিরারও কোন সুযোগ নাই। ভয়ঙ্কর এক রাত যাপনের অভিজ্ঞতা ভ্রমণ ঝুলি সমৃদ্ধ করল। পাখি ডাকা ভোরে আশপাশের নৈসর্গিক পরিবেশ মন মেজাজ শান্ত করে দিলো। বারান্দায় দাড়িয়ে উল্লুকের হাকডাক বেশ লাগল।
যাই আতর বাগান ছাড়িয়ে কাকড়া ছড়া ঝর্ণার প্রান্তরে। হাইকিং ট্র্যাকিং করতে করতে ঢুকে যাই বুনো এক ঝিড়িতে। ওয়াও! একের পর এক পাথারিয়ার পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা নানান সৌন্দর্য, চোখে ধরা দিয়েই যাচ্ছে। প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। ঝিড়ি পথটাতে থাকা গাছে গাছে ডাউস সাইজের পাকা ডুমুর। যা দেখতে একেকটা বড়সড় লাল টসটসে আনারের মত। অন্যান্য ঝিরির চাইতে কাকড়া ছড়া ঝিড়ির পাথরগুলোও বেশ বড় ও গোলাকার। এমনি নজরকাড়া ঝিরিপথ ধরে যেতে যেতে কাকড়া ছড়া ঝর্ণার প্রান্তরে হাজির।
যেভাবে যাবেন : ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে দিনে-রাতে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখাগামী, বিভিন্ন বাস ছেড়ে যায়। বাস থেকে বড়লেখা উপজেলার ডিমাই বাজার নেমে যেতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি করে আহমেদপুর গ্রাম। এরপর স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটা শুরু।
থাকা ও খাওয়া : উপজেলা সদরে মানভেদে আবাসিক ও খাবার হোটেল রয়েছে।
