সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষা
স্পেকট্রাম নবায়নে দাম ঠিক করেছে বিটিআরসি
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
প্রযুক্তি প্রতিবেদক

গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের স্পেকট্রাম নবায়নে বেশ ছাড় দিয়েছে বিটিআরসি। যেখানে একদিকে সরকারের রাজস্ব, অন্যদিকে স্পেকট্রামের সর্বোচ্চ ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করে মানসম্মত গ্রাহক সেবাকে গুরুত্ব দিয়েছে বিটিআরসি। আর এই প্রথম গবেষণার মাধ্যমে স্পেকট্রামের দাম যৌক্তিককরণ করেছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি। তথ্য টেকশহর ডটকমক। গত বৃহস্পতিবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কাছে স্পেকট্রামের দামসহ তা বরাদ্দ ও দাম পরিশোধের শর্তের অনুমোদন চেয়েছে বিটিআরসি।
২০২৬ সালের ১০ নভেম্বর তিন অপারেটরের সংশ্লিষ্ট স্পেকট্রামের বর্তমান বরাদ্দের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তাই দাম ও পরিশোধের শর্তাবলিতে এ সময়ের মধ্যে সরকারের অনুমোদন চেয়েছে কমিশন। যদিও বিটিআরসি বলেছে, স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভিন্ন যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
স্পেকট্রাম নবায়নের সঙ্গে আর্থিক ও কারিগরি বিষয় জড়িত থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, অর্থ বিভাগ এবং বিটিআরসির মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সভা করার কথাও বলেছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি। কোন ব্যান্ডে কত দাম? বিটিআরসি ১৫ বছরের জন্য প্রতি মেগাহার্জ স্পেকট্রামের দাম ৯০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে ২৩৭ কোটি টাকা, ১৮০০ মেগাহার্জে ১৯৮ কোটি টাকা এবং ২১০০ মেগাহার্জে ১৭২ কোটি টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। এ দাম ট্যাক্স ও ভ্যাট ছাড়া। এ দাম গড়ে অন্তত আগের দামের চেয়ে উল্লেখযোগ্য কম। অপারেটরদের লাইসেন্সের অবশিষ্ট মেয়াদ বিবেচনায় ১০ মার্চ ২০৩৯ পর্যন্ত এ স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হবে। ফলে ১৫ বছরের পরিবর্তে প্রায় ১২ বছর চার মাসের জন্য আনুপাতিক হারে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। দাম পরিশোধ আট কিস্তিতে, শর্ত :অপারেটরদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায়, বেশি স্পেকট্রাম নিতে উৎসাহিত করা এবং স্পেকট্রাম বরাদ্দের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন সহজ করতে কিস্তিতে দাম পরিশোধের সুযোগ দিয়েছে বিটিআরসি।বিটিআরসি বলেছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে স্পেকট্রাম বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ ১০টি কিস্তিতে দাম পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় প্রস্তাবিত স্পেকট্রাম বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কিস্তিতে দাম পরিশোধের সুবিধা রাখতে চায় বিটিআরসি। তবে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের মেয়াদ ২০৩৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত, অর্থাৎ আনুমানিক ১২ বছর চার মাস হওয়ায় ১৫ বছরের পরিবর্তে লাইসেন্সের অবশিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বরাদ্দের মোট দাম ১০টি কিস্তির পরিবর্তে আটটি সমান কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে।প্রথম কিস্তি স্পেকট্রাম নবায়নের নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এবং দ্বিতীয় কিস্তি পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
বাকি ছয়টি কিস্তি পরবর্তী প্রতি এক বছর পর বার্ষিক কিস্তি হিসেবে পরিশোধযোগ্য হবে। সংশ্লিষ্ট স্পেকট্রামের জন্য আগে থেকে কার্যকর বার্ষিক স্পেকট্রাম ফি পরবর্তী বর্ধিত মেয়াদেও একইভাবে প্রযোজ্য থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্পেকট্রামের কিস্তি পরিশোধে কোনো অপারেটর ব্যর্থ হলে বিলম্বিত সময়ের জন্য বার্ষিক ১৫ শতাংশ হারে বিলম্ব ফি দিতে হবে। স্পেকট্রাম নবায়নের পর এর ব্যবহারেও সেলুলার মোবাইল অপারেটর লাইসেন্স এবং বেতার যন্ত্রপাতির লাইসেন্সের (রেডিও ইকুইপমেন্ট লাইসেন্স) সব শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে প্রযোজ্য থাকবে।নবায়নে কার কতো স্পেকট্রাম ?তিন অপারেটরের মধ্যে গ্রামীণফোনের ৩২ দশমিক ৪ মেগাহার্জ স্পেকট্রাম নবায়ন করতে হবে।
রবির ২২ দশমিক ৪ মেগাহার্জ এবং বাংলালিংকের ২৪ দশমিক ৪ মেগাহার্জ স্পেকট্রামের মেয়াদও শেষ হচ্ছে। বর্তমানে গ্রামীণফোনের ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৪, ১৫ ও ১০ মেগাহার্জসহ মোট ৩২ দশমিক ৪ মেগাহার্জ স্পেকট্রাম রয়েছে। রবির এ তিন ব্যান্ডে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৪, ১০ ও ৫ মেগাহার্জসহ মোট ২২ দশমিক ৪ মেগাহার্জ স্পেকট্রাম রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলালিংকের ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে যথাক্রমে ৫, ১৪ দশমিক ৪ ও ৫ মেগাহার্জসহ মোট ২৪ দশমিক ৪ মেগাহার্জ স্পেকট্রাম রয়েছে। তিন অপারেটরের মোট ৯০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে ১৯ দশমিক ৮ মেগাহার্জ, ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে ৩৯ দশমিক ৪ এবং ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে ২০ মেগাহার্জসহ মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্জ স্পেকট্রাম রয়েছে। যেখানে মোট নবায়নযোগ্য স্পেকট্রামের ৩৯ দশমিক ৪ মেগাহার্জ ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের, যা মোট পরিমাণের প্রায় অর্ধেক। এ কারণে এ ব্যান্ডকে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণের মূল ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
নবায়নে সরকারের রাজস্ব কত? তিন মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে থাকা মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্জ স্পেকট্রামের মূল্য (১৫ বছরের) নতুন দাম অনুযায়ী ১৫ হাজার ৯৩৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৯০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে ১৯ দশমিক ৮ মেগাহার্জ স্পেকট্রামের প্রতি মেগাহার্জ ২৩৭ কোটি টাকা হিসাবে দাম দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে ৩৯ দশমিক ৪ মেগাহার্জ স্পেকট্রামের প্রতি মেগাহার্জ ১৯৮ কোটি টাকা হিসাবে দাম ৭ হাজার ৮০১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
আর ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে ২০ মেগাহার্জ স্পেকট্রামের প্রতি মেগাহার্জ ১৭২ কোটি টাকা হিসাবে দাম ৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। যেহেতু অপারেটরদের বর্তমান লাইসেন্সের মেয়াদ ১০ মার্চ ২০৩৯ পর্যন্ত, তাই অবশিষ্ট মেয়াদের ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে বিটিআরসি। সে হিসেবে ১২ বছর চার মাসের অবশিষ্ট মেয়াদে তিন অপারেটরের সম্মিলিত স্পেকট্রামের দাম দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১০১ কোটি টাকা। এটি ট্যাক্স, ভ্যাট ও অন্যান্য প্রযোজ্য ফি ছাড়া।
বিটিআরসি যা বলছে : বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.) বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনও যুক্তিভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হয়নি। যতবারই স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, আশপাশের কোনও দেশের দাম দেখে হুট করে একটি দাম ঠিক করা হয়েছে। পরে অন্য দেশগুলো দাম কমালেও বাংলাদেশে তা কমানো হয়নি। কিন্তু দাম কমানোর প্রসঙ্গ এলেই বলা হয়, আগের নির্ধারিত দাম থেকে কমালে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হবে।
তিনি বলেন, দুই বছর আগেই ঘোষণা দিয়েছিলাম, পেশাদার ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হবে। আমরা সেই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করেছি। স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, ১১ নভেম্বরের আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন না হলে এ নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। আমরা ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকেও জানিয়েছি, ১০ তারিখের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, বলেন মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.)।
কী চাইছে মোবাইল অপারেটরগুলো : রবির রেগুলেটরি অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স প্রধান সাহেদ আলম বলেন, প্রস্তাবিত স্পেকট্রাম নবায়নের দাম সম্পর্কে আমরা এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাইনি। আমরা আশা করি, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বচ্ছ, ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেবে।
