ভ্রমণ

ঝরনার নাম তোজেংমা

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

খোঁজ মেলে অচেনা এক ঝরনার। নাম তার তোজেংমা। আর দে-ছুটের ভ্রমণপাগলারা নতুন কোনো প্রকৃতির টানেই ঘর ছাড়তে পছন্দ করে। ঢাকা থেকে রাতের বাসে ছুটি প্রকৃতির রাজা খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালায়। যানজটমুক্ত থাকায় ভোর সাড়ে চারটার সময় পৌঁছাই। অতঃপর সকাল ৯টায় রুম থেকে বের হয়ে নাশতা শেষে বাইকে ছুটি আলমগীর টিলায়। সকাল ১০টায় হাঁটা শুরু। আমরা ছয়জন, গাইড পাঁচজন— মোট এগারোজন।

কেউ চেনে না, শুধুমাত্র লোকেশননির্ভর— এমন নিঝুম-বুনো পাহাড়ি পথে হাইকিং, ট্রেকিং সত্যিই অন্য রকম রোমাঞ্চকর। কিছুটা দূর এগিয়ে যাওয়ার পরেই এক অন্য রকম ভালো লাগা, রহস্যঘেরা অনুভূতি মনে দোল দেয়। বয়ে যাওয়া পানির বিপরীতে হাঁটা, পায়ের নিচে মরণফাঁদ পাথরখণ্ড, ছোট ছোট পাথর, মাথার ওপর ডালপালা, দুপাশে গভীর জঙ্গল— সূর্যের রশ্মিও যেখানে হার মেনেছে, সেই রকম ঝিরিপথে এগিয়ে যাওয়া সত্যিই অ্যাডভেঞ্চারের ষোলো কলা।

বেলা প্রায় দুটো, আবারও বিরতি। ভরদুপুরেও অন্ধকার এমন পরিবেশে কিছুটা সময় জিরিয়ে নেওয়ার পর আবারও শুরু হাইকিং। গড়িয়ে যাওয়া পানির তীব্রতাই বলে দেয়, আর বেশি দূরে নয় লুকিয়ে থাকা বুনো সৌন্দর্য তোজেংমা ঝরনা। ঠিক ঠিকই আধা ঘণ্টার মধ্যেই রিমঝিম ছন্দ তোলা পানির শব্দ ভেসে আসে কানে। আনন্দে চোখে-মুখে সবার চিকচিক হাসির ঝিলিক।

পানির উৎস ধরে এগোতেই সামনে পড়ে ইয়াবড় এক পাহাড়। প্রকৃতির আপন খেয়ালেই পাহাড়টি দুই ভাগ হয়ে সেই কল্পকাহিনির আলিবাবার 'চিচিং ফাঁক' দুর্গের রূপ ধারণ করে আছে। এসবই প্রকৃতির লীলাখেলা। আমিও ক্ষণিকের জন্য আলিবাবা সেজে চিৎকার দিয়ে বলে উঠি, ইয়া চিচিং ফাঁক, তোজেংমা!

পিচ্ছিল পাথর টপকিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকতেই চোখ উঠে কপালে। আরে, এ যে সত্যি সত্যি বাস্তবের ধনদৌলতের দুর্গ! শুধু এর ব্যবহার জানতে হবে। ভাগ হয়ে যাওয়া দুই পাহাড়ের দুই পাশ থেকে গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম পানির ধারা। তবে সেই পানির পরশ পেতে চাই আরেকটু ধৈর্য।

কিন্তু অতি উৎসাহী সঙ্গীরা পারে তো লতায় ঝুলেই কাছে যেতে চায়। তবে মাথা ঠান্ডা রেখেছে মারুফ। আপনারা কিন্তু ভুলেও লতায় ঝোলার চেষ্টা করবেন না। মনে রাখবেন, আপনি বাংলার টারজান হওয়ার জন্য সেখানে যাননি। গিয়েছেন প্রকৃতির নির্যাস নিতে। সেই প্রকৃতি ও পরিবেশের সান্নিধ্য পেতে হলে কিছুটা কষ্ট তো করতেই হবে।

গুহার রূপের আচ্ছন্নতায় না পড়ে সজাগ দৃষ্টিতে বড় বড় ধারালো, চোখা পাথর মাড়িয়ে চলে যাই একেবারে তোজেংমার কোলে। আহ্, কী শান্তি! পুরো নির্জনতায় জঙ্গলিপরিবেশে গুহা-আকৃতির দুই পাহাড়ের ওপর থেকে দুটো ঝরনার শুভ্র সাদা পানি তীব্র গতিতে ছুটে এসে আলিঙ্গন করে একই বিন্দুতে। পানির ক্ষিপ্রতায় সৃষ্টি হওয়া প্রাকৃতিক বাথটাবে সাঁতার কাটা যাবে অনায়াসে।

ঝরনা দুটোর উচ্চতা খুব বেশি নয়। তবে তোজেংমার রয়েছে ভিন্ন রকম বৈশিষ্ট্য আর অদ্ভুত আকৃতির নজরকাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ঝরনার আচড়ে পড়া পানির তীব্রতাও বেশ। মনে হলো, সারা বছরই যেন পানির রিমঝিম ছন্দ তোলা আওয়াজের ধারাবাহিকতা থাকে অটুট।

তোজেংমা থেকে জলীয় বাষ্প আর সুবিধাজনক স্থানের অভাবে ঝরনা দুটোর আরও বেশি আকর্ষণীয় ছবি তুলতে বারবার ব্যর্থ হলাম। এখনও অধিকাংশ ভ্রমণপিপাসুর কাছে অচেনা-অজানা রয়েছে তোজেংমা ঝরনার রূপ-রহস্য। ঝরনার আশপাশে নেই কোনো বসতি। তাই তোজেংমা নামের আভিধানিক অর্থ কী, তাও এবারের জন্য আড়ালেই রয়ে গেল।

যেভাবে যাবেন : ঢাকার গাবতলী, ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদ থেকে দিনে-রাতে প্রতিদিন খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালার উদ্দেশে বিভিন্ন পরিবহনের এসি ও নন-এসি বাস ছেড়ে যায়। দীঘিনালা থেকে মোটরবাইকে আলমগীর টিলা যেতে হবে।

কোথায় থাকবেন : দীঘিনালা বাজারে বিভিন্ন গেস্টহাউস রয়েছে।

কোথায় খাবেন : গেস্টহাউসগুলোর পাশেই বেশ কিছু খাবারের হোটেল রয়েছে।