স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণে বিটিআরসির গবেষণা

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  প্রযুক্তি প্রতিবেদক

গবেষণা করে স্পেকট্রামের দাম ঠিক করেছে বিটিআরসি। কিন্তু কীভাবে করা হয়েছে এ গবেষণা? এর মানদণ্ডই বা কী? এ গবেষণার উপর ভিত্তি করেই অপারেটরদের বিপুল স্পেকট্রাম নবায়নের দাম ঠিক করে তা অনুমোদনের জন্য ১৫ অক্টোবর টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি দিয়েছে বিটিআরসি। 'সেলুলার মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ' শীর্ষক গবেষণার জন্য একটি গবেষণা কমিটি গঠন করা হয়। এরপর একজন পরামর্শক নিয়োগ দেয় বিটিআরসি। সূত্র টেকশহরডটকম। পরামর্শক তার দল ও এ কমিটির সদস্যদের নিয়ে গবেষণা করেন।

পরামর্শক হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ'র অধ্যাপক হলেন ড. খালেদ মাহমুদ। যিনি ব্যবসা ও প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ। বুয়েট থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ও যুক্তরাষ্ট্রের বেন্টলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন। অধ্যাপক ড. খালেদ মাহমুদ বলেন, 'স্বীকৃত প্রটোকল অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে গবেষণাটি করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে ভবিষ্যতে বিটিআরসি আরও সহজে ও যৌক্তিকভাবে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করতে পারবে।'

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.) বলেন, 'বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনও যুক্তিভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হয়নি। যতবারই স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, আশপাশের কোনও দেশের দাম দেখে হুট করে একটি দাম ঠিক করা হয়েছে। পরে অন্য দেশগুলো দাম কমালেও বাংলাদেশে তা কমানো হয়নি। কিন্তু দাম কমানোর প্রসঙ্গ এলেই বলা হয়, আগের নির্ধারিত দাম থেকে কমালে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হবে।' তিনি বলেন, 'দুই বছর আগেই ঘোষণা দিয়েছিলাম, পেশাদার ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হবে। আমরা সেই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করেছি।'

স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণে চার পদ্ধতি : গবেষণায় চারটি আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি বা 'আর্ম' ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো হলো আয়ভিত্তিক মূল্যায়ন, প্রকৌশলভিত্তিক মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কিং এবং আর্থসামাজিক মূল্যায়ন। প্রতিটি পদ্ধতি স্পেকট্রামের দামকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছে। আয়ভিত্তিক পদ্ধতি দেখেছে অপারেটরের ব্যবসায় স্পেকট্রামের অর্থনৈতিক ভ্যালু কত, প্রকৌশলভিত্তিক পদ্ধতি হিসাব করেছে স্পেকট্রাম না পেলে বিকল্প নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নির্মাণে কত ব্যয় হতো, বেঞ্চমার্কিং পদ্ধতি স্পেকট্রামের আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনা করেছে আর আর্থসামাজিক পদ্ধতি মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব জাতীয় উৎপাদন, সরকারি রাজস্ব ও গ্রাহকসেবার ওপর কতটা পড়তে পারে, তা বিশ্লেষণ করেছে।

আয়ভিত্তিক মূল্যায়ন, অপারেটরগুলোর কিনতে পারার সক্ষমতা : ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো বা ডিসিএফ পদ্ধতিতে প্রতিটি অপারেটরের ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহ প্রাক্কলন করা হয়েছে। ব্যবসার অন্যান্য সম্পদ থেকে অর্জিত আয় বাদ দিয়ে যে অবশিষ্ট অর্থ পাওয়া যায়, সেটিকে স্পেকট্রামের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ১৫ বছর মেয়াদের জন্য ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের প্রতি পেয়ার্ড মেগাহার্জের দাম পাওয়া যায় ১৭৯ দশমিক ৪৬ কোটি টাকা। এ মডেলে অনিশ্চিত নানা প্রভাব বা উপাদানের প্রভাব যাচাই করতে ২ লাখ পরীক্ষার একটি মন্টে কার্লো সিমুলেশন চালানো হয়। এতে পঞ্চম পার্সেন্টাইল ১৩৪ দশমিক ৪ কোটি টাকা, মধ্যমা বা মিডিয়ান ১৭০ দশমিক ৩ কোটি টাকা এবং ৯৫তম পার্সেন্টাইল ২১১দশমিক ৯ কোটি টাকা পাওয়া যায়। গবেষণায় মাঝের ফলাফল বা মধ্যমা ১৭০ দশমিক ৩ কোটি টাকাকে প্রস্তাবিত মূল্য পরিসরের নিম্নসীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন অনিশ্চিত অনুমান একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে মডেলের মধ্যবর্তী ফলাফলকে মূল্য পরিসরের ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয়েছে।

প্রকৌশলভিত্তিক মূল্যায়ন, বিকল্প অবকাঠামোর ব্যয় : প্রকৌশলভিত্তিক মূল্যায়নে স্পেকট্রাম ব্যবহার করতে না পারলে অপারেটরকে অতিরিক্ত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনায় যে ব্যয় করতে হতো, তা হিসাব করা হয়েছে। এখানে 'এভয়েডেড কস্ট' বা এড়ানো ব্যয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ স্পেকট্রাম পাওয়ার ফলে টাওয়ার, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনায় যে অতিরিক্ত ব্যয় এড়ানো যায়, সেটিই অপারেটরের কাছে স্পেকট্রাম কেনার অর্থনৈতিক সুবিধার একটি সূচক। এ পদ্ধতিতে ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের প্রতি পেয়ার্ড মেগাহার্জের প্রাথমিক দাম পাওয়া যায় ২১০ দশমিক ৩ কোটি টাকা। আয়ভিত্তিক মডেলের ব্যান্ড ওয়েটেড মেগাহার্জের হিসাব পদ্ধতি অনুসারে পুনর্বিন্যাস করলে একই ট্রাঞ্চের প্রতি মেগাহার্টজের দাম দাঁড়ায় ২০৬ দশমিক ৭ কোটি টাকা। তবে গবেষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে, প্রকৌশলভিত্তিক মূল্যায়ন মূলত বিকল্প অবকাঠামো প্রতিস্থাপনের ব্যয় নির্দেশ করে। এটি অপারেটরের সরাসরি আর্থিক সক্ষমতার সমান নয়। এ কারণে শুধু এই দামকে চূড়ান্ত দাম হিসেবে গ্রহণ না করে অন্য পদ্ধতির ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কিং, অন্য দেশে স্পেকট্রামের দাম কত : তৃতীয় পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সমমানের স্পেকট্রাম বরাদ্দের দাম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়, ক্রয়ক্ষমতার সমতা, এশিয়ার বাজার এবং ১৫ বছরের লাইসেন্স মেয়াদ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।গবেষণায় রিজার্ভ দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া বরাদ্দের নমুনা থেকে ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের প্রতি জোড়া মেগাহার্টজের আনুমানিক দাম পাওয়া যায় ২০২ দশমিক ১ কোটি টাকা। এ হিসাবের ৯৫ শতাংশ কনফিডেন্স ইন্টারভ্যাল ১২৮ কোটি থেকে ৩১৯ দশমিক ১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, রিজার্ভ দামেই বিক্রি হওয়া বরাদ্দের নমুনা থেকে প্রাক্কলিত দাম পাওয়া যায় ১৪৫ দশমিক ১ কোটি টাকা। দুই ধরনের নমুনার দামকে যথাক্রমে ৩০ ও ৭০ শতাংশ গুরুত্ব দিয়ে হিসাব করে সমন্বিত দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮৫ কোটি টাকা। মডেল থেকে রিজার্ভসংক্রান্ত প্যারামিটার বাদ দিলে দাম পাওয়া যায় ১৮৪ দশমিক ৭ কোটি টাকা। ফলে গবেষকের মতে, ১৮৫ কোটি টাকার কাছাকাছি সমন্বিত দাম আন্তর্জাতিক তুলনার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। এখানে ২০২ দশমিক ১ কোটি টাকাকে মূল বেঞ্চমার্ক হিসেবে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি রিজার্ভ দামে বিক্রি হওয়া নমুনার ১৪৫ দশমিক ১ কোটি টাকা এবং দুই ধরনের নমুনার সমন্বিত ১৮৫ কোটি টাকার হিসাবও রাখা হয়েছে।

আর্থসামাজিক মূল্যায়ন, কম দামে স্পেকট্রাম দিলে অর্থনীতির লাভ : চতুর্থ পদ্ধতিতে শুধু সরকার কত টাকা পাবে সেই হিসাবের বাইরে স্পেকট্রামের দাম পরিবর্তনের ফলে জাতীয় অর্থনীতি, ব্রডব্যান্ডের বিস্তার এবং গ্রাহকসেবার ওপর কী প্রভাব পড়বে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে ব্রডব্যান্ডের বিস্তার ১০ শতাংশ বাড়লে মাথাপিছু আয় ০ দশমিক ৭৩ শতাংশ বাড়ে। আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে এই ফলের সামঞ্জস্য রয়েছে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।প্রতি ডলারে ১২২ দশমিক ৮৬ টাকা বিনিময় হার এবং ৪৫৫ বিলিয়ন ডলারের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ধরে হিসাব করলে, প্রতি এক শতাংশ পেনিট্রেশনের বার্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা। গবেষণার যুক্তি হলো, স্পেকট্রামের দাম এমন পর্যায়ে নির্ধারণ করা হলে অপারেটররা তা কিনে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সেবা উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে পারে। তাহলে সেই বিনিয়োগের ফলে অর্থনীতিতে যে অতিরিক্ত কর্মকাণ্ড হবে, তা সরকারের সরাসরি স্পেকট্রাম রাজস্বের একটি অংশের চেয়েও বেশি ভ্যালু তৈরি করতে পারে।

গবেষণার উদাহরণে ১৭০ কোটি টাকা দাম এবং ৭৫ শতাংশ পাসথ্রু হারের ক্ষেত্রে দেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক নিট লাভ ১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। একই ক্ষেত্রে করপোরেট কর পুনরুদ্ধার এবং বর্ধিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুল্ক ও কর রাজস্ব পুনরুদ্ধার হিসাব করার পর সরকারের প্রকৃত নিট ক্ষতি দাঁড়ায় মাত্র ২৫ কোটি টাকা। গবেষকের হিসাব অনুযায়ী, সরাসরি স্পেকট্রাম রাজস্ব কিছুটা কমলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর মাধ্যমে তার একটি বড় অংশ সরকারি কোষাগারে ফিরে আসতে পারে।তবে এতে বলা হয়েছে, দাম ১৭৯ দশমিক ৫ কোটি টাকা অতিক্রম করলে এ হিসাবের চিত্র উল্টে যায়। তখন সরকার যে অতিরিক্ত রাজস্ব পেতে পারে, তার তুলনায় জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক মূল্য বেশি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। নেটওয়ার্কের মূলধনী ব্যয় বা ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচারের ক্ষেত্রে ৭৫, ৫০ ও ২৫ শতাংশ, তিনটি পাসথ্রু অনুমানের ক্ষেত্রেই একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।

চার পদ্ধতির হিসাবে দাম ১৮৫ হতে ১৯২ কোটি টাকা : গবেষণায় চারটি মূল্যায়ন পদ্ধতির ফল থেকে পাঁচটি অনুমিত বা সম্ভাব্য দাম বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ১৫ বছর মেয়াদে ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের প্রতি পেয়ার্ড মেগাহার্জের দাম আয়ভিত্তিক মডেলের সিমুলেশনের মধ্যমায় ১৭০ দশমিক ৩ কোটি, রেফারেন্স কেসে ১৭৯ দশমিক ৫ কোটি, প্রকৌশলভিত্তিক হিসাবপদ্ধতিতে ২০৬ দশমিক ৭ কোটি, প্রকৌশলভিত্তিক মূল হিসাবে ২১০ দশমিক ৩ কোটি এবং আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কিংয়ের হেডোনিক পদ্ধতিতে ৩০:৭০ অনুপাতে সমন্বয়ের পর ১৮৫ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। এ পাঁচটি দামের গাণিতিক গড় ১৯০ দশমিক ৪ কোটি টাকা।

আয়ভিত্তিক মডেলের রেফারেন্স কেস, প্রকৌশলভিত্তিক মূল হিসাব ও বেঞ্চমার্কিংয়ের দাম নিয়ে তিনটির গড় ১৯১ দশমিক ৬ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত ১৭০ হতে ২১০ কোটি টাকার মূল্য পরিসরের মধ্যবিন্দু ১৯০ কোটি টাকা। আর আয়ভিত্তিক মূল্যায়নে ৫০ শতাংশ, প্রকৌশলভিত্তিক মূল্যায়নে ২৫ শতাংশ এবং বেঞ্চমার্কিংয়ে ২৫ শতাংশ গুরুত্ব বা ওজন দিয়ে হিসাব করলে দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৮৫ দশমিক ৮ কোটি টাকা।গবেষণায় তিনটি নির্বাচিত দামের গড় ১৯১ দশমিক ৬ কোটি টাকার হিসাবকে তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।